দেখা না দেখার গল্প

ছবিরায়হান নূরী

আজ ঠিক বারো বছর পরে পুষ্প আপুর সাথে আমার দেখা ,আসলে দেখার ব্যবস্থা করতে হলো ভীষন গোপনে অথচ এই পুষ্প আপুর সাথে আমার যখন তখন দেখা হতো,কথা কিংবা গল্প, কিন্তু আমরা মানুষেরা নিয়তির হাতে বন্দী,এখনো জানিনা পর মূৰ্হতে ঠিক কি হতে যাচ্ছে …

আমার কথাঃ
পুষ্প আপু আমার বড় খালার মেঝ মেয়ে,অসম্ভব রকমের সুন্দরী ; এই পৰ্যন্ত আমার দেখা পৃথিবীর সব মেয়ের থেকে,সত্যি বলছি আমাদের দেশে পুষ্প আপুর মতো এমন একটা মেয়ে থাকতে পারে কেউ কল্পনাও করতে পারবেনা। খুব সকালে যখন সোনা ঝলমলে রোদ উঠে আকাশ আলো করে ,কি রকমের একটা প্ৰশান্তি লাগে, মোলায়েম একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয় দেহমনে অনেকটা সেরকমের,পোঁড়ায় না কিন্তু ভীষন সিগ্ধতায় ভরা। বেশীক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না, কেমন যেন শ্ৰদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে কিন্তু পর মূৰ্হতে চোখ বন্ধ করে মনে হতে থাকে ,ইস্ আরেকটু দেখি!

- Advertisement -

আর আমি কিনা সেই পুষ্প আপুর প্ৰেমে পরে গেলাম সবে যখন ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠেছি! আমার বয়স চৌদ্দ চলছে তখন আর পুষ্প আপুর তেইশ ! কি অসম্ভব কথা ! আপু ওর অন্যান্য বোনদের নিয়ে খালার সাথে ছুটিতে বছরে দু’একবার আসতো।খালু ম্যাজিস্টেট ,কাজের সুবাদে বদলির চাকরি।আমরা ঢাকায় , আমার জন্ম মা-বাবার বিয়ের দশ বছর পরে নানু বাড়ীতে।একে তো এতো বছর পরে মায়ের কোলে সন্তান তাই মা আমার বড় হওয়া পৰ্যন্ত নানু বাড়ীতেই থেকে যাওয়া মনস্তির করলো,বাবার যেহেতু ঢাকায় ব্যাবসা তাই বাবা আসা যাওয়া করতো,তাছাড়া যৌথ পরিবার থাকায় আমার অন্য দু চাচু বাবার ব্যাবসার অংশীদার ছিলো। আর সেই সময়ে বড় খালুর যেহেতু বদলির চাকরি,খালাতো ভাই বোনেরা ছোট্ট, ছোট্ট তাই বড় খালাও নানু বাড়িতে, আমার কোন মামা না থাকায় নানা-নানু তার তিন মেয়েকে চাইতো যতোটা কাছে রাখা যায়।

বিরাট বাড়ী , এ মাথা থেকে ও মাথা সুন্দর অৰ্ধবৃত্তাকার বাড়ী ,সামনে বিশাল চত্বর, সেখানে ফুলের বাগান,চারপাশে ফলের গাছ ,কি গাছ নেই নানা বাড়ীতে ,এমনকি জলপাই গাছ পৰ্যন্ত। বাড়ীর পেছনে শান বাধঁনো ঘাটলা, এক কোণে আবার কুয়ো,সাথে টিউব কল। এ সবই নানা তার বাবার থেকে পেয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে।

সেই বাড়ীতে আমি মা,খালা,নানু আর সেইসাথে খালার মেয়েদের কোলে পিঠে মানুষ হতে থাকলাম। খালার আরো তিনটা ছেলেও আছে ,ওরাও আমার বড় ,শুধু ছোট্ট মেয়ে দুটো রিমকী আর ঝুমকী ছিলো আমার ছোট্ট। যেহেতু তখন পৰ্যন্ত আমি ছিলাম সংসারের ছোট্ট বাচ্চা এবং অসম্ভব আদুরে দেখতে আর ভীষন চুপচাপ একটা বাচ্চা তাই সবাই আমাকে আদর করতো।বেশীর ভাগই পুষ্প আপু করতো,খাওয়ানো ,মা গোসলে গেলে সারাবাড়ী ঘুরে ঘুরে সেই দুপাশে দুবেনী ঝুলিয়ে আমাকে কোলে নিয়ে নাকি সারাবাড়ীময় ঘুরে বেড়াতো যতক্ষন না আমার ঘুম আসতো ,এসবই মার কাছে শোনা,আরো কতো গল্প।আমি কখনো কখনো চোখ বন্ধ করে পুষ্প আপুর সেই ছোট্ট বেলার মুখটা কল্পনা করতে চেষ্টা করি ,আর সেই আমি কি করে পুষ্প আপুর প্ৰেমে পড়ে গেলাম?

আমার দাদা ছিলো পীর বংশের, তাই নানু বাড়ীর থেকে দাদা বাড়ীর অবস্থা আরো রক্ষণশীল।অবশেষে আমার বয়স যখন ছয় হলো এবং স্কুলে যাবার বয়স হলো মা চলে এলো দাদা বাড়ীতে। একসাথে আমার স্কুল এবং সন্ধ্যায় দাদার মাদ্ৰাসায় পড়ছি।এভাবেই বাল্যকাল কেটে গেলো ,ইতিমধ্যে আমার আরো দুটো বোন হয়েছে ,ছোট্ট একটা ভাই এসেছে মার কোল জুড়ে তবুও আমার জন্য মায়ের আদরের কমতি ছিলোনা।আস্তে আস্তে সেই অচেনা কৈশরে পা রাখি।সব নতুন, মনে, শরীরে অজানা অনুভূতি, সব কথা সবাইকে বলা যায় না হূট করে ,তাছাড়া আমাদের রক্ষনশীল পরিবার,তার থেকে পাওয়া সংস্কার সব মিলিয়ে এক কঠিন অবস্থা। পুষ্প আপুরা ঢাকায় এলেই আমাদের বাড়ীতে আসতো ,আপু তখন কখনো সালোয়ার-কামিজ,কখনো সখ করে মার কিনে রাখা নতুন শাড়ী পরে সারা বাড়ীতে ঘুরে বেড়াতো। চোখে চোখ পড়লেই আপুর সেই মায়াবী চাহনী দিয়ে মিষ্টি হাসি, কখনো বলতো,” কি রে আসফী, খুব ব্যস্ত বুঝি আজকাল ? ছোট্ট বেলায় তো আমার কোল ছেড়ে নামতি না ! আর এখন তো তোর সাথে দু’ দন্ড বসে কথাও বলতে পারিনা ! কতো যে আদর করতাম তোকে,মনে নেই বুঝি ?”

আমি কি বলবো ? অতো ছোট্টকালের কথা কি মনে আছে বুঝি? তাছাড়া আপুকে দেখলেই কি যেন হতে থাকে আমার, মনে হয় অনেক কথা বলতে ইচ্ছা করে কিন্তু কোথায় যেন সব সাহস আমাকে আটকে রাখে। কখনো মনে হতে থাকে আপু যদি পোষ্টারের ছবি হতো তাহলে মন ভরে কাছ থেকে দেখতাম শুধু কিন্তু আপু এতো বেশী সুন্দরী যে এই কিশোর আমি কেমন যেন সন্মোহিত হয়ে যাই ,সবাই মিলে একসাথে খেতে বসলে গলা দিয়ে খাবার নামতে চায়না,আবার মনে হয় বসে থেকে আপুর খাওয়ার দৃশ্য দেখি ,কি সুন্দর করে ভাতের লোকমা করে মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে চিবুচ্ছে,কখনো স্বচ্ছ টলটলে চোখ তাকিয়ে বলে,”এই রে আসফী তুই খাচ্ছিস না কেন ? এতো কম খেলে কি হয় রে ! আয় তোকে খাইয়ে দিই।” আমি একঘর লোকের সামনে লজ্জা পেয়ে দৌড়ে পালাই।কেন যেন সেই আগের মতো স্বাভাবিক হতে পারছিনা ,মনে হচ্ছে সবাই যদি বুঝে ফেলে কি হচ্ছে আমার ভেতরে! আবার কখনো মনে হয় আচ্ছা পুষ্প আপু বুঝতে পারেনি তো!

এ এক অদ্ভুত অনুভূতি আমি কারো সাথে শেয়ার করতে পারছিনা শুধু মনে হয় আপু আমার থেকে ন’বছরের বড় তো কি হয়েছে? দেখে একটুও বুঝার উপায় নেই, একহারা সোনালী গড়ন, দিঘীর মতো গভীর চোখ ,সেখানে কি আছে আমি আদৌ জানিনা,ভালোবাসা না কষ্ট? রেশমের মতো ঝলমলে চুল। মাটিতে খালি পায়ে ভোড়ে শিউলি কুড়াতে গেলে কি আলতো করে পা ফেলে যাতে পাছে একটাও ফুল না মাড়ায় ,আমি আমার দোতলার জানলা থেকে চুপিচুপি সেই পদ্নপাতা সদৃশ্য পায়ের পাতা দেখে মুগ্ধ হই, মনে হয় সব শিউলীর বোটা থেকে কমলা রং এনে রাংগিয়ে দিই পুষ্প আপুর পায়ে।

কিন্তু কখনোই কিছু বলা হয়নি পুষ্প আপুকে।একবার আপু বলেছিলো,” জানিস তোকে এতো মায়া করি যে কাছছাড়া করতে মনে চাইছে না, তুই রিমকী বা ঝুমকী কাউকে বিয়ে করে ফেল তাহ’লে আমাদের কাছেই থেকে যাবি সারা জীবন ।”

কিন্তু বলা হয়ে উঠেনা যে, “পুষ্প আপু আমি শুধু তোমাকেই চাই, তোমার সামনে রিমকী/ঝুমকী কিচ্ছুনা কিন্তু আমি ভীষন ছোট্ট তাই তোমাকে সেই কথা কখনো বলা হবে না ,তুমি আমার জীবনে প্ৰথম নারী যাকে না ছূঁয়েই তার সমস্ত অনুভূতি আমি ছূঁয়ে দিতে চাই।” বলা হ’লো না ,” তুমি কি আমাকে কখনো সেই অনুভূতি দিয়ে ভালোবেসেছ যেই অনুভূতি দিয়ে এইজন মানবী তার ভালোবাসার মানবকে স্পৰ্শ করে ? তাহ’লে বুঝতে তোমার জন্য আমার মন কেমন করে ?”

কিছু না বলেই আমার নিভৃত প্ৰেমকে উপেক্ষা করে নিষ্ঠুর নিয়তি পুষ্প আপুর সাথে অনিকেত ভাইয়ার বিয়ের খবর দিলো। সামনে আমার এস,এস,সি পরীক্ষা এই অজুহাতে যাবোনা বলে বাড়ীর সবাইকে বলে দিয়েছি কিন্তু সেই সময়ে এক দুপুরে ডাক পিয়ন আমাকে একটা চিঠি দিলো,সুন্দর বিবাহের কাৰ্ড ,কি মায়াবী ঝরঝরে হাতের লেখা মনে হয় লেখার ভেতর থেকে পুষ্প আপুর টলটলে মায়াবী মুখখানা বেরিয়ে আসছে। খুলে দেখি আপুর বিয়ের কাৰ্ড,ভেতরে একটা চিঠি,বুকের ভেতরটা কেমন হূ হূ করে উঠলো।চিঠি খুললাম…

“আসফী আমার”,
খুব অবাক হয়েছিস না ? ভেবেছিস তোকে ফেলেই আমি বিয়ে করে ফেলবো ? কক্ষনো না ,তুই যদি না আসিস তবে আমি কিন্তু সত্যিই বিয়ে বাড়ী থেকে পালাবো রে! ভালো হতো যদি একসংগে পালাতে পারতাম ; সেটা সম্ভব নয় বলেই তোর জন্য মায়াগুলো জীবনভর তোলা থাকবে রে।
তোর আসার অপেক্ষায়।
পুষ্প আপু।
আমি পুষ্প,
আসফীটাকে সেই ছোট্ট বেলা থেকে দেখছি, খালামনির এততো আদরের ছেলে, এতো বছর পরে , প্ৰথম যেদিন দেখলাম ; মনে হলো দেবশিশু দেখছি,ছোট্ট শরীর, কেমন ছোট্ট চোখের চাহনী, ছোট্ট ছোট্ট আংগুল, আমার এই ছোট্ট ভাইটার জন্য কোথথেকে যেন মায়ার সমুদ্ৰ এসে আমাকে ডুবিয়ে দিলো,অনেকটা মায়ের স্নেহে,বোনের আদরে আসফীর জন্য আমার মায়া বেড়ে চললো । কিন্তু আসফী যখন নানুবাড়ী থেকে স্কুলের জন্য ঢাকায় চলে গেল, আমরাও বাবার কৰ্মস্হলে তখন মনে হতে থাকলো কি যেন ফেলে এসেছি, কি যেন নেই ! কে যেন আমার বিনুনী টেনে আব্দার করে বলছে “পুষ্প আপু এটা দাও,ঐটা চাই,ঘুড়ি কিনে দাও”, ইত্যাদি হাজার স্মৃতি। কি একটা স্নেহ যেন আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিলো। নিজেকে কখনো মা ,কখনো বোন তারপর একসময় মনে হতো প্ৰেমিকা ,অথচ আমি ভুলেই যেতাম আসফী আমার সম্পৰ্কে ভাই , আর সব চেয়ে বড় কথা আমি ওর ন’বছরের বড় এবং যথেষ্ট বোধসম্পন্ন বলেই নিজেকে ভীষন লুকিয়ে রাখতাম, যখন আসফী বড় হতে থাকলো যাতে পাছে ও না আবার আমার অনুভূতি বুঝে ফেলে।

খালা বাড়ীতে বেড়াতে এলে খুব মন চাইতো আসফীর সাথে নদীর ধারে হেটে বেড়াই, কিংবা রাতে চিলে কোঠার ছাদে একসাথে জ্যোৎস্না দেখি, ছেলেটা কেমন যেন আরষ্ট হয়ে থাকে আমাকে দেখলে, আমি ভুলে যাই আমাদের বয়সের ব্যবধান, কলেজ শেষ করে যখন ভাৰ্সিটিতে ভৰ্তি হলাম তখন ডিৰ্পাটমেন্টের স্যার থেকে শুরূ করে সমবয়সী এবং সিনিয়র ছাত্ৰদের থেকে এতো এতো প্ৰস্তাব আসতো মনে হতো পড়া ছেড়ে পালাই ,শেষে বাধ্য হয়ে হিজাব ধরলাম ,কিন্তু মনের কোণে সদ্য যুবক হওয়া একটা শান্ত মুখের চাহনি আমাকে ভীষন পীড়া দিতো, আমি কখনো এসব কথা কাউকে বলতে পারতাম না , মনোবিজ্ঞানী ফ্ৰয়েডের তত্ত্বের সাথে অনেকটা মিল খুঁজে পাই আমার এই অসম ভালোবাসার, একটা ছেলে শিশু যখন মায়ের আদরে ,স্নেহে তার পুরো শৈশব (স্কুলে যাবার আগ পৰ্যন্ত ) কাটায় তখন তার জগৎ শুধু “মা” নামক একজন মানবীর সাথে পরিচিত ,মা তার খেলার সাথী, তার সৰ্বক্ষনের সংগী, তাই কখনো কখনো মায়ের সাথে বাবার ঘনিষ্ঠতাও একটা ছোট্ট শিশু মেনে নিতে পারে না। ক্রমশঃই তার জগৎ পাল্টাতে থাকে কিন্তু আমি পুষ্প আমার জগৎ কেন পাল্টাচ্ছে না ? আমি এর ব্যাখ্যা জানিনা, জানিনা সৃষ্টিকৰ্তার অপার রহস্য, নিজেকে ভীষন অসহায় মনে হয়। তারপর একসময় অনিকেতের সাথে বিয়ে, অনিকেত শিক্ষিত এবং এককথায় ভীষন সুদৰ্শন একজন ছেলে,ভালো পরিবার ,ব্যবসা করছে ,তাই মা-বাবা আর এই বিয়েতে অমত করেনি। আর আমি? ভীষন ইচ্ছে করছিলো কেন আসফীর সমবয়সী বা ছোট হলাম না ,আসলে পৃথিবীতে সব কিছু সবার জন্য না ,যার জন্য যেটা নিৰ্দিষ্ট সে ঠিক সেই সময়েই সেটা পাবে,এর আগেও না ,পরেও না। সমাজ শুনলে বলবে,” কি লজ্জাজনক ব্যাপার রে বাবা!” কিন্তু মানুষের হৃদয়ের কাছে মেধা বা বুদ্ধি অনেক সময় হেরে যায় ।আবার কখনো এর উল্টোটাও হয়, যেমন আমার বেলায়।
আসফী এসেছিলো আমার বিয়ের সময়, খুব ব্যস্ত ছিলো বিয়ে বাড়ীর কাজকৰ্ম নিয়ে। বিয়ের আগের রাতে যখন খুব গান বাজনা হচ্ছিল, খেয়াল করলাম ও দূরে দাড়িয়ে দেখছে, মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে শুধু তাকিয়ে আছে কিন্তু মন পড়ে আছে অন্য কোথাও!হয়তো ওর ভাবনার রাজ্যে অন্য কেউ এসেছে এতোদিনে ,হয়তো সেই চিন্তায় বিভোর, কখনো জানবেনা ও কি ছিলো আমার ।তারপর যখন বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম ,এতো ভিড়েও আমার একজোড়া চোখ কাউকে খুঁজছিলো ,এই শেষ …আর দেখা হয়নি।

আমার জন্য অনিকেতের ভালোবাসার কমতি ছিলো না , কাজ,ব্যস্ততা তারপরও ওর মন জুড়ে ছিলাম আমি, কেমন করে যেন সময় চলে যেতে থাকলো ,আমার কোলে জুড়ে ছোট্ট সোনা পাখিরা এলো জীবন ভড়িয়ে দিতে, আমি আমার গভীর গোপন ভালোবাসা অচিনপুরে রেখে এই দুনিয়াতে বসবাস করতে লাগলাম বেভুলা মানুষের মতো।

হঠাৎ করে গত পরশুদিন সন্ধ্যায় আমার ফোনটা বেজে উঠলো,প্ৰথমে ধরিনি কেননা নাম্বারটা পরিচিত ছিলো না, পরপর তিনবার বাজার পর ধরলাম।কয়েক সেকেন্ড লাগলো ওপাশের কন্ঠস্বর বুঝতে, আমি হ্যাঁলো বলতেই শুনতে পেলাম,”পুষ্প আপু ,কেমন আছো ?”

আমার অভিমানে গলা আটকে আসছে,অনেক কষ্টে ঠোঁট কাঁমড়ে নিজেকে সম্বরন করে বলি,” আমি ভালো আছি, এতোদিন পরে মনে পড়লো বুঝি?”
” বিশ্বাস করো মনে পড়তো কিন্তু ..”
“থাক, আর বলতে হবেনা।”
ওপাশে কিছু সময় নিরবতা,
তারপর একটু কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“আগামী কাল যে ঠিকানাটা বলবো ,ওখানে একটু আসতে পারো?”
আমি কিছু একটা প্ৰশ্ন করতে যাবো,তখুনি বলে উঠলো,” কিছু না ভেবেই বলো যে তুমি আসবে , আমার হাতে ভীষন কম সময়, ঠিকনা টা লিখো, ঠিক সন্ধ্যা সাতটায়,আমি তোমাকে ঠিকই চিনে নিবো।”
আমি কিছু একটা বলার আগেই ঠাস্ করে লাইনটা কেটে গেল!

অতপরঃ
ঠিক বারো বছর পরে আমাদের দেখা। সময় ভীষন হিসাবী, সময়ের কাজ সময় একদম ঠিকমতো করে।আসফীর কথা মতো আমি নিউ মাৰ্কেটের বইগুলোর দোকানের বাইরে হাটছিলাম।হঠাৎ একজন দাড়িমোছ ওয়ালা ,লম্বা মতো লোক আমার দিকে তাকিয়ে বললো,আমার পেছনে ফলো করো। এক মূৰ্হতের মতো সময় লাগলো বুজে উঠতে কিন্তু মানুষটা বদলে গেলেও কন্ঠস্বর ঠিকই আছে,একটু ভারী লাগছে শুধু।আমি সন্মোহিতের মতো ওর পিছে হাটছি, আজকাল খুব ঘন ঘন লোডসেডিং হয়। এখনো হলো, এই সময়ে হাতে একটা আলতো স্পৰ্শ পেলাম, আমি শিউরে উঠি সেই কিশোরীর মতো,আসলে একটু সময়ের জন্য অন্যমনস্ক থাকায় আসফী আমাকে হাতে ধরে টান দিয়ে পাশের রেষ্টুরেন্টটায় ঢুকালো , ঢুকতেই ডান পাশে কাবাবের ঝাঁঝ,বাম পাশে হালিম,মোগলাই, সিংগারা ভাঁজা চলছে,একটু ভ্যাবসা গরম, ভেতরে ঢুকতেই জেনারেটরের আলোয় টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজনের অস্তিত্ব টের পেলাম।আমি যেহেতু পৰ্দানশীল তাই পৰ্দাঘেরা ছোট্ট কেবিনটায় বসি। ছেলেটা আসতেই দুটো ড্ৰিংকস আর দুটো মুগলাই পরোটা অৰ্ডার দিলো আসফী।একটু লাজুক হেসে বললো ,”জানি এটা তোমার খুব পছন্দের একটা খাবার”।

আমি বলি,”এতো বছর পরে হঠাৎ কি এমন জরূলী কাজে আমাকে এখানে ডেকে আনা? বাড়ীতে গেলেই তো পারতি।”

আসফী খুব শুকনো মুখে বললো,”জানো তো ভাৰ্সিটির জীবনে জড়াবো না করেও কেমন করে যেন রাজনীতিতে জড়িত হয়ে গেছি, বাবা চাইছে ছুটে আসি এখান থেকে,কিন্তু বিশ্বাস কর আপু এটা এক কঠিন জায়গা, ঢুকা সহজ কিন্তু বেরুনো কঠিন।এই সরকার যে কোন কিছুর বিনিময়ে আমাকে খুঁজছে,পেলে আমি শেষ, শুধু মায়ের কথা ভেবে পালিয়ে থাকছি, বিশ্বাস কর ,খুব ইচ্ছে করছে আবার আগের জীবনে চলে যাই।আজকে রাত বারোটায় আমার ফ্লাইট, চলে যাচ্ছি ইউরোপে,তারপর জানি না ? চলে যাবার আগে মা’র সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু চারিদিকে এতো পাহারা। সেইসব চোখ এড়িয়ে মা’র সাথে দেখা করা মানে মৃত্যুর সাথে হাত মেলানো । মা’র সাথে দেখা হলে বলিস। অনেক কষ্টে তোর নাম্বারটা যোগাড় করেছি, মা’র সাথে কথাও বলা সেইফ না,ফোন রেকৰ্ড হয়।”

আমার পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যেতে থাকে,ঘামতে থাকি, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে ,এক সময় কারেন্ট এলো, যুবক আসফী একগাল দাড়ি নিয়ে আমার সামনে বসে আছে,চোখ টেবিলের দিকে নামানো,ও কখনোই আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলে না,মুখটা শুকনো,মনে হয় ক’তো দিন খায়নি, একটু তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলো ,সেই চোখে কষ্টের তীব্ৰতা।

আমার চোখে অসময়ে বাঁধ ভাংগা বৰ্ষা,দেওয়ালে একটা টিকটিকি আমাদের নিরবতা দেখে চুপচাপ করে মাটিতে পরে গেল, মনে হচ্ছিল আসফী আমার হাতটা ভুল করে আরেকবার ধরুক, সময়ের বিশাল চাকাটাকে দু’জনে মিলে একযুগ পেছনে ঠেলে দিই,নয়তো এখানে আজীবন বসে থাকি। আধ ঘন্টাকে মনে হলো অনন্তকাল, আসফী কিছুই বলছে না ,দু’জনে মুখোমুখি বসেও নতমুখি,চোখের নীচে বয়ে যাওয়া বন্যা, বিশাল অন্ধকারের পৰ্দা ঠেলে বাইরে বেরুতেই আবার লোডশেডিং, কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা, তবুও মনে হচ্ছে সব অনুভূতি দিয়ে অনুভব করছি,আর কখনো জানা যাবেনা কি ছিলো তোমার মনে, আর কখনো ঐ চোখ তুলে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নেবে না! আমি হাঁটতে যেয়ে মনে হচ্ছে পরে যাবো, কেবলই মনে হতে থাকলো ,আর একবার যদি আসফী আমার হাতটা একটু ধরতো! আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো,”পুষ্প আপু ভালো থাকিস অনেক”।

তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে থাকলো একটা শরীর, আমি অতি কষ্টে এই সন্ধ্যার অন্ধকারে দাড়িয়ে থেকে একটা অপসৃয়মান ছায়া ক্রমশই মিলিয়ে যেতে দেখলাম, আমার গলা ঠেলে দলাপাকানো কষ্টগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো, এই প্ৰথম মনে হলো আমি ভীষন একা, ভীষন ক্ষুদ্ৰ এক জীব!

- Advertisement -

Read More

Recent