
এখনও এই লাইন ঘোরে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মুখে-মুখে। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সময় এই কবিতাটি তখন আমাদের মুখে মুখে ফিরতো। সেই সময় নারায়ণগঞ্জে রাত জেগে পুলিশের চোখ এড়িয়ে দেয়ালে দেয়ালে চিকা মেরেছি “এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তাঁর শ্রেষ্ঠ সময়”।
ঠিক আমার কৈশোরোর্ত্তীন সময়ে একদিন কবি হেলাল হাফিজভাইয়ের সাথে পরিচয় ঘটে। তিনি তখন অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৮৫/৮৬ সালে প্রায় সোমবার দুপুরে আমি, বন্ধু কথাসাহিত্যিক মাহবুব রেজা, প্রয়াত বন্ধু ছড়াকার ওবায়দুল গনি চন্দনসহ আরো অনেকেই নিয়মিত ঢুঁ মারি ৫, সেগুনবাগিচায়। নানন্দিক স্থাপত্যের পুরানো দোতলা বাড়িতে দৈনিক দেশ-এর অফিস। ( পরবর্তীতে এই বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।)
আমাদের গন্তব্য ছিল দোতলায় কমলকলির আসর সম্পাদক মনোয়ারা মনু আপার রুমে। সেখানে বসতেন আরেক ডাকসাইটে সাংবাদিক আলোকচিত্রী শরীফ আলমাজি ভাই। নীচতলায় একটি কক্ষে বসতেন কবি মুশাররফ করিম, কবি মাসুক চৌধুরী । পাশে বসতেন কবি হেলাল হাফিজ। মনু আপা, মাজিভাইয়ের সাথে আড্ডা মেরে মাঝেমাঝে ঢুকে যেতাম হেলালভাইদের রুমে। হেলালভাই তখন চাপদাড়ি রাখতেন। এবং মাথার চুল ছিল কাঁধ ছুঁই ছুঁই। সেই চুলের গোছা রাবার দিয়ে বেঁধে রাখতেন। প্রথম দেখাতে খুব রাশভারি রাগী মনে হয়েছিল। কিন্ত পরিচয়ের পর নিজেই আপন করে নিয়েছিলেন। যখনই দেখা করতে গিয়েছি চা না খাইয়ে বিদায় দেননি।
হেলালভাই নানান কারণে আমাকে স্নেহ করতেন। যখনই তোপখানা বা প্রেসক্লাবে দেখা হয়েছে, জানতে চাইতেন কি লিখছি, কি পড়ছি। প্রায় বলতেন,কম লেখো, বেশি করে পড়।
১৯৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ বৈশাখী মেলা উদ্যাপন কমিটি হেলালভাইকে সংবর্ধনা দিয়েছিল। সংবর্ধনার দুইদিন আগে ঢাকায় দৈনিক দেশ অফিসে দেখা হলে বললেন,’ তোমাদের শহরে যাব। অনুষ্ঠান শুরুর আগে চলে এসো । বোস কেবিনে নিয়ে যাবে। ‘
সেদিন চা-পানের সময় বলেছিলাম, আপনার কবিতার দুইটি লাইন দিয়ে এই শহরের দেয়ালে দেয়ালে চিকা মেরেছি। কিন্ত আপনার নাম দেয়া হয়নি। সেদিন একটু বিষন্ন হয়ে বলেছিলেন, ‘লাইন দু’টো পিতৃহীন হয়ে গেছে। আমি দেখেছি, কেউ ক্রেডিট দেয় না।’
২. নব্বই দশকের শুরুতে ছাত্র রাজনীতিতে ব্যস্ততায় লেখালেখির জগত হতে আমার দূরে সরে যাওয়ায় অনেকের সাথে যোগাযোগ ক্ষীন বা ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্ত খোঁজ খবর রাখতাম কার কি নতুন লেখা, বই বের হয়েছে। বইমেলায় গেলে অনেকের সাথে দেখা হয়ে যেত। প্রতি বছরই স্টলে স্টলে খোঁজ নিতাম হেলালভাইয়ের কোন নতুন বই এসেছে কিনা। কিন্ত বই প্রকাশে তিনি ছিলেন উদাসীন অথবা প্রকাশে অনাগ্রহী।
দীর্ঘ ২৬ বছর পর ২০১২ সালে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ কবিতা একাত্তর প্রকাশ হলে অভিনন্দন জানিয়ে আমন্ত্রন জানাই, একুশে টেলিভিশনে আমার প্রযোজিত লাইভ অনুষ্ঠানে আসার জন্য। দিনক্ষন ঠিক থাকার পরও কি কারণে যেন আসতে পারেননি। পরের বছর ২০১৩ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাবার পর সোজা প্রেসক্লাবে গিয়ে হেলালভাইকে ধরি।
এবার আপনাকে একুশে টেলিভিশনে আসতেই হবে। কোন ওজর আপত্তি চলবে না।
হেলালভাই বললেন,আমাকে নিয়ে যেতে হবে।
আমি বললাম, গাড়ি পাঠিয়ে দিব।
এবার হেলালভাই মিস করেননি। সময়মতো এলেন।
একুশে সন্ধ্যা লাইভ অনুষ্ঠান শেষে এগারো তলায় ক্যান্টিনে আমার সহকর্মীদের সাথে র্দীঘ সময় গল্প, আড্ডায় মেতেছিলেন।
২০১৮ সালে আমি দেশ ছাড়ার কিছুদিন আগে জুন মাসের ১৫/১৬ তারিখে হেলালভাইয়ের সাথে সর্বশেষ দেখা হয় প্রেসক্লাবে। যখন শুনলেন দেশ ছেড়ে যাচ্ছি তখন একটু মন খারাপ করেন। যাবে যখন নাড়িরটান, শেকড় ভুলো না। যেখানেই থাকবে লেখাটা ছেড়ো না।
৩.শুক্রবার ভোরে ঘুম থেকে উঠে হেলালভাইয়ের না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে মন খারাপ হয়ে গেল।
৩৯ বছরের পরিচয়, শত স্মৃতির আনাগোনায় সারাদিন মনভার হয়েছিল। সন্ধ্যায় ফেসবুকে বসে মনে হলো, বিদায় জানাই নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র প্রিয় কবিকে। আপনার অনন্তযাত্রা শান্তির হোক। ভাল থাকবেন কবি।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
