
আজকে আমার ছুটি। আজ রোববার। কোথাও যাই বা না যাই, আজকে আমি ৯ আইসক্রিম লেনের একটি ফ্ল্যাটে যাবোই। রোববার বলেই এই বাড়িতে আসার সময় হয়েছে। ইচ্ছে হয় প্রতিদিন আসি। সারাক্ষণ এখানে বসে থাকি। এই বাড়িতে ইকবাল হাসান থাকেন। কবি ইকবাল হাসান। আমাদের প্রিয় ইকবাল ভাই। একটা সময় ছিল, সময়কে হুল্লোড়ে ভরিয়ে রাখতে আমরা ছুতো খুঁজতাম। কারো সাফল্য-ব্যর্থতা, আনন্দ বা বেদনার যে কোন একটা ছুতোর সুতো পেলেই আমরা তা হুল্লোড়ের দলায় পাকাতে শুরু করতাম। বলা বাহুল্য ইকবাল ভাই-ই আমাদের দলনেতা। দু’একটা উদাহরণ দেই :
* আড্ডা জমে উঠেছে। রাতও গভীর হয়েছে৷ ক্রমে আড্ডার সদস্য কমতে কমতে তিনজনে এসে থেমেছে৷ কিন্তু আমাদের হাসির গমক কমছে তো না-ই, বরং আরো বেড়েছে। যে বিষয় উত্থাপন করে হাসির খোরাকি, সেই বিষয়ে সম্যক দখল আছে আমাদের আরেক বন্ধু সুমন রহমানের। তিনি এই আড্ডায় উপস্থিত নেই৷ অতএব, যত গভীর রাতই হোক, সুমন রহমানের নিউ মার্কেটের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়া!
* শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী ‘কালের ধুলোয় লেখা’ অন্যপ্রকাশ থেকে বের হবে৷ খুবই আনন্দের খবর। কিন্তু এর চেয়ে আরো বড় আনন্দের খবর, স্বয়ং শামসুর রাহমান চেয়েছেন বইটির প্রচ্ছদ যেন মাসুম রহমান এঁকে দেন। অতএব, আমাদের দাবী হুল্লোড় পার্টি।
* যেদিন সূর্য পূর্ণ আকাশে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দেয়, সেদিন আমরা আমিষ খাই। যেদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে সেদিন ইলিশ পোলাও। আমাদের কাজ হলো কষ্ট করে বন্ধু হোসেনকে জানানো। পানাহারের সকল ব্যবস্থা হয়ে যেতে যাদুর মতো। আমরা গল্পে, গুজবে, গর্হিত বিষয়কে কচলে মিষ্টি করে মাতিয়ে রাখতাম৷ কোন অমরাবতীর পাখনায় সময়ের দূরন্ত উড়ে চলাকে আমি বুঝতে পারতাম না। সময়কে গণ্য করাই যেন একটা অপরাধ ছিল।
উপরে বর্ণিত গল্পগুলো এখন লিখছি ৯ আইসক্রিম লেনের ফ্ল্যাটের দোতলায় ইকবাল ভাইয়ের সামনে বসে৷ ইকবাল ভাই লম্বা দুটি পা ছড়িয়ে পিটের দিকে তিনটি বালিশ ঠেশ দিয়ে আধোঘুম, আধোশোয়া অবস্থায় আছেন৷
ইকবাল ভাইয়ের প্রথম দিককার কাব্যগ্রন্থ ‘অসামান্য ব্যবধান’। অপরূপ এই বইটির প্রচ্ছদ। শিল্পী কাজী হাসান হাবিব। অসামান্য ব্যবধান কাব্যগ্রন্থে একটা কবিতা আছে ‘গ্রীন রোডে এক রোববার’। গ্রীন রোডে আব্দুল মান্নান সৈয়দের পৈত্রিক বাড়ি। তাঁর বাড়ির পাশেই একটা রেস্তোরাঁ। নাম ‘আপ্যায়ন’। এই আপ্যায়ন রেস্তোরাঁয় রেগুলার আড্ডা পেটাতেন – শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, মাহমুদুল হক এবং অতি অবশ্যই আব্দুল মান্নান সৈয়দ। এই আড্ডার কনিষ্ঠতম সদস্যদের একজন ইকবাল হাসান। ইকবাল ভাইয়ের সমসাময়িক আবিদ আজাদ, আতাহার খান, শিহাব সরকারও এই আপ্যায়নের আড্ডায় আসতেন।
বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের আড্ডাবাজ দিকপালদের সাহচর্য, বন্ধুত্ব ও প্রশ্রয় পেয়েছিলেন ইকবাল ভাই। সেই আড্ডারই একটা ছবি আছে নিচে বর্ণিত কবিতাটিতে।
তার এই আড্ডাপ্রবণতা বা আড্ডাপ্রিয়তা এতোটাই বন্ধুদের আনন্দের সঞ্চার করতো যে, যে কোন একটা উপলক্ষ হলেই ইকবাল ভাইকে সামনে রেখে আড্ডার আয়োজন হয়ে যেত দ্রুত। আড্ডার মূল উপাদান যদি হয় গল্প, তাহলে এর সম্পূরক হলো খাদ্য। খাদ্য আয়োজনে বা রান্নায় ইকবাল হাসান এবং আমার কোন অলসতা নেই৷ মাছ হোক, মাংস হোক, পাস্তা হোক, আড্ডা দিতে দিতেই ইকবাল ভাই এবং আমি সেই আয়োজন করতে পারি অনায়াসেই। অতএব, আমাদের আড্ডা হয় আরো প্রাণচঞ্চল। আরো আনন্দময়৷
আজ রোববার। গত রোববার ছিল ইকবাল ভাইয়ের ৭০তম জন্মবার্ষিকী। এই শহরের সবচেয়ে আনন্দময় একটা আয়োজনের স্বপ্ন ছিল ইকবাল ভাইয়ের জন্মবার্ষিকীকে উপলক্ষ করে৷ ইচ্ছে ছিল তাঁর জন্য সম্মাননাগ্রন্থ সম্পাদনা করার। অনেকের সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। ইকবাল ভাই কত মানুষের জন্মদিন পালন করে তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছেন। বন্ধুদের ডেকে আনন্দের আয়োজন করেছেন৷ এসব আয়োজনে প্রায়শই ইকবাল ভাই নিজেই রান্না করতেন। মাঝে মাঝে রান্নায় তাকে সাহায্য করার সুযোগ আমার হয়েছে৷ রান্নার ব্যাপারে আমাদের পারস্পরিক আস্থা অনেক শক্ত। উনসত্তরতম জন্মবার্ষিকী পালন করে ইকবাল ভাই দেশে গিয়েই অসুস্থ হয়ে গেলেন৷ আমিও আমার আম্মাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে দিশেহারা হয়ে গেলাম। কোন পরিকল্পনাই আর অব্যাহত থাকলো না। সামনে যে কর্তব্য এসে হাজির হলো – তা সম্পাদন করাই হলো প্রথম ও প্রধান কাজ। দিনযাপনের এই দিনগুলোতে এই তো আমার দিনরাত্রি!
ইকবাল ভাইয়ের শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। কিন্তু, এখনো তার মুখ থেকে একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই বুঝা যায়, কত স্পষ্ট তার কথার ধ্বনি! কত স্পষ্ট তার প্রকাশভঙ্গী! আসুন, ইকবাল ভাইয়ের কবিতাটি পড়ি।
গ্রীন রোডে এক রোববার
ইকবাল হাসান
[ আব্দুল মান্নান সৈয়দকে ]
আজ রোববার, কোথাও যাবো না আমি, কোথাও যাবো না।
কিশোরীর নীল শাড়ির মতো গ্রীলের বাইরে যদিও আকাশ
তার নিষ্পাপ গ্রীষ্মের ছেঁড়া কাগজের মতো পলকা পলকা মেঘ
এভেনিউ জুড়ে কৃষ্ণচূড়ার লাল হাতছানি আর
কিবরিয়ার ছবির মতোন উদ্যানের টুকরো টুকরো ক্ষেত্রের উপর ঝিম মেরে বসে থাকা হিরন্ময় অসংখ্য দুপুর কিংবা রমনার উদাসীন নিরীহ প্রকৃতি
যতোই দু’হাত তুলে আমাকে ডাকুক – আজ রোববার
কোথাও যাবো না আমি, কোথাও যাবো না।
ঐ মায়াবী আলোয় ভরা আপ্যায়নের চেয়ার টেবলগুলো বেড় বেশী টানছে আমাকে
তিনটি ফ্যানের ব্লেডে ঘূর্ণায়মান বাতাসে ধোঁয়ার মিতালী
কিংবা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত কোন কবির গাঢ় উচ্চারণের ভেতর
ঐযে কমলালেবুর কোয়ায় মতো ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া ধূসর পৃথিবী
তার প্রতিটি অলিন্দ থেকে ডাকছে আমাকে
আজ রোববার, কোথাও যাবো না তবু, কোথাও যাবো না। শুধু সুউচ্চ ভবন থেকে আত্মহত্যা বুকে নিয়ে লাফিয়ে পড়া ব্যর্থ তরুণের মতো
একবার তোমাদের কাছে যাবো, শুধু একবার
তোমাদের ভালোবাসার কাছে
তোমাদের ইন্দ্রনীল রহস্যের কাছে
টরন্টো, কানাডা
