
‘ইহুদি শিশু হিসেবে আমি উপেক্ষিত হয়েছি; এমনকি অত্যাচারিত হয়েছি। শুধু ধর্মের কারণে আমার দেশেই আমি নিগৃহীত হয়েছি।
ধর্ম মানুষকে আলাদা করে দেয়। আমার নিজের জীবনেই তা ঘটেছে। সেই অত্যাচারিত ভগ্নহৃদয় আমাকে তাড়া করেছে আজীবন। এরকম একটি সময়ে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে উদবাস্তু শরনার্থীদের জন্য অর্থনৈতিক সাহায্যে এগিয়ে আসতে। সেই উদ্দেশ্যেই আমি কলকাতা এসেছিলাম। শরণার্থী শিবিরে ঘুরে ঘুরে মানুষের মানবেতর জীবন ও বাস্তব কষ্ট তুলে ধরবো বিশ্বের মানুষের কাছে। সেলুলয়েডে চিত্রগ্রহণ সেই উদ্দেশ্যেই।
সেলুলয়েডে সেই কষ্টের বাস্তবচিত্র ধারণ করে আমি রেখেছিলাম। নিজেও সেই ফুটেজ থেকে একটি ছবি বানিয়েছি। আমার দুর্ভাগ্য, আমি ছিলাম বাংলাদেশের জন্মের বিপক্ষ শক্তির এক নাগরিক। কিন্তু, ইশ্বর আমার কাছে ক্যাথারিন মাসুদ আর তারেক মাসুদকে পাঠিয়েছিলেন। তারা বিশ্বের বিভিন্ন মানুষের ধারণকৃত আরো ফুটেজ সহ আমার ফুটেজগুলো দিয়ে তৈরি করলো ‘মুক্তির গান’। শুধুমাত্র তারেক মাসুদ আর ক্যাথারিন মাসুদের এই ‘মুক্তির গান’-এর কারণেই আজ আমি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অংশ হয়ে গেলাম। যা আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পাওয়া।
আমার উদ্দেশ্য ছিল ধারণকৃত ফুটেজগুলো দিয়ে বিশ্বের মানুষের সহমর্মিতা আদায় করা। তারেকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাজতৈনিকভাবে এই ছবি দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ অর্জন করা বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের বিরুদ্ধে চেতনাগত শক্তি অর্জন করা। তারেক এতে সফল হয়েছে।
আমার প্রিয় ভাই তারেক মাসুদ, যদি আজ এখানে আমার সাথে থাকতো! কী সুদর্শন একজন মানুষ, কী ভদ্র, কী সুন্দর তার কথার ভঙ্গি! এক মহান আত্মার মানুষ তারেক। আমি গভীরভাবে তারেককে অনুভব করি!
বাংলাদেশের মানুষ বড় গভীরভাবে সবকিছু ভাবেন। তোমাদের হৃদয়স্পর্শ করা বহুমুখী ভাবনায় কখনো কখনো চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। কত নির্মল আবেগের মানুষ তোমরা। তোমাদের কোনো তুলনা নেই!
ভাবতে পারো একজন মানুষ সুস্থিরভাবে ঘুমাবে; সকালে উঠে নাস্তা খাবে। স্বাভাবিকভাবে পরদিনের জীবনের চক আঁকবে। অথচ, তা না করে বাংলাদেশের মানুষ মানুষের মুক্তির জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জেনেও যুদ্ধে যাচ্ছে; না ঘুমিয়ে, না খেয়ে! এর মাহাত্ম্য কত বড় আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। তোমরা সবাই আমার আত্মার অংশ হয়ে গিয়েছো! আমি চিরজীবন তোমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।’
