
“আমরা করুণার পাত্র হিসেবে আসিনি। আমরা এসেছি মানুষ হিসেবে। তাই মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আমাদের আছে।’’ -এম এন লারমা
(বাংলাদেশ গণপরিষদ বিতর্ক, ২৫ অক্টোবর ১৯৭২)
পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা, পার্বত্য চট্রগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রস্টা এম এন লারমা’র প্রয়াণ দিবস ছিলো গত ১০ নভেম্বর।
আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সমগ্র জুম্ম জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াসে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জীবন উৎসর্গ করেছেন । ভিন্ন ভাষাভাষি ১৪টি জাতিগোষ্ঠীকে এক কাতারে নিয়ে আসতে তিনি জুম্ম জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন। মূলত জুম্ম জাতীয় চেতনা থেকেই জুম্ম জাতীয়তাবাদ শব্দের উৎপত্তি। যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুম বা পাহাড় নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারা অর্থনৈতিক জীবনধারা এবং ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাৎপদ এক সামন্তীয় শাসন-শোষণের অবসান তথা বিজাতীয় শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্য একই রাজনৈতিক আকাঙ্খা।
সমতল অঞ্চলের অনেকের ধারনা, আদিবাসীদের সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করার জন্য। মারাত্মক ভুল এই ধারনাটি সুকৌশলে ছড়িয়ে দিয়েছিল শাসকগোস্টি। তাদের প্রতি জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে পাহাড়কে অশান্ত রেখে তাদের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন উপেক্ষা করাই ছিল মুল লক্ষ্য।
এ প্রসঙ্গে স্মরন করা যেতে পারে, ১৯৭২ সালের খসড়া সংবিধান রচনার কালেও উপেন্দ্র লাল চাকমা, এম এন লারমাসহ পাহাড়ি নেতারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি সংবলিত একটি প্রস্তাবনা নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে তাৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবনাটি তীব্রভাবে নাকচ করেন। তিনি প্রতিনিধিদলকে সৌজন্যবশত বসতেও বলেননি। উপরন্তু তাঁদের মুখের ওপর প্রস্তাবনার ফাইল ছুড়ে মেরেছিলেন।
আর এভাবে ১৯৭২ সালের সংবিধানে চরমভাবে উপেক্ষিত হয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি। বর্তমান সংবিধানের মতো সেখানেও ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’–এমন কথা বলা হয়। শুধু তাই নয়, ১৪ জুন ১৯৭৫ সালে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব রাঙামাটির জনসভায় পাহাড়িদের বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা সবাই বাঙালি হইয়া যাও। আমি তোমাদের উপজাতি থেকে জাতিতে প্রমোশন দিলাম’।
এই আহবান ক্ষুদ্র নৃতাত্তিক জনগোষ্ঠির জন্য চরম অবমাননাকর। ক্ষুব্ধ আদিবাসীদের সামনে সশস্র সংগ্রাম ছাড়া অধিকার আদায়ে কোন পথ ছিল না। এরপর মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ও তার দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পক্ষে পাহাড়ের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় শান্তি-সংলাপে বসার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন । এ কারণে তাঁর নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে শান্তি-সংলাপের সুযোগও উন্মুক্ত রেখেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে শান্তি-সংলাপ অব্যহত রাখে, যার সূচনা এম এন লারমার জীবদ্দশাতেই হয়েছিল। এসব শান্তিসংলাপের ফল হিসেবে জনসংহতি সমিতির সংশোধিত পাঁচ দফার ভিত্তিতে সংবিধানের আওতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি। তবে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দুদশক পরেও পার্বত্যাঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের ভূমি সমস্যার সমাধান, পাহাড়ে আঞ্চলিক শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়াসহ এর মৌলিক শর্ত পূরণ হয়নি। সব মিলিয়ে চুক্তিটি অনেক আগেই পরিণত হয়েছে কাগুজে চুক্তিতে। বিগত ও বর্তমান সরকারগুলোর সদিচ্ছার অভাবে চুক্তিটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। উপরন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নে সব সরকারই মিথ্যে প্রতিশ্রুতিদানের পাশাপাশি সীমাহীন প্রতারণা করে চলেছে।
প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ে যে মানুষগুলো নিজেদের সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে, সেই মানুষগুলোর সাথে প্রতারনা করার ফল নিশ্চয় ভাল কিছু বয়ে আনবে না।
এম এন লারমার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
