
এ বাড়িতে তার ঠিক সময় কাটতে চায় না। করবার মত কোনো কাজ নেই। কেউ তাকে কিছু করতে দেয় না। লাইব্রেরীতে গিয়ে কয়েকটা বই নিয়ে আসা যায়। নিচে নেমে এসে দেখে রান্না ঘরে বেশ হইচই। রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো মোরী বুয়া একাই চিৎকার করে যাচ্ছে।
-কি হয়েছে মেরী বুয়া?
-কিছু না আপা। ভাইজান সকালে বলেছিলেন পাবদা মাছ খাবেন। ফরিদকে বাজারে পাঠাইছিলাম আনতে। পইপই করে বলছি আগোরা বা মীনা বাজার যাইতে। দেখেন ফাঁকিবাজ কোন না কোন বাজারে গিয়া এই পঁচা মাছ আনছে। এই মাছ কি খাওয়া যায়? এই ছ্যামড়া তুই এতদিনে ভাল আর খারাপ চিনস না?
-আচ্ছা তুমি ওকে আরেকবার পাঠাও। মাথা খারাপ করবার কি দরকার? আর তোমার ভাইজান তো সেই রাতে খাবেন। ফুপি কোথায় গেছেন? দেখছি না যে?
-উনি কোন ফকির বাবার কাছে যান মাঝে মাঝে। তার কাছে গেছেন।
-ওহ আচ্ছা। আমি লাইব্রেরীতে গেলাম। মাছ আনলে আমাকে বোলো। আজকে আমি রান্না করবো। আর ফ্রিজে ইলিশ মাছ আছে না?
-জ্বি আছে।
-সেটাও বাহির কর। আর ফরিদ দেখো তো লাউ শাক পাও কিনা?
-আপা আপনি রান্না ঘরে আসছেন শুনলে ভাইজান রাগ করতে পারে।
-রাগ করলে আমি দেখবো। তুমি আমাকে ডাক দিও। আমি লাইব্রেরিতে আছি।
লাইব্রেরিতে ঢুকতেই দোলনচাঁপার গন্ধটা তাকে অভিভূত করে ফেলল। এটা কি কোনো পারফিউম নাকি এয়ার ফ্রেশনার। কখনও দেখেনি তো কোথাও এমন কোন কিছু। অবশ্য দেশের বাইরের হতে পারে। কয়েকটা বই বেছে নিতেই তার মনে হল কেউ তাকে লুকিয়ে দেখছে। প্রথম দিনের অনুভূতিটা ফিরে এল আবার। এমন কি শুধু তারই হয়? কই উনি তো এই ঘরেই থাকেন? তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে এল অর্পা। এবার থেকে আর একা যাবে না ওই ঘরে।
বেশ যত্ন করে সে ইলিশের পাতুরি আর ঝাল ঝাল করে সরষে পাবদা রান্না করলো।
-আপা ভাইজান তো এই সব খাবার খায় না।
-তাই? তুমি রান্না করেছিলে কখনও?
-তা অবশ্য করি নাই। ফুপুআম্মা যা রানতে কইছে এই বাসায় আইসা থেকে তাই রানতেছি।
-আজকে না হয় অন্য রকম খাবেন তোমার ভাইজান।
নিজের ঘরে এসে অর্পা দুপুরের আনা বইগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগলো। সুনীলের পূর্ব পশ্চিম নিয়ে ছাদ বারান্দায় চলে এল। বিকেল বেলাটা এত সুন্দর এখানে। ছাদে অনেক্ষন পায়চারি করলো। সন্ধ্যা তো হয়ে এল? আজ এখনও বাড়ি ফিরছেননা কেন?
রাত প্রায় এগারোটা। অর্পা উপর থেকে নিচে এসে সে মনোয়ারা বেগমের রুমে উঁকি দিল। আজ আগেই ঘুমিয়ে পড়ছেন। ফকির বাবার দেখা পাননি। তাই তার মন খারাপ। রান্নাঘরের্ সামনে আসতেই মেরী বেরিয়ে এল।
-আপা আপনাকে খাওয়া দেই। রাত তো মেলা হইছে।
-না থাক। আমি আর আজ খাবো না। তোমার ভাইজানকে খাবার গরম করে দিও তাহলে। আমি শুয়ে পড়বো। অনেক মাথা ব্যথা করছে।
-আপা অল্প একটু খাইয়া ওষুধ খান।
-তুমি টগরকে দিয়ে পানি পাঠিয়ে দাও আমার ঘরে তাহলেই হবে।
ঘরে এসে আলো নিভিয়ে অর্পা শুয়ে পড়লো। লোকটার জন্য এত শখ করে রান্না করলো আর আজকেই কিনা তার পাত্তা নেই। এত রাত তো করে না কখনও? কোনো সমস্যা হলো না তো? ফোন করলো বেশ কয়েকবার। ফোনটাও বন্ধ। শফিকে কি ফোন করবে? উনি যদি কিছু মনে করেন। করুক মনে। সে তো খোঁজ নেবার জন্যই ফোন করেছে।
-আসসালামুয়ালাইকুম ম্যাডাম।
-ওয়ালাইকুমআসসালাম। আপনার স্যার কোথায় শফি সাহেব? ফোনে পেলাম না।
-স্যারের তো জরুরী মিটিং পড়ে গিয়েছিল ম্যাডাম। আর এখন তাদের প্রতিনিধিদের সাথেই ডিনার করছেন। একটু রাত হবে ফিরতে।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
-কিছু কি বলতে হবে ম্যাডাম।
-নাহ। রাখছি।
৮.
রোদেলা যখন ওর শয়তান স্বামীর অত্যাচারে নিজের শরীরে আগুন দিল তখন রিজভী ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মেয়েটাও বোকামী করেছিল। নিজের পছন্দের বিয়ে বলে স্বামীর অত্যাচার সব মুখ বুজে সহ্য করতো। বাড়ির কাউকে কিচ্ছু বলেনি। কিন্তু বার্ন ইউনিটে যখন ও মৃত্যুর সাথে লড়তে লড়তে মরে গেল তখন ওদের পুরো পরিবারটাই যেন ওর সাথেই শেষ হয়ে গেল। তোমার শাশুড়ী মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। রিজভী ছিল বোন অন্তপ্রাণ। বোনের ভয়ঙ্কর মৃত্যু রিজভীকে বদলে দিল একে বারেই। কবিতা আর গান পাগল ছেলেটা কেমন অন্যরকম হয়ে গেল। তারপর সব কিছু ফেলে দেশের বাইরে চলে গেল। ও চলে যাবার কিছুদিন পরেই ওর বাবা মারা গেল। তার কয়েকমাস পরেই মা। ও যখন ফিরে এল তখন আর কোনো কিছু ফিরে পাবার নয়। সময় তো আর থেমে থাকে না। আর এখন তো বন্ধু বান্ধব কারো সাথে যোগাযোগ নেই। নিজের পরিবারও নেই। আছি শুধু আমি। কিন্তু আমি বা আর কদিন বাঁচবো বলো?
মনোয়ারা বেগমের কাছে পুরোনো দিনের গল্প শুনছিল অর্পা। মানুষের বাইরেটা দেখে আসলেই ভেতরটা বোঝা সম্ভব নয়। বাইরের আড়ম্বর দেখে কে বলবে মানুষটার মনে এত কষ্ট?
-কিন্তু বউ তুমি এসে তো ছেলেটা আরও বাহিরমুখী হল। আগে তো তবুও বিকালে ঘরে আসতো । এখন তো দেখি অনেক রাতে ফেরে। লাইব্রেরির পাশে যে ছোট ঘরটা আছে সেখানে রাতে থাকে। তুমি কি তাকে কিছু বলছো? তোমার সাথে কেমন সম্পর্ক ওর বলোতো?
অর্পা অপ্রস্তুত হয় এমন প্রশ্নে। সে তো কিছু বলেনি। সে নিজেও রিজভী সাহেবের এমন আচরণে অবাক হয়েছে।
-আমি তো কিছু বলিনি ফুপু। হয়তো অফিসের কাজ অনেক বেশী।
-ছেলেটার অনেক দুঃখ। জানিনা তোমাকে কেন বিয়ে করলো? আমি নিজেও মানা করেছিলাম, শফির কাছে তোমার ছবি দেখে। কিন্তু আমার কথাও শুনলো না। এর পেছনেও নিশ্চই কোনো কারণ আছে। তুমি দেখো কি করতে পারো।
ফুপুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই অর্পা দেখলো মেরী বিকালের নাস্তা টেবিলে দিচ্ছে।
-কেউ কি আসবে?
-ভাইজান আসবে। ফোন করছিল।
-আমি ঘরেই আছি। উনি আসলে আমাকে অবশ্যই ডাক দিও।
মেরী ঘাড় নাড়ে। বড়লোকদের কত রকম কারবার। জামাই বউ আলাদা থাকে। কথা কওয়ার টাইম নাই। এই বিয়া করার দরকার কি?
এই ঘরটা রিজভীর খুব প্রিয়। ঘরটায় তার মা থাকতো। মায়ের প্রচন্ড রকম বই পড়ার নেশা ছিল। সব সময় কিছু না কিছু পড়তেই হবে। তাই বাবা মায়ের জন্য লাইব্রেরি বানালেন আর সাথে এই ঘরটা। মা শেষ জীবনে এই ঘরটাতে থাকলেও বই পড়তে পারেননি আর। বরং বই ছিড়ে কুটি কুটি করতেন তখন। সে সময় সে দেশের বাইরে। বাবাও বেঁচে নেই। ফুপু শক্ত হাতে আগলে আছেন ঘর বাহির দুটোই। দুর্ঘটনা এমন সময় ঘটলো। সবার অলক্ষ্যে মা ছাদে চলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে পড়ে যান, নাকি নিজে লাফিয়ে পড়েছিলেন কেউ জানে না। অর্পাাকে নিজের মত থাকতে দিতেই সে এই ঘরটায় থাকা শুরু করেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটাই ভাল হয়েছে। এই ঘরে আসলেই তার কেন জানি মনে হয় মা আশেপাশেই আছে।
অফিস থেকে ফিরে কাপড় বদলে সে ডাইনিং টেবিলে বসলো। এ সময় সে তেমন কিছু খায় না। শুধু এক কাপ কফি। তবুও এরা টেবিল ভর্তি করে নাস্তা দিয়ে যায়। অর্পাকে পাশে এস দাঁড়াতে দেখে খুব অবাক হল।
-বসবো?
-অবশ্যই। অনুমতি নেবার তো দরকার নেই।
-আমার কিছু কথা বলবার ছিল।
-কোন সমস্যা হচ্ছে কি?
-না তো।
-তাহলে?
-কথাগুলো আমাদের বিষয়ে।
-আচ্ছা তুমি তোমার ঘরে যাও। আমি কফি শেষ করে আসছি।
