ঘটনা ও মহাঘটনায় ২০২৪

ঘটনা ও মহাঘটনায় ২০২৪

২০২৪ শেষ হচ্ছে নানা ঘটনা ও মহাঘটনায়। ব্যক্তিগত জীবনে দুটো বড় ঘটনা ঘটেছে এবছর, সেজন্য ২০২৪ সাল স্মৃতির পাতায় বেদনার ছবি হয়ে থাকবে বাকি জীবন। ফেসবুকে আমি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলি। আমি মনে করি, ব্যক্তির আনন্দ ও বেদনার কথা একেবারে কাছের চেনাজানা মানুষ ছাড়া কাওকে স্পর্শ করে না, সেজন্যই এড়িয়ে চলা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদেরকে কেবল যে চেনাজানা মানুষগুলোকে একত্রে করেছে তা তো না, অচেনা-অজানা মানুষদেরও একত্রিত করেছে। আমাদের মতের সাথে, আমাদের চিন্তা-ভাবনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে মিলে যায়, এমন মানুষদের সাথে এক ধরণের নৈকট্যের অনুভব তৈরী হচ্ছে। বলে রাখি, মানবপ্রজাতির এই অনন্য বৈশিষ্টই তাকে ধর্ম, জাতি, রাষ্ট্র ইত্যাদি নানা সামাজিক সংঘঠন তৈরী ও তার সাফল্যের অংশীদার করেছে। ব্যর্থতারও।

২০২৪ সালের বাংলাদেশ এমন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা আমাদের জাতীয় জীবনের আলোচনায় বহুবছরধরে বারবার ফিরে আসবে। জাতি হিসেবে আমরা সফল হই কি ব্যর্থ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টকে এড়িয়ে কোন বয়ান নির্মান সম্ভব হবে না। সফল হলে তার ভাগিদারের অভাব হবে না; কিন্তু, ব্যর্থ হলে তার সকল দায় যে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ওপর বর্তাবে, তাতে সন্দেহ করা চলে না। আহমদ ছফার বিখ্যাত উক্তির কথা মনে পড়ে? ওই যে, আওয়ামী লীগ যখন জিতে, তখন সে একাই জিতে, আর যখন হারে, তখন পুরো বাংলাদেশটাই পরাজিত হয়। আওয়ামী লীগ তার এই ঐতিহাসিক দায়টি মাথায় তুলে নিয়েছে মূলত মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়ে। সেই সময় ব্যর্থ হলে বিচ্ছিন্ততাবাদের দায় মাথায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাসনে যেতে হতো, বিদ্রোহী সেনা কর্তারাও নির্বাসন দন্ড থেকে মুক্তি পেতেন না। কী হতে পারতো তা নিয়ে কল্পনার ফানুস ওড়ানোর দরকার নাই। কারণ, দেশটাকে আমরা স্বাধীন করতে পেরেছি এবং যেভাবেই হোক, অনেক দেশের তুলনায় আমরা মন্দ করিনি, সেটা হলফ করে বলা যায়। শুরুতে বৈশ্বিক ঝোঁকের প্রভাবে পুঁজিবাদকে পরিহার করার একটা প্রবণতা দেখা গেলেও দ্রুত বাংলাদেশ পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক যাত্রাপথে হাঁটতে শুরু করে এবং বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার তালিকায় সর্বাগ্রে অবস্থান করছে। আমাদের রয়েছে গর্ব করার মতো অসংখ্য সাহসী উদ্যোক্তা। পনেরো শতাব্দির স্বর্ণোজ্বল সময়ের পরে বিশ্ব বাণিজ্যের লক্ষী আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে, সেটা অস্বীকার করা উচিত না। সেই সময় অবশ্য আমাদের জাহাজ যেতো ইউরোপে। আবারো  যাবে, সেই আশা করি মনে মনে। জিয়ার হাত দিয়ে শুরু, তারপর এরশাদের হাতে হাঁটিহাঁটি যাত্রা করলেও আওয়ামী লীগের সমাজতন্ত্রমুখি ঝোঁক আমাদের উদ্যোমকে আটকে রেখেছিল বৈকি। নব্বই পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে পুঁজিবাদের পথে যাত্রা করাটা ছিল আমাদের অর্থনীতির সেই ভোর যা খুব কম জাতিই প্রত্যক্ষ করতে পেরেছে। যার নাম জাতীয় ঐক্য, হ্যাঁ, আমাদের অর্থনীতি তারপর থেকেই সাবলীল হতে শুরু করেছে। মনে আছে, সাইফুর রহমান কর্তৃক ভ্যাট প্রবর্তন করার সেই সময়ের কথা। কম সমালোচনা হয়নি, আজ পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, নিজস্ব সম্পদ আহরণের ওই বন্দোবস্ত কম সাহসী ছিল না।

- Advertisement -

তাহলে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা কোথায়? সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মানে তারা ব্যর্থ। ব্যর্থ আসলে সকলে, কিন্তু, ওই দায় নেওয়ার বিষয়, সেজন্য পুরো দায়টি আওয়ামী লীগের। দলের মধ্যে এবং অন্য দলগুলোর সাথে সম্পর্ক নির্মানে তাদের আগ্রহের কমতি ছিল; যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো রাজনীতি-বিনাশী একটা ব্যবস্থা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিতে পেরেছে। মাগুরা উপ-নির্বাচন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন ছিল নব্বই পরবর্তী সোনালী সময়ের কালো অধ্যায়, যা প্রতিদ্বন্দ্বি রাজনৈতিক দলগুলোকে অবিশ্বাসের চোরাবালিতে ডুবাতেই কেবল সহায়তা করেছে, সুন্দর নির্বাচন হয়নি–একটাও না। বলে রাখি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইডিয়াটা ছিল জামাতের। বিপরীতে দরকার ছিল,  বিএনপির সাথে ঘন হয়ে বসা, আরো ঘন হয়ে বসে কানে কানে বলা–নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয়, তো বাংলাদেশ এক দিন একদিন ব্যর্থ হবেই। আর আমরা যদি অন্তত নির্বাচনটা ঠিকঠাক করতে পারি, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একদিন আলো আসবেই।

 

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent