
জানালার বাইরে তাকিয়ে আজই হঠাৎ চোখে পড়লো চাদুর মোড়ানো বরফ শুভ্রতা। এই হেমন্তে উইন্ডসরে সম্ভবতঃ এই প্রথম তুষারপাত। যার শুরু হয়েছে গত রাত থেকে। কাল রাতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রাস্তার ধারের নিয়ন লাইটের মসলিন আলোয় বরফপাত দেখেছি অনেকক্ষণ। বার বার শুধু মনে হয়েছে কি অপূর্ব এই ঘুর্নায়মান জীবন।
ছোটবেলায় বর্ষায় গ্রামের বাড়িতে যেতে ইচ্ছে হতো খুব।
কারন ছিল আমার দাদার কাঠের খরম পায়ে দিয়ে কাঁদা মাটিতে হাঁটা আর দরজার পাশে বসে বৃষ্টির ব্জ্র-তান্ডব দেখা। আর সেই আমি কালের চাকা ঘুরে একই ধরার উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে দেখছি বরফপাত। সময় বদলায়, দিন বদলায়, ক্ষন বদলায়। শুধু বদলায়না বাউল মনের একতারার সুর-
বদলায়না কোমল হৃদয়ের রেশমি ডোরে বাঁধা স্মৃতি লগ্ন।
কোন এক বরিষন দিনের কথা।
দাদাভাই হুক্কায় তামাক আর কলকী লাগিয়ে ফুঁকছেন তৃপ্তির ফুক। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হতো আমিও নলে একটা বড় টান দেই সু সু করে। কিন্তু সাহস করে দেয়া হয়নি তখন, হয়নি তাই আজ পর্যন্তও। দাদার মুখে গল্প শুনতাম বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দের মতোই একটানা। পুরনো সেই গল্প, হয়তো একই গল্প বারবার- বহুবার।
তাও শুনতাম মন দিয়ে – ভালো লাগতো।
তেঁতুল তলায় তিপ্রা বাজার বাসস্টপ।
সবে মাত্র স্টেট বাস থেকে নেমেছি। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। গন্তব্যের জন্য হাঁটতে হবে বেশ খানিকক্ষন। হঠাৎ দেখি টাই পড়া এক ভদ্রলোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে। স্যার বলেই পা ছুঁয়ে সালাম। আমিতো হতবাক। বললো- স্যার আমি সমির, আপনার একসময়ের ছাত্র। আমার পিঠে এখনো আপনার মারের দাগ আছে। গল্পের বাকি অংশ আরো রোমাঞ্চকর, আর একদিন বলবো।
প্রথম গল্প শেষ না হতেই শুরু হয় দাদার দ্বিতীয় গল্প।
এটি হচ্ছে উঁনার কোন এক ইন্টারভিঊয়ের গল্প-
“গুন গুন গুন রবে কতো মধু করে
কেমন পুলকে তাঁরা মধুপান করে।”
তিনবার গুন উচ্চারন করে কবি মৌমাছির কোন তিনটি বিশেষ গুনকে বুঝাতে চেয়েছেন এবং কেন চেয়েছেন? এর উত্তর দাদার কাছ থেকে অনেকবারই শুনেছি কিন্তু মনযোগ দিয়ে শুনিনি কখনোই। কারন আমার মন থাকতো সারক্ষন বৃষ্টির ছন্দ নুপুরের দিকে।
গত রাতের এলোপাথারি তুষারপাত আমাকে নিয়ে গিয়েছিল কাঁদামাখা সেই মায়াবী গ্রামে –
আজন্ম হৃদ-গহীনে লালন করা স্বপ্নপুরীতে।
উইন্ডসর, কানাডা
