
বন্ধুত্ব এবং আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো আলগা হতে শুরু করেছে বেশ আগে থেকেই। আমাদের বয়সী যারা অনেকেই বিষয়গুলো অনুধাবন করেন। কেউ কেউ আড্ডা আলোচনায় মাঝে মধ্যে যে তোলেন না এমন না। হয়তোবা স্পর্শকাতর হওয়ায় এড়িয়ে যাওয়াকে অনেকে অধিকতর সমীচিন মনে করেন। করোনা কালের আইসোলেশন করোনা উত্তর কালে আমাদের জীবনে কি প্রভাব রেখে গেছে তা নিয়ে কোন গবেষণা হচ্ছে কি না জানার সুযোগ তেমন করে হয়নি। তবে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশীদের বিশেষত প্রবাসীদের জীবনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে সেটা অন্তত ভালই অনুধাবন করতে পারছি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্কটি তা যে আর কেউ না, বরং বন্ধুত্ব, সেটাও বোধ করি বলে দিতে হবে এমন না। কিন্তু এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না, উচিতও মনে করি না। বন্ধুদের মধ্যে রাজনৈতিক মত দর্শন আলাদা হবে এটা খুবই নেচারাল। সেটা বরং সৌন্দর্যও। আমরা তো আমাদের বন্ধুদের বেশীরভাগকে আগে থেকে জানতামই। অধিকাংশের পরষ্পরের রাজনৈতিক মত সম্পর্কে পূর্বধারনা থাকাটাও স্বাভাবিক। তাহলে কেন এমন হচ্ছে!
দুটো কারনকে আমার যৌক্তিক মনে হয়। প্রথমত এই পরিবর্তনটা এত অকষ্মাত ঘটে গেছে যে অনেকে হতবিহ্বল হয়েছেন। অনেকেই এখনো মানতে পারছেন না যে, এটা ঘটে গেছে এবং পরিবর্তিত পরিস্হিতিটা মেনে সবার সামনের দিকে তাকানো উচিত। দ্বিতীয় কারনটা কেউ কেউ এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে উত্সাহের আতিশয্যে অতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ফল স্বরূপ অন্যদের মনোকষ্টের কারন তৈরী হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই আলটিমেটলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এই ফেসবুক এরাতে যা লুকানো অনেকের পক্ষেই হয়তো সম্ভব হয়নি।
জীবনের নানামূখী ব্যস্ততা আমাদের সময়গুলো ক্রমাগত গোগ্রাসে গিলে ফেলছে। বহু ক্ষেত্রে এক পরিবারে এক ছাদের নীচে বসবাস চলছে ঠিকই কিন্তু নিজের চারদিকে এক দূর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে পরস্পর থেকে যোজন যোজন দূরত্বে আলাদা হয়ে অবস্হান বাড়ছে। সন্তানদের কাছে মিডিয়া ছাড়া পৌঁছানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলো নিউক্লয়াস হতে হতে একক সদস্যের দিকে ধাবমান। আমরা দেখছি আর ভাবছি কিন্তু তেমন কিছুই করতে পারছি না। আমাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ যত বেশী ডিজিটাল মাধ্যম নির্ভরশীল হবে এই প্রবনতা সমানুপাতিক হারে বাড়বে সেটা এখন আর কারো অজানা নেই।
পরিবর্তনগুলো সময়ের সাথে তার নিজস্ব গতিতে সামনে আগাবে এটা মেনে নিজেকে পরিবর্তিত পরিস্হিতির সাথে অভিযোজিত করা সময়োপযোগি কাজ হবে। বন্ধুর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে অতি প্রতিক্রিয়া পরিহার করা সমীচিন মনে করি। পারিবারিক ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগে পুরনো এনালগ পদ্ধতিরগুলোর ব্যবহার বাড়ানো অবশ্য কর্তব্য জ্ঞান করি। সব শেষ কথা হলো, বন্ধু ছাড়া আমি চলতে পারব এমন মনোভাব স্বাস্হ্যকর বন্ধুত্বের কোন কাজে আসে না। আমরা বন্ধুরা এমন ভাবনা পরিহার করতে পারি। একজন ভাল বন্ধু অনেকগুলো লাইব্রেরির সমান। বন্ধু হারালে সবসময় দুজনেই হারায়।
হ্যামিল্টন, কানাডা
