স্বপ্নিলের অনার্স রেজাল্ট এবং কিছু ধূসর স্মৃতি

স্বপ্নিলের অনার্স রেজাল্ট এবং কিছু ধূসর স্মৃতি

আজ থেকে আটাশ বছর আগের কথা।

কোন এক শিশির ভেজা শরতের সকালে আমি আমার অনার্সের রেজাল্ট পেয়েছিলাম। কালচক্র আবর্তিত হয়েছে – আবর্তিত হয়েছে অনন্ত মহাকাশের গ্রহ নক্ষত্র এবং নিহারিকাপুঞ্জ। আবার এসেছে একই রকম আর একটি দিন যখন আমার মেয়ে স্বপ্নিল পেল তাঁর অনার্স সার্টিফিকেট। তবে একটি নয় দুটো –“ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন বায়োলজিক্যাল সায়েন্স অনার্স ” এবং “ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন বায়ো-ক্যামেস্ট্রি এন্ড ক্যামিক্যাল বায়োলজি অনার্স”। আমাদের সময় আমরা অনার্সে ডাবল ডিগ্রী বলতে কিছু শুনিনি কিন্তু এখন সময় পরিবর্তন হয়েছে –এসেছে প্রযুক্তির যুগ। স্বপ্নিল আমেরিকার ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পাঁচ বছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখন ডিগ্রী হাতে পেলেও তাঁর সমাবর্তন অনুষ্ঠান হয়েছিল আগেই। শুধু থিসিস পেপার এবং ডিফেন্স, এডিটিং ইত্যাদি বাকি ছিল। সব কিছু সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট পেতে পরিশ্রম যেমন হয়েছে অনেক, ঠিক তেমনি কালক্ষেপনও হয়েছে যথেস্ট। গত বেশ ক’মাস ধরে আমি দেখেছি তাঁর চোখে মুখে প্রচন্ড ব্যস্ততার ছাপ। কখন শেষ হবে এই বিরামহীন পাঠচক্র -এই নিয়ে হয়তোবা একই সাথে ছিল অজানা এক দুশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠা। আল্লাহ্‌ সহায় হয়েছেন বলেই হয়তো সব কিছু এখন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

- Advertisement -

ক’দিন আগের কথা- বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইটে ঢুকেই চমকে উঠা- মেয়ের চোখে মুখে আনন্দ অশ্রু। ওর মাকে ডেকে বললো একই সাথে দুটো ডিগ্রীই কনফার্ড হয়েছে। কিন্তু বাসায় কেউ হয়তো ওর বাঁধভাঙা আনন্দ বুঝতে পারছেনা কিংবা বুঝতে চাইছে না। ভাবখানা এমন যে পড়াশুনা যখন করেছে তখন ডিগ্রীতো পাবেই – এতে উদ্বেলিত হওয়ার কি আছে? কিন্তু আমি জানি এতে কি আনন্দ! মুখে না বললেও মনে মনে আমি ফিরে গিয়েছি তিন যুগ আগের কোন এক শরতের সকালে।

বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছুটি – সম্ভবতঃ শারদীয় পূজার ছুটি।

আমি তখন কুমিল্লায়। সকালের নাস্তা শেষ হলেই বের হই ঘুরতে। ব্যস্ত সারাদিন –কখনো মৌচাষ, কখনোবা বিজ্ঞান পত্রিকা ‘বেঙ্গল বি কালচার’। কখনো জেলা পরিষদ প্রেসে কম্পোজ দেখা, আবার কখনোবা নিউ মার্কেটে প্রচ্ছদ তৈরী। তখনো কুমিল্লায় অফসেট প্রিন্টিং আসেনি – সব কিছু ম্যানুয়েল। তাও ভালো লাগতো, পত্রিকার সম্পাদনা বলে কথা- ব্যস্ত সারাদিন। নিজের বাসায় খাই দাই ঘুমাই, আর সরকারী পয়সায় পত্রিকা ছাপাই। ভালই ছিল দিন গুলি – শুধু খারাপ লাগতো যখন ক্লাবের চাঁদার জন্য কোন ব্যবসায়ীর কাছে গিয়ে নিরাশ হতাম। হয়তো একশ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে হর হর করে বলে দিচ্ছেন- পত্রিকায় কোন বিজ্ঞাপন ছাপানোর দরকার নেই, ইনকাম ট্যক্সের ঝামেলা হয়। মানে হচ্ছে যা দিলাম তাতেই খুশী থাকো এবং আপাততঃ বিদায় হও। মনে মনে দুটি করে চারটে গালি দিলেও মুখে হয়তো কিছুই বলিনি।

আজকের শিশির ভেজা শরতের এই সকালটা কেমন যেন ভালো লাগার একটি সকাল। মফিজকে বললাম চলো আজ বাইরে কোথাও নাস্তা করি। মফিজ আমার ছোট ভাই হলেও বন্ধুসম, খুব আপনজন। তাই যেই কথা সেই কাজ। সোজা হাঁটতে শুরু করলাম – গন্তব্য কুমিল্লা রেল স্টেশনের পাশে ময়নামতি রেস্টুরেন্ট। মহা জমজমাট সেই সময়কার জনপ্রিয় এক রেস্টুরেন্ট। বাজছে হিন্দি গান – শত শত মানুষ গোগ্রাসে খাচ্ছে – আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। জলন্ত উনুন থেকে নামানো গরম গরম পরটা আর ঘিলা-কলিজা ভূনা। আহা! কি মজার খাবার- খেলাম মন ভরে আর বিল শেষে হাতে কিছু ধনে ভাজা আর গুয়া মশুরী নিয়ে চিবুতে চিবুতে আবার হাঁটা। ভবঘুরে সেই হাঁটা – এক অজানা গন্তব্যের হাঁটা। মনে হতো সারা রাজ্যের আনন্দ এই আজানা পথচলার মাঝেই।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা এসেছি কুমিল্লা রেলওয়ে বুক স্টলে। উদ্দেশ্য বিনে পয়সায় পত্রিকা পড়া আর বিচিত্রা, অর্থনীতি, বিচিন্তা জাতীয় কিছু সাপ্তাহিক কেনা। তখনকার সময়ে মিনার মাহমুদের সাপ্তাহিক বিচিন্তা খুব জনপ্রিয়। দাম মাত্র দুই টাকা হলেও কদর হাজার টাকার – হাতে নিয়েই মনে হতো এক নিঃশ্বাসে সবটা পড়ে ফেলি। আমি হালকা রোদে দাঁড়িয়ে যখন সাপ্তাহিকে মগ্ন তখন মফিজ চোখ বুলাচ্ছে সব দৈনিক গুলোতে – দেখছে চটগ্রামের পূর্বকোন। হঠাৎ করেই চিৎকার – সাইফুল ভাই আপনার অনার্স রেজাল্ট দিয়েছে। আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য নির্বাক- তারপর ভয়ে ভয়ে তাকাতে শুরু করলাম। কেউ ফার্স্ট ক্লাস পায়নি, ইকনোমিক্সের রেজাল্ট শুরু হয়েছে সেকেন্ড ক্লাস দিয়ে। তাও তাকাচ্ছি যে আমার রোল নম্বর পেলেই হয় –ক্লাস নিয়ে কোন চিন্তা নেই আদৌ। এক পর্যায়ে পেয়ে গেলাম আমার রোল নম্বর, সাথে সাথেই সারা শরীরে এক অনন্য শিহরন আর চোখে আনন্দের কান্না। দির্ঘ্য পাঁচ বছর অপেক্ষার পর এই প্রাপ্তি- মনে হলো আমি এখন দূনিয়ার সবচেয়ে সূখী মানুষদের একজন। মফিজকে বললাম চলো দূরে কোথাও ঘুরতে যাই – কেন জানি নিজেকে খুব হালকা লাগছে – মনে হচ্ছে আমি এখন হাওয়ায় ভাসছি।

কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা উঠলাম আন্তঃ জেলা বাসে- বাস চলেছে হাওয়ার বেগে, চলছে বিরামহীন। অনেক ক্ষন চলার পর আমরা নামলাম চৌদ্দগ্রামে। যাবো কোন এক অচেনা গাঁয়ে যেখানে স্বচ্ছ সলিল এক বিশাল দিঘী এবং দিঘীর পাড়ে ছায়া ঢাকা এক শান্ত নীড়। নিভৃত পল্লীর এই বাড়ীতে আছে এক অসাধারন ব্যক্তিগত লাইব্রেরী, যাতে আছে অনেক মূল্যবান পুরনো পত্রিকা এবং গ্রন্থ সংগ্রহ। প্রায় আধঘন্টার পথ পায়ে হেঁটে আমরা পৌঁছলাম সেই স্বপ্ন কুঞ্জে। আসলেই এক স্বপ্নপুরী- চারিদিকে নারিকেল আর সুপারী গাছ দিয়ে ঢাকা এই বাড়ীতে আছে দিঘীর ঠান্ডা পানিতে ধৌত মৃদু মলয়। তখনকার সময়ে কোন মোবাইল ছিল না আর গ্রামে ফোন যোগাযোগও ছিল না। তাই প্রথমটায় নিরাশ হলাম- যে বন্ধুকে দেখতে এসেছি তাঁকে না পেয়ে। তবে আমাদের সেই অপ্রাপ্তি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল খুব অল্পক্ষনের মধ্যেই। বন্ধুর আশি উর্ধ বাবা আমাদের আপ্যায়ন করলেন অসাধারনভাবে। গাছ থেকে তাৎক্ষনিক পাড়া হলো ডাবের গাছি – দিঘীর পাড়ে ঠান্ডা বাতাসে বসে গল্প করছি আর পান করে চলেছি ডাবের পানি একের পর এক। হালকা বাতাস আর ইচ্ছে ইচ্ছে করা রোদ – আহা কি যে শান্তি হয়তো এই স্মৃতি আজন্ম লালন করবো হৃদয় গহীনে।

সময় গড়িয়েছে অনেক, বদলেছে আনন্দের ধরন।

কিন্তু আনন্দের কি আসলেই কোন রকমভেদ আছে। আনন্দ তো আনন্দই – মানুষের অভিব্যক্তির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ আটাশ বছর পর আমার এই স্মৃতিচারন হয়তো সময়ের আবর্তন এবং বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই গল্পের পিছনে যে অনুভূতি ছিল তা হয়তো আজকে আমার মেয়ে স্বপ্নিলের অনুভূতির সাথে একাকার হয়ে মিশে আছে। যদিও প্রকাশের ধরনটি ভিন্ন। স্বপ্নিল তাঁর ভাইকে স্কাইপ করছে আর আনন্দ অশ্রুতে সিক্ত হয়ে বলছে- “ভাইয়া ইউ নো হোয়াট, আই গট বোথ মাই ডিগ্রীজ টুডে”। জানিনা আমার ছেলে শাওন তাঁর বোনের অনুভূতি বুঝতে পেড়েছে কি-না কিন্তু আমি বুঝেছি আমার অন্তর চোখ দিয়ে। বাবা হিসেবে মেয়ের জন্য দোয়া তো থাকবেই কিন্তু আমি সবার কাছে ওর জন্য দোয়া চাচ্ছি।

 

উইন্ডসর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent