
সমাজ বলি কি ধর্ম, কি আইন, কি রাষ্ট্র, এগুলো সবই কল্পিত বাস্তবতা। খুব সহজ কথায়, এগুলো একেকটা গল্প যাকে কিনা বহুসংখ্যক মানুষ বাস্তব বলে বিশ্বাস করে, আর করে বলেই তার কদর বেড়ে যায়। এই গল্পের বিশ্বাসীরা যতক্ষণ সংগবদ্ধ থাকে, যতক্ষণ তাদের বিশ্বাস অটুট থাকে, ততক্ষণ সেই গল্প টিকে থাকে; বিশ্বাস চলে গেলে সেই গল্পই হয়ে পড়ে মিথ। যে কোন রাষ্ট্রের টিকে থাকাটা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইতিহাস নামক গল্পের শক্তিময়তার ওপর। শুধু ইতিহাস তো না, রাষ্ট্রকে ঘিরে একধরণের রূপক জন্ম নেয়, যা কিনা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে টেনে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশের বেলায় তেমন রূপক হচ্ছে সোনার বাংলা। এই রূপকের জন্ম রবীন্দ্রনাথের হাতে এবং ১৯৬২ সালে যখন বঙ্গবন্ধুর মাথায় বাংলাদেশ প্রকল্পটি ঘুরপাক খেতে শুরু করে, তখন রবীন্দ্রনাথের এই সোনার বাংলা রূপকটি তীব্র হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি তার আগেই বঙ্গবন্ধুর ঘুম কেড়ে নিয়ে থাকবে, কারণ, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয় অর্জন করার পরে প্রাদেশিক পরিষদের সভার উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে একে বেছে নিয়েছিলেন এবং সনজিদা খাতুনকে বলেছিলেন গানটির সমবেত কোরাস গাইতে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন” স্লোগান বাঙালিকে এমন এক ঘোরের মধ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল, যার মধ্যে জাতি আজও ডুবে আছে। আমাদের ইতিহাস পাঠ যত বৈচিত্র্যময় হোক না কেন, বাংলাদেশ নামক গল্প এবং সোনার বাংলা নামক রূপকে বিশ্বাস করে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সোনার বাংলার চেয়ে শক্তিশালী কোন রূপক জাতি এখনও খুঁজে পায়নি। এমনই শক্তিশালী রূপক যে, হিজবুত তাহিরির প্রতারকরা পর্যন্ত এই সোনার বাংলার কথা বলে মানুষকে ধোঁকা দেয়! অথচ, এদের কার্যকলাপে সোনার বাংলার কোন চিহ্ন পর্যন্ত নাই। তারা যেহেতু নিজের মগজে চলছে না, সেজন্য তারা জানেও না যে, মার্কিন প্রকল্পের আওতায় যতগুলো দেশে অভ্যুত্থান কিংবা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সেই দেশগুলো শ্মশানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ যদি অচিরেই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ ধরতে সক্ষম না হয়, তো সোনার বাংলার শ্মশান হওয়াটা কেউ ঠেকাতে পারবে না।
ক্যালগেরি, আলবার্টা
