
কোন কোন শিল্পের উৎকর্ষতার প্রকাশ কোন কোন সৃষ্টিশীলের একক সৃজনশীলতার রূপ। যেমন চিত্রকলা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস। কিন্তু গান একটি যৌথ সৃষ্টিশীল কাজের চূড়ান্ত রূপ। গানের কবিতা হয়তো পাঠেও আনন্দ-বেদনার রস সৃষ্টি করতে পারে। আমরা সেরকম স্বাদ গ্রহণ করতে পারি, এরকম অনেক গানের কবিতা আমাদের ভাষায় রচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গানের কবিতা এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কিন্তু গানের কবিতায় যখন এর অন্তর্নিহিত ভাবের সঙ্গে সমন্বয় বা সামঞ্জস্য রেখে সুর বেঁধে দেওয়া হয়, এবং সেই ভাবকে ফুটিয়ে তুলতে উপর্যুক্ত কণ্ঠে গীত হয়, ঠিক তখনই সেই গানখানি পরিপূর্ণভাবে আমাদের শ্রুতিতে পরিস্ফুট হয়ে উঠে। এখানে একটি গানের পূর্ণ রূপের স্থাপনায় বা পূর্ণ রূপের প্রকাশে প্রধান তিনজন সৃষ্টিশীলের কাজকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে : গানের কবিতার কবি, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। কিন্তু একটি সুন্দর রসপূর্ণ স্বার্থক গান সৃষ্টির পেছনে আরো কিছু মানুষের সৃষ্টিশীলতার মুন্সিয়ানা জড়িয়ে থাকে। আছেও।
একজন ভি বালসারার পিয়ানো একোর্ডিয়ান, একজন রাধাকান্ত নন্দীর তবলা, একজন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের হারমোনিয়াম বা তবলা, একজন জারিন দারুওয়ালার সরোদ, একজন শেখ সাদী খানের বেহালা, একজন আব্দুর রহমানের বাঁশি, ইত্যাদি যন্ত্রের সুসমন্বিত সঙ্গত বা বিবেচনা প্রসূত ব্যবহার একটি গানকে চূড়ান্তরূপের রসকে তুলে ধরতে বা সৃষ্টি করতে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে। তাই, সাড়ে তিন মিনিট থেকে পাঁচ মিনিটের একটি গান বহু সৃষ্টিশীল মানুষের অনন্য সৃষ্টির সুসমন্বিত রূপ।
আমাদের আনন্দ যে, এই টরন্টো শহরে শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে পদচারণাকারী সৃষ্টিশীলদের বসবাস। বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে এর বিকাশের অব্যাহত ধারাবাহিকতায় কেউ কেউ গভীর মগ্নতায় বা সাধনায় কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা এইসব শিল্প-সংস্কৃতির সাধারণ ভোক্তা হিসেবে বা শ্রোতাদর্শক হিসেবে তাদের কাছে ঋণী এবং কৃতজ্ঞ। অন্তত এই বার্তাটুকু এই মুহূর্তে তাদেরকে জানাতে চাই যে, আমি তাদের কাজকে সম্মান করি। ভালোবাসি।
টরন্টো প্রবাসী মৈত্রেয়ী দেবী এই শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অতি পরিচিত একটি মুখ। এই শহরের যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা আয়োজনে তার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ও সমন্বয় সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করবেন। যে কোন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মৈত্রেয়ীর উদারহৃদয় অংশগ্রহণ কিংবা সহযোগিতা, এই শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক নির্ভরযোগ্য শক্তি। ইচ্ছে করলে এবং নিজের অন্তরে প্রেরণার উৎফুল্লতা থাকলে, কত কাজ যে একজন মানুষ করতে পারেন, মৈত্রেয়ীকে দেখলে এর একটা অনুমান করা যায়। কোভিড -১৯ এর করোনাকালীন সময়ে মৈত্রেয়ীর নানাবিধ কাজ দেশে-বিদেশে অগণিত মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
আজ আমি মৈত্রেয়ীর লেখা এই গান শুনে মুগ্ধ। মুগ্ধ বললেও কম বলা হয়। মৈত্রেয়ীর জন্য এই শহরবাসী হিসেবে রীতিমতো গৌরবান্বিত। সুপর্ণ কান্তি ঘোষ মৈত্রেয়ীর লেখা গানে সুর করেছেন৷ জয়তী চক্রবর্তী কণ্ঠ দিয়েছেন- এ যে কত বড় এক আনন্দের ও গৌরবের খবর, আমি কী করে বুঝাবো!
আহা, সেই সুপর্ণ কান্তি ঘোষ। নচিকেতা ঘোষের খোকা। মান্না দের বা তার মানা কাকার খোকা। ১৯৭৬ সাল। সুরকার নচিকেতা ঘোষ এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। স্বভাবতই কলকাতার সকল শিল্পীরা বিমর্ষ। বিষন্ন। মান্না দেও খুব ভেঙে পড়েছেন। ভেঙে পড়লেও মান্না বাবু নচি বাবুর কিশোর ছেলেটি সুপর্ণ কান্তি অর্থাৎ তাদের খোকা কি করছে বা করবে এই নিয়ে তিনি চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। মনস্থির করলেন বোম্বে থেকে এসে এবার সময় করে খোকাকে ডেকে পাঠাবেন। কিছুদিন পর কলকাতায় এসে খোকার মানা কাকা তাই করলেন। খোকাকে ডেকে পাঠালেন। জানতে চাইলেন খোকা কি করছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি। সুর সৃষ্টি নিয়ে কাজ করতে চায় কি না ইত্যাদি। ‘বাবার অনেক সুর করা গান তুলছি। কিছু গানে সুর সৃষ্টির চেষ্টা করছি।’ উত্তর দিলেন সুপর্ণ। অর্থাৎ মানা কাকার খোকা।
পুলক বাবু অর্থাৎ গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি গানের কবিতা দিয়েছেন মান্না বাবুকে সুর করে রেকর্ড করবার জন্য। মান্না বাবু তখন পর্যন্ত সেই গানের কবিতায় সুর সৃষ্টি করেন নি। সেদিন খোকার সঙ্গে সব আলাপ ও পরিকল্পনা-পরামর্শ শেষে মান্না দে সুপর্ণ কান্তির হাতে গানটি দিয়ে বললেন – এই গানটিতে সুর দিয়ে আমার কাছে এসো। আমার পছন্দ হলে গানটি আমি রেকর্ড করবো। গানটি পকেটে করে মানা কাকার আশীর্বাদ নিয়ে ভয়ে ভয়ে সুপর্ণ কান্তি তার নিজের বাসার দিকে রওয়ানা দিলেন। কলকাতা শহরের কোলাহল আর চারিদিকের বিক্ষিপ্ত শব্দসম্ভার কিছুই সুপর্ণর কানে বা বোধোদয় কুহরে পৌঁছচ্ছে না। শুধু কয়েকটি পংক্তির রঙে আঁকা এক ভাই বোনের গল্পের ছবিটি তার চোখে ভাসছে৷ মহাসাগরের অত্যুচ্চ আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো তার কানে এসে বাজছে এক বোনের জন্য প্রাণ আকুলিয়া এক ভাইয়ের গভীর গোপন আহাজারি!
দ্বিতল বাসের উপর তলায় উঠে একেবারে সামনের আসনে গিয়ে বসলেন সুপর্ণ কান্তি। যাতে অন্য আর কারো যাতায়াতে তার আপন ভাবনার ধ্যানে ব্যাঘাত না ঘটে। পকেট থেকে গানের কবিতাটি বের করে গুনগুন করে গাইতে শুরু করলেন –
মার স্নেহ কাকে বলে জানিনা
বাবার মমতা কি বুঝতে না বুঝতেই
এ বিরাট পৃথিবীতে দেখলাল
সে ছাড়া আমার আর কেহ নেই
সে আমার ছোট বোন
বড় আদরের ছোট বোন…..
এভাবেই মানা কাকার উদ্বুদ্ধকরণে তাঁদের খোকা অর্থাৎ সুপর্ণ কান্তি ঘোষ সুর করলেন এক অনবদ্য বাংলা আধুনিক গানের। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এই খবর শুনে মান্না দের উপর অভিমান করে বলেছিলেন – এই ছোট্ট ছেলে কীভাবে এই গানের কবিতার ভিতরের মর্ম বুঝবে, মান্নাদা! এটা নিশ্চয়ই এই গানের মর্মবাণীর প্রতি অবিচার হচ্ছে। পুলক বাবুর আশংকাও হয়তো অমূলক ছিল না। কেননা, সুপর্ণর বয়স তখন মাত্র সতেরো। মান্না দে একবাক্যে বলেছিলেন – খোকাই এই গানের সুর করবে। খোকার সুরেই তিনি সেই গান রেকর্ড করবেন। মান্না দের বিশ্বাস যে বিফলে যায়নি, আমরা আজ তার প্রমাণ দেখছি। এই গানটি রেকর্ড হওয়ার আরো কিছু বছর পর সুপর্ণ সুর করলেন গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের রচনায় সেই বিখ্যাত কফি হাউসের আড্ডার গানখানি।
সেই বিখ্যাত সুপর্ণ কান্তি ঘোষ সুর করছেন আমাদের শহরের প্রিয় মুখ মৈত্রেয়ী দেবীর রচনায় একটি গানে! এটা অনেক আনন্দের ও অফুরান প্রেরণার এক খবর।
মৈত্রেয়ী দেবী রচিত সুপর্ণ কান্তি ঘোষ সুরারোপিত জয়তী চক্রবর্তীর কণ্ঠে এই গানটি আমি শুনে মুগ্ধ হয়েছি। অসাধারণ একটি কাজ হয়েছে। এই গানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমার অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। মৈত্রেয়ী দেবীকে আমার প্রাণঢালা ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
টরন্টো, কানাডা
