বরফ দিনের কথা

বরফ দিনের কথা

পূর্বাচলের সেই কুয়াশাঢাকা সকাল আর শিশির ভেজা ঘাস-

সব ছেড়ে পর্বতময় এই বরফের দেশে এসেছি মাত্র এক সপ্তাহ হলো। প্রতি রাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় অসময়ে- তারপর আর ঘুম আসেনা কিছুতেই। তারপরও জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করি, ঘুমটাকে নিয়মিত করার জন্য। আজ হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গার পর মনে হলো একটা ফকফকা সকাল। জানালার পর্দা উঠানো থাকায় স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি কাঁচের দেয়ালের বাইরে চারিদিক বেশ আলো ঝলমলে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘোর কাটলো, বুঝলাম এতোক্ষন যা দেখেছি সবই মরিচিকা মাত্র। আসলে এখন রাতের মধ্য প্রহর, ঘরির কাটা রাত তিনটায় সঠান দাঁড়িয়ে টিক টিক বাজছে। অথচ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সময় আন্দাজ করার কোন উপায় নেই। চারদিক সাদা আর সাদা বরফে ঢাকা। পাশের বাসার বাচ্চারা গতকাল বিকালে বাসার সামনে যে আইস-কিউব গুলো বানিয়েছিল সেগুলো এখনো পিরামিডের মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের এক কোনায় জোস্নার ভরাট চাঁদ তীব্র আলো ছড়াচ্ছে। আর শ্বেত বরফের টুকরো গুলো সেই আলোর বিচ্ছুরন সবটুকুই কাঁচের ফাঁক গলে পাঠিয়ে দিয়েছে আমার খোলা বৈঠকখানায়। কি অপার মোহিনী এই চাঁদ রাত আর কি তাঁর অবাক করা মায়া।

- Advertisement -

বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি বারবার, কিছুতেই ঘুম আসছে না।

ভাবছি আমার মেয়ে স্বপ্নীলের দেয়া ঘুম পাড়ানী হারবাল চা পান করি। গেল বার এই চা খেয়েই ঘুমটাকে নিয়মিত করেছিলাম। তবে আমি আজ সেটা করিনি ইচ্ছে করেই। ভাবলাম গত তিন সপ্তাহের স্মৃতি রোমন্থন করবো – সেই ভালো। শীত কাঁথা মোড়ানো এই রাতে জেগে জেগে স্মৃতি রোমন্থনের অন্য রকম এক মজা আছে। এই মধ্যে সময় গড়িয়েছে আরো কিছুক্ষন, এখন রাতের শেষ প্রহর। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে এ মাসের দশ তারিখে রমনা রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের সাথে মিলন মেলার কথা। বন্ধু আনোয়ার হোসেন মুকুলের ব্যাক্তিগত উদ্যেগে আয়োজিত এই চমৎকার গেট-টুগেদারে অন্য বন্ধুদের সাথে এবার যুক্ত হয়েছে মাহবুব আলী। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু এবং ক্লাসমেট ডঃ মাহবুব আলী- বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সুবক্তা এবং অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য্য। আমার এই বন্ধুর সাথে দেখা ছাব্বিশ বছর পর রমনা রেস্টুরেন্টে। ঠিক অবিকল আগের মতোই আছে – অন্ততঃ কথায় এবং হাসিতে। যদিও ওজনে হয়তো আগের চেয়ে একটু হালকা হয়েছে। আমি বললাম বন্ধু মনে পড়ে অতীতের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মজার দিন গুলির কথা? ও খুব সরলভাবেই বললো- অবশ্যই মনে আছে। তুই সব সময় আমার সাথে ঝামেলা করতিস – পেটে খোঁচা দেয়া আর রাত্রির (ছদ্ম নাম) কথা বলে খ্যাপানোর কথা আমি কখনোই ভুলবো না। আমি বললাম দোস্ত তোমাকে যে সোজা পেয়ে মেয়েরা তোমার কাঁধে ব্যাগ ধরিয়ে দিতো, আর আর আমরা সেই নিয়ে মজা করলে শেষটায় তুমি ভ্যা ভ্যা করে কান্না করে দিতে সেটাও কি ভুলে গিয়েছ? ভাবলাম আমার কথা শুনে এখনই হয়তো খ্যাপে গিয়ে কান্না শুরু করবে মাহবুব। কিন্তু না, ও এখন অনেক পরিপক্ক – সব কিছু মজা হিসেবেই নিচ্ছে এবং শান্তভাবে গল্পো করে যাচ্ছে। মাহবুব বললো: দ্যাখ দোস্ত আমি সরল ছিলাম এখনো আছি – আর সে জন্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েও শুধু আভ্যন্তরীণ কূটকৌশলের কারনে সেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছি।

আমাদের আরেক বন্ধু লুৎফে আরা মিনু (বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক) বললো জানো সাইফুল মাহবুব না টিভি টকশোতেও সুন্দর কথা বলে। সাথে সাথেই মাহবুব বললো: দ্যাখ! টিভিতে আমি যা বলি তা বিশ্বাস করি না, আর যা বিশ্বাস করি তা তা অনেক সময়ই হয়তো বলিনা অথবা বলতে পারি না। আমার বন্ধু আবার বলছে: বেশ কিছুদিন আগের কথা। শেয়ার মার্কেট নিয়ে কথা হচ্ছে টিভি টকশোতে। আমি বললাম এখন বড় বড় সঙ্ঘবদ্ধ ফটকা কারবারীদের দৌরাত্ব আর অপকৌশলের কাছে সাধারন মানুষ জিম্মি। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারন মানুষের শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ না করাই শ্রেয়। আর সাথে সাথেই প্রযোজক সেট বন্ধ করে আমাকে একদফা নিল। বলল আপনি কি বলেছেন সেটা বুঝতে পেরছেন? স্পন্সরদের টাকায় অনুষ্ঠান চলে, এটাতো আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আমার এই বন্ধুটির নিজের পরিচয় ছাড়াও তাঁর বাবার একটি বড় পরিচয় আছে। ডঃ মাহবুব আলী হচ্ছে প্রয়াতঃ স্বনামধন্য লেখক একুশের পদক প্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, গবেষক এবং ভাষা সৈনিক অধ্যাপক মোবাশ্বের আলীর ছেলে। তাঁর যদি কথা বলতে এই দুরাবস্থা হয়, তাহলে আর সবার অবস্থা কি এটা সহজেই অনুমেয়।

 

উইন্ডসর, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent