
সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় উঠলো দাবানলে পুড়ে যাওয়া শহরে মাত্র একটি বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়ির মালিকের নাম ডেভিড স্টেইনার – নাম শুনে মনে হচ্ছে ইহুদি যার পূর্বপুরুষ জার্মানি থেকে আমেরিকা এসেছে।
আমাদের দেশে যেমন মিছিলে নিহত হওয়া লাশ নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়, তেমনই এখানে জীবিত বাড়ি নিয়ে ধার্মিকেরা ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমাদের দেশের এক দাড়িওয়ালা হুজুর ভিন্ন বাড়ির (হয়তো সেটাও সার্ভাইভ করেছে – তবে যেটা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় এসেছিল, সেটা না) ছবি পোস্ট করে ঘোষণা দিলেন যেহেতু বাড়িটি মুসলমানের এবং বাড়িতে কুরআন শরীফ আছে, তাই বাড়িটা আগুনে ভস্মীভূত হয়নি।
মুহূর্তে পোস্টটি ভাইরাল হলো। লোকজন সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ কমেন্টের পাশাপাশি নানান পজিটিভ নেগেটিভ কমেন্টও করতে লাগলো।
আমেরিকান খ্রিষ্টান ধর্মাবম্বীরা শুরু করলো বাড়িটা একজন ধার্মিক খ্রিষ্টানের, ওখানে বাইবেল আছে, কাজেই “Wrath of God” থেকে বাড়িটি বেঁচে গিয়েছে। ওখানেও ঘটনা একই। ধার্মিক খ্রিষ্টানরা God নাকি Lord Jesus এর প্রশংসা করবে সেটা নিয়েও তর্কে জড়ালো। পুরাই কমেডি চলছে।
হতে পারে ওদের শেয়ার করা ছবির বাড়িটাও বেঁচে গিয়েছে। বাড়ির মালিক হয়তো আসলেই ধার্মিক।
সমস্যা হচ্ছে, এইসব মহাজ্ঞানী ধার্মিকেরা জানেনা বা খেয়ালই করে নাই যে ঐ এলাকায় “মসজিদ আল তাকওয়া” “Altadena Community Church” “The Pasadena Jewish Temple” সহ নানান ধর্মের ডজনখানেক ইবাদতখানা পুড়ে ছাই হয়েছে। আল্লাহ আগুনে পোড়ানোর বেলায় কোন বৈষম্য করেননি।
এখানে মূর্খ মুসলিমদের ঈমানে ধাক্কা লাগতে পারে। ঘটনা কি? আল্লাহ পবিত্র মসজিদ, পবিত্র কুরআন পুড়তে দিলেন কিভাবে?
আরও বড় মূর্খরা আমাকে নাস্তিক/মুনাফেক ট্যাগিং দেয়া শুরু করবে, কারন আমি কেন “আমিন” বা “আলহামদুলিল্লাহ” না বলে ভিন্ন কথা (যদিও ইসলামের আলোকে) বলছি!
আমি ডিরেক্ট মূর্খ বলায় এরাই আবার মাইন্ড করে। এদেরকে কে বুঝাবে যে ওদের আচরণই মূর্খের মতন, আমার কি দোষ? তবুও ফিল্টার করে বলছি “মহাধার্মিক।”
তো মহাধার্মিকেরা যেহেতু কসম খেয়েছে জীবনেও পড়াশোনা করবে না, তাই ওরা জানেই না দুনিয়ার সব মসজিদের চেয়ে পবিত্র, মক্কায় আমাদের কাবা শরীফও আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়। আমাদের নবীজির জীবনীতেই আছে, তাঁর নব্যুয়ত প্রাপ্তির মাত্রই কিছুদিন আগে কাবা ঘর পুড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশরা সেটা নির্মাণ করে, এবং “হাজরে আসওয়াদ” কে প্রতিষ্ঠা করবে এ নিয়ে যখন গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ লাগার উপক্রম, তখন আমাদের নবীই (সঃ) সেই সমস্যার চমৎকার সমাধান করেছিলেন।
তারপরে এজিদের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন মক্কা আক্রমন করে, তখন ওর সেনাবাহিনীর ছোড়া গোলার আঘাতে কাবা গুড়িয়ে গিয়েছিল।
এছাড়া ইতিহাসে বহুবার পবিত্র কাবাগৃহ ভেঙ্গে সংস্কার করে নতুন করে গড়া হয়েছে। গড়তে হয়েছে। শুধু ফাউন্ডেশনটা সেই ইব্রাহিমের (আঃ) আছে।
কিন্তু আমরাতো জানি আল্লাহ আবরাহার হস্তীবাহিনী থেকে কাবা রক্ষা করতে “আবাবিল” পাঠিয়েছিলেন। তাহলে কিভাবে কাবা ধ্বংস হতে পারে?
এইটাই আমাদের ধর্মের মূল পয়েন্ট, আল্লাহর ইচ্ছা, তিনি কখন কাকে রক্ষা করবেন, কাকে ধ্বংস করবেন, পুরাটাই তাঁর সিদ্ধান্ত। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ, আপনাকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পন করতেই হবে।
হয়তো দেখবেন মসজিদ পুড়ে গেছে অথচ এর পাশেই একটি বেশ্যালয় টিকে গেছে। আপনি মাথা চুলকে চিন্তা করবেন ঘটনা কি হলো। অথচ আল্লাহর প্ল্যান হয়তো সেই বেশ্যালয় থেকেই এমন একটি শিশুকে বড় করবেন যে দুনিয়া পাল্টে দিবে। মুসা (আঃ) এবং খিজিরের ঘটনা পড়েন নাই? সূরা কাহফ পড়েন। তারপরে দয়া করে আল্লাহর ওয়াস্তে আল্লাহর দেয়া মস্তিষ্কের ব্যবহার করে একটু চিন্তাভাবনা করবেন।
আর “মহা ধার্মিকদের” কথা বলছেন? পবিত্র কোরানে এবং হাদিসেই বর্ণিত আছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবীকে উনাদের উম্মতেরাই হত্যা করেছে। মুসা (আঃ), ইব্রাহিম (আঃ) আমাদের মুহাম্মদ (সঃ) সবাইকেই জীবনের একটা পর্যায়ে আল্লাহ একদম নিঃস্ব করে ফেলেছেন। যুদ্ধে আমাদের নবী (সঃ) তীরবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন, তাঁর মোবারক দাঁত শহীদ হয়েছিল, জীবনে একাধিকবার মৃত্যুকে তিনি এক হাত দূরত্বে দেখেছেন। যদি আল্লাহর নবী রাসূলদেরই এই অবস্থা হয়, তাহলে কে উনাদের চেয়ে বড় ধার্মিক যে ধর্মচর্চা ও ঈমানের গুনে বালা মুসিব্বত থেকে বেঁচে যাবে?
তা মসজিদ পুড়ে যাওয়া, বাড়ি পুড়ে যাওয়া, কুরআন পুড়ে যাওয়া, কিংবা মহাদুর্যোগেও কোন দালান কোঠার টিকে থাকা – ঘটনাগুলোর কারন কি হতে পারে?
সেটা বুঝতে আমাদেরকে ইসলামের একদম বেসিক শিক্ষায় যেতে হবে, সেটা হচ্ছে, “আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তাঁর সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই। তাঁর ক্ষমতা আছে কিছু সৃষ্টি বা ধ্বংস করার। এবং মহাবিশ্বের সবকিছুই নশ্বর। তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করবেন, তিনি যাকে ইচ্ছা ধ্বংস করবেন। তাঁর কাউকেই জবাবদিহি করতে হয়না।”
তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, নবীজি মুহাম্মদকেও (সঃ) যদি দুনিয়া ছেড়ে যেতে হয়, তাহলে আপনি কাকে বা কোন বস্তুকে অবিনশ্বর মনে করেন?
বুঝাতে পেরেছি?
গেল এই পয়েন্ট।
এখন আসা যাক আরেক পয়েন্টে।
লোকজন কসম খেয়ে নেমেছে একে “আসমানী গজব” প্রমান করেই ছাড়বে।
কিভাবে গজব হলো? সহজ হিসাব, ফিলিস্তিনে এত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ পুড়েছে, আমেরিকায় দেড়শো বিলিয়ন – কাজেই আল্লাহ ওদেরকে গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন।
এদেরকে কে বুঝাবে যে সম্পদের ক্ষতির হিসাব পুরাটাই আপেক্ষিক। মালিবু বিচে পোড়া একটি বাড়ি এবং লুইজিয়ানার কোন গ্রামে পোড়া একটি বাড়ির মূল্য এক না। আসল হিসাব হয় মানুষের প্রাণে। মিলিওন মিলিওন ফিলিস্তিনি মারা গেল, আর বিনিময়ে আল্লাহ মাত্র ১৬জন সিভিলিয়ান মারলেন? আল্লাহর গজব এত সস্তা? এত ঠুনকো? গজবের মধ্যে উনার ইবাদতখানা মসজিদও আছে, মসজিদের আশেপাশে মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসা বাণিজ্য, অফিস, দোকান ইত্যাদি সবই আছে?
এই যে লাখের উপর মানুষের ক্ষতি হলো, এতে কতজন মুসলিম আছে কোন জ্ঞান আছে? LAতে কতজন ফিলিস্তিনির বাস এরা জানে? ইজরায়েলের হাত থেকে বেঁচে এরা শূন্য থেকে জীবন শুরু করেছিল, এদেরকে আবার পথে বসে যেতে হলো – আর “মহাধার্মিক” বাঙাল বলছে “আলহামদুলিল্লাহ?”
আমাকে একজন মহাধার্মিক বলল আমেরিকানদের আগুনে পুড়তে দেখে ওর মনে ফূর্তি জাগে, কারন প্যালেস্টাইনে মানুষকে আগুনে এরাই পোড়ায়। কতটা অমানুষ হলে কেউ অন্য মানুষের মৃত্যুতে খুশি হয়! খোদ ফিলিস্তিনিদের দেখলাম এ ঘটনায় দুঃখিত হতে আর এই বাঙাল আসছে আলগা খাতির দেখাতে?
কালকে আমি মরলে, আমার বাড়ি পুড়লে এ খুশি হবে জানা কথা, কারন আমিও আমেরিকায় থাকি।
মানুষের মৃত্যু দেখে আমি কষ্ট পেয়েছি বলে সে বলল আমি মুনাফেক, আমার অন্তর নিফাকে পরিপূর্ণ।
আজকে বুঝলাম কেন বাংলাদেশে ঠুনকো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে মানুষের মৃত্যু ঘটে। কেন আমাদের দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনাতেই শয়ে শয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটে। গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায় বন্যায়। কেন “আসমানী গজব” আমাদের উপরই নাজেল হয়? কারন আমরা অন্য মানুষের কষ্টে খুশি হই।
আল্লাহ আমাদের সঠিক মুসলিম বানাক। আল্লাহ আমাদেরকে মানুষ বানান।
আল্লাহর তরফ থেকে সবচেয়ে বড় গজব হচ্ছে মূর্খামি। আল্লাহ এই অভিশাপ থেকে আমাদের মুক্ত রাখুন।
