
আজকে আমাদের বিয়ের চৌদ্দ বছর পূরণ হলো।
২০১১ এর জানুয়ারি মাসের সাত তারিখ আমরা তিন কবুল বলেছিলাম।
চৌদ্দ বছর অনেকটা সময়। অনেকেরই বিয়ে এতদিন টিকে না। ভালবাসা ফিকে হয়ে আসে। প্রেম বহু আগেই মরে যায়। কোন রকমে সংসার টেনে নিয়ে যাওয়াকে দায়িত্ব মনে করে।
আমাদের ঘটনা এখনও সেদিকে মোড় নেয়নি।
আমার সারাজীবনই লক্ষ্য ছিল বিয়ে এমন কাউকেই করবো যে আমার “সঙ্গী” হবে, একজন আদর্শ companion, যার সাথে জীবনের একটা লম্বা সময় কাটানো যাবে। এখন পর্যন্ত আমার মনে হয় আমার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। কারন আমার বৌ মাঝে মাঝেই এমন সব কাজ করে যেজন্য মনে হয় এমন অসাধারন একটা মানুষের পাশে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়াই যায়।
তেমনই কিছু ছোট ঘটনা বলি।
যদিও ঢাকঢোল পিটিয়ে বৌয়ের প্রশংসা করতে যাচ্ছি। তা নিজের বৌয়ের প্রশংসা করবো না তো কার বৌয়ের প্রশংসা করবো, বলেন? পুরুষ মানুষ অবশ্য নিজের বৌ ছাড়া অন্যের বৌয়েরই প্রশংসা বেশি করে।
আমরা তখন দুইজনই এক অফিসে কাজ করি। যদিও দুইজনের আলাদা আলাদা ডিপার্টমেন্ট।
ওর ডিপার্টমেন্টের এক কলিগ একবার এক ছোট বাচ্চার ছবি দেখিয়ে বলল মেয়েটি দেখতে কেমন।
সাদা চামড়ার সোনালী চুলের বাচ্চা মেয়েদের এমনিতেই পুতুলের মতন ফুটফুটে লাগে। বিদেশী পুতুলগুলো ওদের কল্পনা করেই বানানো হয়। সেদিক দিয়ে এই মেয়েটি আসলেই সুন্দর। তারউপর ওকে পরী সাজিয়ে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তোলানো হয়েছে। ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে এই মাত্র আকাশ থেকে একটি পরী শিশু পথভুলে আমাদের পৃথিবীতে চলে এসেছে। এদিকে আশেপাশে মেয়েকে না দেখে ওর মায়ের টেনশনে জীবন চলে যাচ্ছে। এখুনি ওকে খুঁজে পাবে। এবং কঠিন ধমক দিয়ে বলবে “ওখানে কি করছো? কতবার বলেছি আমাকে না জানিয়ে কোথাও যাবেনা! এসো আমার সঙ্গে!”
মেয়েটির মা ওকে খুঁজে পাওয়ার আগের মুহূর্তটাকেই ক্যামেরাম্যান নিজের ক্যামেরায় বন্দি করেছে।
তিন্নি বলল, “বাচ্চাটা খুবই সুন্দর!”
কলিগ জানালো মেয়েটির ক্যান্সার। খুব এগ্রেসিভ ধরনের ক্যান্সার। সময় অতি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বেঁচে থাকতে হলে ওকে একটি দীর্ঘ লড়াই লড়তে হবে। তাঁর চেহারা, শরীর সব তছনছ হয়ে যাবে। যে অসম্ভব রূপ নিয়ে ও পৃথিবীতে এসেছে, এর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ওর বাবা মা চিকিৎসার ব্যয়ভার সামলাতে দুইজনই তিনটা করে চাকরি করছেন, পাশাপাশি এখানে ওখানে হাত পাতছেন। যেকোন মূল্যেই হোক, নিজেদের সন্তানকে তাঁরা হাতের কাছে ধরে রাখতে চান।
মেয়েটা তিন্নির কলিগটার আত্মীয়। ও তাই পরিবারটির সাহায্যের জন্য অফিসের অন্যান্য কলিগদের কাছে সাহায্য চাইছে।
সবাই যে যার সামর্থ্যমত কিছু টাকা পয়সা দিল।
আমার বৌ সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে একটা বড় এমাউন্ট দিল। এতটাই যে সেই কলিগ চোখ বড় বড় করে বললো “তোমার কি মাথা নষ্ট হয়েছে? তোমার নিজের সংসার আছে, ছোট একটা বাচ্চা আছে।”
এমাউন্টটা যে কত ছিল সেটা আমি আজও জানিনা। জানার প্ৰয়োজন বোধ করিনি। আল্লাহর রাস্তায় দেয়া টাকার এমাউন্ট জেনে মনে আফসোস জাগলে সেটার বরকত চলে যেতে পারে। এগুলো ইনভেস্টমেন্ট, সময়মতন ফেরত আসে।
সে বলল “আমার আর আমার সংসারের জন্য আল্লাহ ভরসা। আপাতত এই মেয়েটার সাহায্যের প্রয়োজন।”
হয়তো সে ইমোশনাল হয়েছিল। কারন পরীর মতন ফুটফুটে মেয়েটির বয়স আমার বড় ছেলের সমান। ছোটছেলের জন্মও হয়নি তখনও। হয়তো সেই বাবা মায়ের স্থানে নিজেকে কল্পনা করেই সে শিউরে উঠেছিল।
কলিগ মহিলাটি তাঁকে বলেছিল “তুমি কি জানো যে তুমি একটা এঞ্জেল?”
এই এঞ্জেল শব্দটি আমার সামনেই কয়েকবার ওকে শুনতে হয়েছে। এই সেদিন ম্যাকডোনাল্ডসে বাচ্চাদের খেলাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। বাচ্চারা কিডস কর্নারে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে খেলছে, আমরা frappe খেতে খেতে বসে ভাবছি কখন ওরা ক্লান্ত হবে আর আমরা বাড়ি ফেরত যাব।
ও দেখলো একটি কৃষ্ণাঙ্গী তরুণী ব্যাগ ঘেঁটে পাই পাই পয়সা গুনছে। ম্যাকডোনাল্ডস এদেশের অতি সস্তা রেস্টুরেন্ট। গরিব মিসকিনরাও খেতে পারে। অথচ মেয়েটিকে দেখে বুঝা যাচ্ছে ওর একটা বার্গার বা ফ্রাইস কেনারও টাকা নেই।
তিন্নি বলল, “তোমার যদি অসুবিধা না থাকে আমি তোমাকে আজকের রাতের খাবার কিনে দিতে চাই।”
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “তুমি আমাকে এমনিতেই খাওয়াবে?”
“হু।”
“আমি কি দুইটা মিল অর্ডার করতে পারি?”
“তুমি চাইলে চারটা মিল অর্ডার করতে পারো।”
মেয়েটি আবেগাপ্লুত স্বরে জানালো “তুমি জানো, আমার মা প্রেগন্যান্ট। আমার কাছে যা পয়সা আছে তা দিয়ে ভেবেছিলাম ওর জন্য একটা ফ্রাইস কিনে নিয়ে যাব, আর আমি সারারাত উপোস থাকবো। সেটাও হচ্ছিল না। তুমি একটা এঞ্জেল হিসেবে আমাদের কাছে এসেছো।”
আরেকবার এক বিধবা আরব মহিলাকে ইফতার খাওয়ানোর সময়ে সেই মহিলা ওকে ভাঙাভাঙা ইংলিশে বলেছিল “তোমার চেহারায় “নূর” আছে। তুমি একজন মালাক (ফেরেস্তা)।”
সেই “ফেরেস্তা” ওকে সেদিন মাসের গ্রোসারি কিনে দিয়েছিল, সাথে বাচ্চার ডায়পার, ওয়াইপ্স, টুথব্রাশ, টুথ-পেস্ট, সাবান সহ স্যানিটারি ন্যাপকিন – যেগুলোর কথা সাধারণত আমাদের মাথায় আসেনা।
এমন অসংখ্য ঘটনায় আমাদের জীবন ভরপুর। অসংখ্য মানুষের কাছে ও “এঞ্জেল।”
তা কিছুদিন আগে আমার শ্বশুরের ক্যান্সার ধরা পড়লো। ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে যতরকম ছুটাছুটি সম্ভব, সবই সে একা করেছে। অপারেশন শেষে যখন টিউমার রিমুভ করে বায়োপসি রিপোর্টে ক্যান্সারমুক্ত ঘোষণা করা হয়, তখন আমার শ্বাশুড়ি বলেন, তুমি তোমার বাবার জন্য যা করেছো, একশোটা ছেলে থাকলেও সেটা করতো না।”
আমার মা বলেছেন “আজকে তিন্নি ছিল বলেই তোমার শ্বশুর বেঁচে গেছেন।”
আমি জানি ঐ যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে সে এঞ্জেল হিসেবে হাজির হয়, সেটারই ক্ষুদ্র প্রতিদান তাঁকে আল্লাহ ফেরত দিয়েছেন। আমার শ্বশুরের ক্যান্সার সনাক্ত হওয়া থেকে ক্যান্সারমুক্ত হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় ঘটনা মিরাকেলে ভরপুর।
এমন একটা এঞ্জেলকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে কয়জন পায়? আমার মতন অভাজনকে আল্লাহ সেটাই দিয়েছেন। আমাদের বিয়ের সময়ে আব্বু কেন যেন বলেছিলেন “আমাদের ঘরে আল্লাহর বরকত এসেছে। এর যত্ন নিও।”
আমি পিতৃআজ্ঞা পালন করছি।
বিয়ের আগে যখন আমাদের বিয়ে নিয়ে নানান ঝামেলা হচ্ছিল, এবং মনে হচ্ছিল আমাদের বিয়ে কখনই হবেনা, আমার প্রয়াত বন্ধু ইকবাল বলেছিল “এমন মেয়েকে বিয়ে করার জন্য যদি মারামারিও করতে হয়, কর। তবু একে হারিও না।”
প্রিয় বন্ধুর কথা আমি রেখেছি।
আর সবার মতোই ঝগড়াঝাটি সহ কতকিছুই আমাদের জীবনে ঘটে, কিন্তু আমি সবসময়ে ভাবি সে আমার জীবনে আমার উপরওয়ালার দেয়া একটি “উপহার” হিসেবে এসেছে – যার উপর বহু মানুষের দোয়া আছে, আশীর্বাদ আছে, ভালবাসা আছে।
একে ধরে রাখতে হবে, যত্ন নিতে হবে, এর কদর করতে হবে।
একে ছাড়া বেঁচে থাকার প্রশ্নই উঠে না।
