আবারো বৃষ্টি – আবারো আনন্দ

আবারো বৃষ্টি আবারো আনন্দ

আজ সকাল থেকেই অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি।

মাঝে মাঝেই বজ্র বিদ্যুতের ঝলক এবং গর্জন। নাস্তা করেই চা হাতে নিয়ে চলে যাই পেটিওর পাশে। বসেছিলাম অনেক্ষন। বৃষ্টির বড় ঝাপ্টা এলেই গ্লাসের স্লাইডিং ডোরটি বন্ধ করে দিতে হচ্ছিল। আবার খুলে দিয়ে দেখছি বৃষ্টির দাপুটে খেলা। পরে ভাবলাম সেলফোনে একটু ধারন করি সবার সাথে শেয়ার করার জন্য। যদিও আমি জানি আমার ভাললাগা এবং আর সবার ভাল লাগা এক নয়। তবুও জানি অনেকেরই হয়তো ভাল লাগবে বৃষ্টি দেখতে।

- Advertisement -

তিরিশ বছর আগের কথা।

তখন আমি কুমিল্লায় – সাহেবাবাদ ডিগ্রী কলেজে অধ্যাপনা করি। কুমিল্লা শহর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরের এই কলেজটির চার পাশে ভাটি অঞ্চল। বাস যাতায়ত সহজ হলেও বর্ষায় যাতায়তের জন্য নৌকাই ছিল উত্তম। তাছাড়া নৌকা ভ্রমন যথেষ্ট আনন্দেরও বটে। সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম কখন আসবে বর্ষা – কখন আসবে সেই নৌকা-ভ্রমন দিন। কুমিল্লা রেল স্টেশন ছেড়ে মাঝে একটি স্টেশন পাড়ি দিয়েই নামতে হতো রাজাপুর ষ্টেশনে। তারপর কলেজ যেতে ছই তোলা নৌকায় প্রায় সোয়া দুই ঘন্টার পথ। অধিকাংশ সময়ই নৌকায় যাত্রী থাকতাম আমরা চারজন। আমাদের অধ্যপনার বিষয় ছিল ভিন্ন ভিন্ন। আমি অর্থনীতি, বন্ধু আজহার রাজনীতি, ছোট ভাই মফিজ মেথামেটিক্স আর বেবি আপা বাংলার অধ্যাপক। আড্ডা জমতো বহুমুখী – চতুষ্কোন। তবে একটি বিষয়ে সবার দারুন একটা মিল ছিল। আর তা হলো নৌকার ছইয়ের “ঝুম ঝুম বৃষ্টি”। এটি আমাদের সবারই ছিল খুব পছন্দের। ভাল লাগতো যখন অথৈ জলাধার আর হাওরের উপর দিয়ে নৌকা চলতো অসীমের দিকে। যেদিকে চোখ যায় পানি আর শুধুই পানি। মাঝে মাঝেই হাওড়ের অগভীর অংশে সাদা শাপলা কিংবা রক্ত শাপলা। আমরা অনেক সময় নৌকায় বসেই শাপলা তুলতাম। পরে বাসায় এসেই যতো আবদার মায়ের কাছে। ছোট বোন রুমী – জেমিও সাহায্য করতো আম্মাকে। রান্না হতো পোড়া মরিচের শাপলা ভাজি। স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে – হয়তো থাকবে অনাদিকাল। শুধু বেঁচে নেই আমার মা।

নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর আরো অনেক মজার মজার গল্প আছে। একদিনের কথা বলি আমরা কলেজ শেষে নৌকা ভ্রমনে যাবো কলেজের এক ফাউণ্ডার নুরুন্নবী সাহেবের বাড়ি। এটি উনার আদি বাড়ি তবে এখন হাওরের বাগান বাড়ি। কুমিল্লায় শহরের বাড়ি থেকে এখনে বেড়াতে আসেন ভর-বর্ষায়। আমরা ক’জন শিক্ষক একসাথে চলেছি নৌকায়। আহা! কি আনন্দ। নৌকা চলছে ছলাত ছলাত। আমরা মন ভরে দেখছি প্রকৃতির এক অচেনা সৌন্দর্য। আমাদের নৌকার পাশ ঘেঁষে চলছিল অন্য একটি কুমারের নৌকা। তাতে অনেক মাটির হাড়ি। আমাদের সহযাত্রী বাংলার মেডাম বললেন কুমারকে ডাকতে – উনি একটি মাটির হাড়ি কিনবেন। নৌকার ছইয়ে ভেতর থেকে মাথা বের করলেই বৃষ্টি কিন্তু তাও উনি নাছোড়বান্দা – হাড়ি কিনবেনই। কেনার আগে বারবার শুকছেন এবং টোকা দিয়ে দেখছেন। আমি এই হাড়ি কেনার কোন কারন বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু মফিজ ঠিকই হয়তো বুঝেছে। সে বলল –

কি ম্যডাম ঝিকর খাবেন?

আমাদের বাংলা ম্যাডাম মৃদু হাসলেন।

পরে জানলাম সন্তান সম্ভাবা মায়েরা নাকি পোড়া মাটি চিবুতে খুব পছন্দ করেন। আমাদের বাংলার ম্যাডাম সন্তান সম্ভাবা এটি যেমন আমি আঁচ করতে পারিনি, ঠিক তেমনি পোড়া মাটি যে এভাবে চাবিয়ে খাওয়া যায় তাও বুঝতে পারিনি তখন। ভাবলাম কি বোকা আমি। আজও যখন প্রচন্ড বৃষ্টি দেখি – সেই বোকামির কথা ভেবে আমি মনে মনে হাসি।

এক সময় অথৈ হাওরের মাঝে আমাদের নৌকা যাচ্ছিল প্রচন্ড ঢেউয়ের উপর দিয়ে। নৌকার মাঝি আমাদের বললেন – হাওরের এই অঞ্চলটি মাগুর চাষ প্রকল্পের অধীন। এখানে খুব উন্নত জাতের মাগুরের চাষ হয় এবং প্রজননও হয়। এক সময়কার এরশাদ সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তি ওয়াহিদুন্নবী এর উদ্যোক্তা ।

আজ এরশাদ নেই । তার সেই ক্ষমতার হাতও নেই। নেই সেই মাগুর চাষের হাওর। প্রায়তঃ হয়েছেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা জনাব নুরুন্নবী এবং হয়তো তার ছোট ভাই ওয়াহিদুন্নবীও। নেই আমাদের সেই নৌকা ভ্রমন আর জমানো আড্ডা। আমি ছেড়েছি দেশ – তাও অনেকদিন আগে। বন্ধু আজহার এখন ঢাকার নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ। বন্ধুসম ছোট ভাই মফিজ সরকারি আব্দুল মতিন খসরু কলেজের অধ্যক্ষ। অন্যদের অনেকের খবরই জানিনা।

বড় বিচিত্র এই ধরনি –

আরো বেশি বিচিত্র তার মায়াবি উপাখ্যান।।

উইন্ডসর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent