আনিসের মৃত্যু পরবর্তী রহস্য

আনিসের মৃত্যু পরবর্তী রহস্য

আমি জানি, আমাদের দু’জনকে বাইরে থেকে নিখুঁত দম্পতি হিসেবে দেখাতো।

আসলেও আমরা তাই ছিলাম। একটা ছোট্ট বালিকা যেভাবে রূপকথার মতো তার রাজপুত্রের সাথে রোমান্সের স্বপ্ন দেখে আমাদের প্রেমটাও ছিল ঠিক সেইরকম। মাঝে মাঝে নিজেকে চিমটি কেটে দেখতাম যে আমাদের জীবনে যেসব সুখকর ঘটনা ঘটছে সেটা সত্যি সত্যি ঘটছে কি না।

- Advertisement -

আনিস বলত যে প্রথম দেখেই নাকি ওর আমাকে বিয়ে করে ফেলতে ইচ্ছে হয়েছিল। আর সত্যি বলতে কি আমারও ঠিক তাই মনে হয়েছিল। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটের মতোই ছিল ব্যাপারটা। ওর মতো হ্যান্ডসাম কাউকে এর আগে আমি দেখিনি। ওর জন্য পাগলপারা না হওয়াটা আমার জন্য ছিল একেবারেই অসম্ভব। তখনও কিন্তু ওর ধনসম্পদ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না আমার। ওর সম্পদের পরিমাণ না জেনেই আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

প্রথম দিনই ও আমাকে একটা ফ্রেঞ্চ রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিল। জীবনে এর আগে অমন দামী কোথাও খেতে যাবার ভাগ্য আমার হয়নি। আর ও যে ওখানে আগে থেকেই  ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করেছিল তা মোটেও জানতাম না। এর আগে আমাকে কোনো পুরুষ এতটা গুরুত্ব দেয়নি বলে ঐ দিনের ডিনারটা ছিল আমার কাছে ঘোর লাগার মতো একটা ব্যাপার। সেই ডিনারেই ও যখন আমার প্রতি তার ভালো লাগার কথা প্রকাশ করে আমার হাতে হাত রাখলো, আমি সেই হাত ফিরিয়ে দিতে পারলাম না। আমাদের প্রেমের শুরু তখন থেকেই।  আমি তখন প্রেমে পড়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু  ঐ পরিস্থিতিতে আমার জায়গায় অন্য যে কোনো মেয়ে থাকলেও আনিসের প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দিতে বাধ্য হত।

দুই মাস পরের ঘটনা সে আমাকে এমন একটা রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল যেটা দেখে মনে হলো এটা বানানোই হয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের ডেট করার জন্য। একেকটা টেবিলের চারপাশ পর্দা দিয়ে ঢাকা। আনিসের উদ্দেশ্য বুঝতে বাকি থাকলো না কিছু। স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে, আমিও ওর স্পর্শ পেতে অধীর হয়ে ছিলাম। ও হঠাৎ করে  বলে উঠলো, “তোমাকে আজ একটা চুমু না দিতে পারলে আজ রাতে আমার ঘুম হবে না।” ওর কথা শুনে আমি হিহি করে হেসে উঠেছিলাম। আর আনিসও তখন আমার দিকে ওর ঠোঁটগুলো এগিয়ে দিয়েছিল। সাথে সাথে আমার শরীরের প্রতিটি কনায় যেন একটা ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিষ্ফোরণ ঘটে গেল। আনিস আমার প্রথম প্রেম ছিল না, তাই চুমুর স্বাদ আমি আগে থেকেই জানতাম। কিন্তু আনিসের চুমু আমার শরীরে এমন দোলা দিয়ে গেল যে আমার মনে ভেতর উথাল পাথাল বইতে থাকলো।

কেন জানি আমার মনে হচ্ছিল কারো প্রতি এত তীব্র আকর্ষন ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। তাই এর পরই আমি চেয়েছি আনিস থেকে দূরে সরে যেতে। কিন্তু ও আমাকে কী এমন জাদু করে ফেলেছিল যে আমি প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করতাম আনিসের দেখা পাবার জন্য। ওর একটা ফোন কল মিস হয়ে গেল কি না এটা দেখার জন্য কতবার যে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতাম। আপনাদের হাসি পেতে পারে এটা জেনে যে, ওর কল যেন সাথে সাথে ধরতে পারি সেজন্য বাথরুমে গেলেও মোবাইলটা সাথে নিয়ে যেতাম।

প্রায় আট মাস পরে আমরা আবার সেই ফ্রেঞ্চ রেস্তোরাঁয় ডিনারে গিয়েছিলাম। আমরা যখন খাবার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে করতে গল্প করছিলাম তখন হঠাৎ আনিস নাটকীয় ভঙ্গিতে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। ম্যাজিকের মতো ওর হাতের মুঠো থেকে বের হয়ে এলো একটা আংটি। হীরের আংটি। আর মুখ থেকে বের হয়ে এলো সেই অবিস্মরণীয় কথা যা আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবো না। আংটিটা দেখিয়েই ও গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “গত আট মাস তোমার সাথে আমার জীবনের সেরা সময় ছিল। যদি তুমি আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বানাতে সম্মতি দাও, তবে আমি সম্মানিত হব। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে, মুন্নি?”

এসব ঘটনা গল্প আর সিনেমায় ঘটতে দেখেছি। বাস্তব জীবনেও যে এমনটা ঘটতে পারে জানা ছিল না। আমার পুরোটা শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। ও আমার দিকে হাত বাড়ালো কিন্তু আমি ঐ আংটিটা পরার জন্য হাত বাড়াতে পারছিলাম না। আমার প্রচন্ড ইচ্ছে করছিল ওর বাড়িয়ে দেয়া সেই আংটিটা পরার জন্য অনামিকাটা এগিয়ে দেই। কিন্তু আমার শরীর যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল।

বিয়েটা হলো  আরো ছয় মাস পরে। ওর পরিবারে এমনিতেই তেমন কেউ ছিল না। আর আমার কন্যা দায়গ্রস্ত বাবা আনিসের প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে বিয়েতে সম্মতি দিতে দেরি করলেন না। বিয়ের পর আমার পরিবার ছেড়ে এসে উঠলাম আনিসের বিশাল এই বাড়িতে। আমাদের খুব ইচ্ছে ছিল বিশাল এই বাড়িটি একসময় আমাদের সন্তান সন্ততিতে ভরে উঠবে।

জীবনে এত সুখী আর কখনো হইনি আমি। না, বিয়ের পরপর বুঝতে পারলাম আনিস মোটেও নিখুঁত কোনো ব্যক্তি না। ও সারাক্ষণ তার কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। যতটা সময় তাকে কাছে পেতে চাইতাম, পেতাম তার অনেক অল্প সময়। তবুও ও ছিল আমার স্বপ্ন পুরুষ। প্রতি রাতে ঘুমুতে গিয়ে ভাবতাম কীভাবে আমি এতটা ভাগ্যবতী হলাম।

তখনও আমার কোনোই ধারনা ছিল না যে, আমার সেই প্রাণপ্রিয় স্বামীটি একটা দানব ছাড়া আর কিছু না।

অধ্যায়-  ১৪

প্রায়ই সেই দিনটার কথা মনে পড়ে যায়। সেদিন আমার জীবনের সবকিছু উলোট-পালোট হয়ে গিয়েছিল।

ঘটনাটা আনিসের সাথে বিয়ের এক বছর পরের। আমরা দু’জন বসার ঘরে বসে ছিলাম। আনিস মেঝেতে বসে তার ল্যাপটপ হাঁটুর উপর রেখে কাজ করছিল। আর আমি সোফায় বসে বসে কয়েস সামীর প্রবেশ নিষেধ পড়ছিলাম।

আমার ধারনা ছিল আনিস হয়তো ল্যাপটপে তার অফিসের কাজ করছে। কিন্তু ও হঠাৎ ল্যাপটপটা নিয়ে এসে আমার পাশে বসলো। তারপর ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ইশারা করে বললো, “মুন্নি, ড্রেসটার রং কী বলো তো?”

বইটা বন্ধ করে উঁকি দিয়ে সেই ছবিটার দিকে তাকালাম। ছবিটা ছিল স্ট্রাইপের ফুল স্লিভ একটা জামা।  “রং জানতে চাচ্ছো? সাদা আর সোনালি।”

আনিস তার মাথা আমার দিকে ফিরিয়ে হাসলো, “ না, এটা আসলে নীল আর কালো।”

আমি অবাক হলেও অন্য কিছু না বলে শুধু বললাম, “আমার কাছে তো সাদা আর সোনালি বলেই মনে হচ্ছে।”

“ধ্যাৎ! কী যে বলো না!” সে হেসে উঠল। “খুব স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে রঙটা মোটেও সাদা আর সোনালি না। নীল আর কালো। তুমি কি কালার ব্লাইন্ড?”

আমি শ্রাগ করলাম। “আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। তবে আমার কাছে স্পস্ট মনে হচ্ছে স্ট্রাইপটা সাদা আর সোনালি।”

ওর মুখের হাসি সাথে সাথে মিলিয়ে গেল। তারপর কপাল ভাঁজ করে বললো, “তোমার সমস্যাটা কী? নীল আর কালোকে বলছো সাদা আর সোনালি?”

“আমি তো যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটাই বলললাম।”

ও অনেকক্ষণ আমার দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো, “উমম… তাহলে তো তোমার চোখ পরীক্ষা করা দরকার। নয়তো মস্তিষ্ক।”

ভালো করে ওর মুখের দিকে তাকালাম। নাহ! ওখানে রসিকতার লেশ মাত্রও নেই। আমরা প্রায় দুই বছর ধরে এক সাথে আছি, কিন্তু ও কখনো এর আগে এভাবে আমার সাথে কথা বলেনি। ও বলেই চললো, “ না, আমি এটা কোনাভাবেই মেনে নিতে পারছি না, মুুন্নি। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না এমন একটা মেয়েকে আমি বিয়ে করলাম যে কি না সাদা,  সোনালি, নীল আর কালো রঙকে আলাদা করতে পারছে না।”

“এক্সকিউজ মি?” হঠাৎ খুব রাগ হলো আমার।

“এক্সকিউজ মি!” আনিস চিৎকার করে উঠল। কিছু বুঝে উঠার আগেই হাতের ল্যাপটপটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। “এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ড্রেসটা নীল আর কালো। আমি চাই তুমি এটা স্বীকার করো।”

আমি মুখ খুললাম, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।

“ড্রেসটা অবশ্যই অবশ্যই নীল আর কালো রঙের,” আনিস আবার বললো। “ব্যাপারটা তুমি এক্ষুনি স্বীকার করো।”

আমি কাঁধ ঝাকিয়ে বললাম, “ওকে, তুমি চাইলে আমি এটা বলতেই পারি। কিন্তু আমি নিশ্চিত রঙটা সাদা আর সোনালি।”

আনিসের চোখগুলো সাপের মতো ছোটো হয়ে গেল।  চোখের দুটো ভুরু কাছাকাছি চলে এলো। ত্রিশ সেকেন্ডের মতো আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কোনোকিছু না বলে উঠে পড়লো। একটু পরে দরজায় ধাম করে শব্দ শুনতে পেলাম আর তারপর জানালা দিয়ে কালো ফিল্ডার গাড়িটা বের হয়ে যেতে দেখলাম।

তারপর দুই দিন সে আর বাসায় ফিরে এলো না।

এই দুইদিন আমি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। থানাতেও গিয়েছিলাম জিডি করতে।  কিন্তু যখন তাদের বললাম সে নিজের ইচ্ছায় বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। তখন তারা আমাকে জানালো তাদের তদন্ত শুরু করতে বাহাত্তর ঘন্টা সময় লাগবে। তারা আরও বলল যে, নববিবাহিত দম্পতিদের মাঝে মাঝে নাকি এরকম ছোটোখাছো কলহ বা ঝগড়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তারা আমাকে অপেক্ষা করতে বললো আর আশ্বাস দিলো কিছুক্ষণের ভেতরেই সে বাসায় ফিরে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে।

আর পুলিশের কথাই সত্যি হলো। আনিস দুই দিন পরে হাতে বিশাল একটা ফুলের তোড়া আর র্যাপিং কাগজে মোড়া একটা বাক্স হাতে বাসায় ফিরলো। দরজা খুলে দেয়া মাত্রই আমাকে তার বাহুতে জড়িয়ে ধরল। আমার ভেতর তখনো বেশ খানিকটা রাগ থেকে গেলেও কয়েক মিনিটের ভেতর সব ভুলে গেলাম। অন্ততপক্ষে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তো ও ফিরে এসেছে, তাই না? আমি জানতাম হানিমুনের পর থেকে প্রতিটি দম্পতির মধ্যে প্রায়ই একটু-আধটু তর্ক হয়। আমাদের ক্ষেত্রে হয়তো হানিমুন পর্ব শেষ হতে একটু দেরি হয়েছে।

“ফুলগুলো খুব সুন্দর,” আমি বললাম।

“ফুল সুন্দর, ঠিক আছে। কিন্তু এগুলো কিছুতেই  তোমার মতো সুন্দর না।”

বুকের ভেতর গভীর স্বস্তি অনুভব করলাম। হ্যাঁ, দুইদিন লাপাত্তা থাকার জন্য আমি তখনো আনিসের উপর রেগে ছিলাম। কিন্তু এটা তো মামুলি একটা ঝগড়া ছিল। এমন কত কত ঝগড়া করে কত কত দম্পতি তাদের সংসার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এটা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।

আনিস তখন উপহারের বাক্সটা আমার হাতে তুলে দিলো। “এটাও তোমার জন্য!”

র্যাপিং কাগজের ভেতরে একটি সুন্দর সাদা বাক্স ছিল, যা কি না সোনালি একটা ফিতা দিয়ে বাঁধা ছিল। বাক্সটার ভেতর নিশ্চয়ই আমার জন্য সারপ্রাইজ আছে- এটা ভেবে বাক্সটা আমি ইনটেক রেখে দিতে চাইলাম। আনিস তখনই খুলে দেখতে বললো। অগত্যা খুলতে বাধ্য হলাম। কিন্তু বাক্সটা খোলা মাত্রই আমার দম বন্ধ হবার মতো অবস্থা হলো। আমি আনিসের দিকে তাকালাম।

ওর মুখে তখন অদ্ভুত রকমের হাসি। বললো, “এবার বলো ড্রেসটার রঙ কী?”

সাদা বাক্সটার ভেতরে ভাঁজ করা সিল্কের জামাটার দিকে তাকালাম। “নীল আর কালো,” আমি ফিসফিস করে বললাম।

“ঠিক বলেছো,” সে এমন করে কথাটা বললো যেন আমাকে সে রং চিনতে শেখাচ্ছে। “আর বাক্স আর ফিতার রং কী?”

“বাক্সটা সাদা আর ফিতাটা সোনালি।”

“গুড জব। রঙের পার্থক্যটা এখন ধরতে পেরেছো তো?”

আমি বললাম, “কিন্তু ঐ ছবির ড্রেসটার রং আলাদা ছিল।”

“না, আলাদা ছিল না!” আনিস চিৎকার করে উঠল। “ছবির পোশাক আর এটা একই পোশাক! তুমি তখন ভুল ছিলে, মুন্নি। ভুল!”

আনিস তখন তার প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনটা আনলক করে  আমার মুখের সামনে ধরলো।  আমি দেখতে পেলাম ওটা সেই স্ট্রাইপযুক্ত ড্রেস।

“এখন বলো, এখানে কী রং আছে? ” সে জানতে চাইল।

“সাদা আর সোনালি,” আমি ফিসফিস করে বললাম।

” ড্রেসের রংটা জানতে চাইছি।”

অনুভব করলাম আমার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়া শুরু করেছে।

আর আমার স্বামীর মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেছে। সে এতটাই রেগে গিয়েছিল বলে বুঝাতে পারবো না। এমন রাগ আমি আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল সে তার চোখ দিয়ে আমাকে গিলে খেতে চাচ্ছে। “ড্রেসটা পরে নাও,” আনিস গর্জে উঠল।

“আমি…” হাতের পেছন দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলাম। “এখন না… অন্য সময় পরব, ঠিক আছে?”

“যদি তুমি এক্ষুনি এটা না পরো,” সে হিসহিস করে বললো, “আমি তোমাকে গারদের ভেতর ঢোকাব।”

“গারদে ঢোকাবে?” বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে আনিসের দিকে তাকালাম। “কিসের জন্য? আমি কী করেছি?”

“বিভ্রান্তি!” সে তার ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দিলো। “ চাইলে এখন আমি খুব সহজেই এটা করতে পারি। মানসিক হাসপাতালের পরিচালক আমার বাবার ভাইয়ের কাজিনের কলেজের পুরনো রুমমেট। আমি যা বলবো সে তাই করবে।”

আমি সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালাম, “না, তুমি এসব করতে পারো না আনিস। আমি তোমার বউ। তুমি মিথ্যা কথা বলে আমাকে পাগল বানাতে পারো না। ”

“আমার কথা না শুনলে আমি এটাই করবো।” তার মুখটা তখন বেগুনির মতো গাঢ় হয়ে গেছে। “ড্রেসটা এখনই পরে নাও!”

জীবনে আমি কখনো এত ভয় পাইনি। দৌড়ে শোবার ঘরে চলে গেলাম এবং দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম। সে দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে থাকল। আর ভয়ংকর ভাবে চিৎকার করতে থাকলো। একসময় দরজা এবং মেঝের ফাঁক দিয়ে জামাটা ঢোকানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। তখন মনে হচ্ছিল সে হয়তো দরজাটা ভেঙে ফেলবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আনিস শান্ত হয়ে গেল।

কিন্তু এর পর থেকে আর কিছুই আগের মতো ছিল না। আনিস ক্ষেপাটে হয়ে পড়েছিল। এক সকালে ঘুম থেক উঠে দেখি আমার ক্লোজেটটা নীল আর কালো ড্রেসে ভর্তি।

আমার জন্মদিনের জন্য সে আমাকে একটি নীল একটা কেক দিয়েছিল, যার উপর কালো অক্ষরে লেখা ছিল: “শুভ জন্মদিন, মুন্নি।”

বাইরের পৃথিবী আমাদেরকে ভাবতো খুব হাসিখুশি একটা দম্পতি। তাদের কোনো ধারণাই ছিল না, আমাদের বাড়ির ভেতরে কী ঘটছে। বাইরের পৃথিবীটা যখন সাদা-সোনালি ড্রেসের বিতর্ক ভুলে গিয়ে অন্য বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছিল— পাঁচই আগস্টের ঘটনার পরবর্তী জীবনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছিল- তখন সাদা-সোনালি বিতর্ক আমাদের দাম্পত্য জীবনকে গ্রাস করে ফেলেছিল।

তারপর হঠাৎ একদিন আনিস ঘোষণা করলো, সে বাবা হতে চায়। এই ভেবে সে যখন আমাকে একটি নীল-কালো স্ট্রাইপযুক্ত বাচ্চাদের একটা পোশাক উপহার দিলো। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি কখনো সন্তান ধারণ করবো না। তাই গর্ভবতী না হওয়ার জন্য গোপনে গোপনে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করলাম।

কিন্তু এমন করে তো আমি চিরটা কাল কাটাতে পারবো না। আনিস ছিল একটা টিকটিক করা টাইম বোমা। এভাবে চলতে থাকলে একদিন না একদিন আমার প্রতিবেশীরা আমাকে বাথরুমে নীল-কালো সিল্কের মাফলার দিয়ে শ্বাসরোধ করা অবস্থায় খুঁজে পাবে। এর আগেই আমাকে কিছু একটা করতে হবে।

কিন্তু আনিস যে আমাকে কখনো ছাড়বে না এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম।  সে আমাকে তার সম্পত্তি ভাবতো। আমাকে ছাড়তে ও কখনো রাজি হবে না।

এই উপলব্ধি যখন মাথায় এলো তখনই আমার মুক্তির একমাত্র উপায়টা খুঁজে পেলাম। আমি বুঝতে পারলাম তখনই আমি এই বিয়ে থেকে ডিভোর্স পাবো যেদিন আমাদের মধ্যে কেউ একজন মারা যাবে।

- Advertisement -

Read More

Recent