সাধারণ মানুষরা খুব ভাল

সাধারণ মানুষরা খুব ভাল

দেশের ইস্যু নিয়ে লেখার আগ্রহ পাইনা। আগে মনে করতাম হয়তো শুধু পলিটিশিয়ানরাই খারাপ, আমরা সাধারণ মানুষরা খুব ভাল। কিন্তু গত কয়েকমাসে দেখি যেই লাউ সেই কদুই। পলিটিশিয়ানরা আক্ষরিক অর্থেই আমাদেরই প্রতিনিধি।

উদাহরণ দেই।

- Advertisement -

আমি “ফ্রিডম স্পিচ, এক্সপ্রেশন এবং রিলিজনের” দেশের নাগরিক। জ্ঞান হওয়ার পর জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় এদেশে কাটিয়েছি, আমি এমন অনেক কিছুতেই অভ্যস্ত যা হয়তো বাংলাদেশে থাকলে হতে পারতাম না।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারের বাইরে আমি লোকজনকে ওর বিরুদ্ধে অশ্লীল স্লোগান দিতে দেখেছি, যেখানে বেশিরভাগেরই হাতে ট্রাম্পের ক্যারিক্যাচার আঁকা। এবং মার্কিনিরা কোন পর্যায়ের ক্রিয়েটিভ হতে পারে সেটা বুঝতে ওসব ক্যারিক্যাচারই যথেষ্ট। মানুষের পাছার জায়গায় ট্রাম্পের চেহারা, গু খাওয়া শুকরের মাথায় ট্রাম্পের মাথা, ওর জিভ বের করা ছবি ছাপা টয়লেট পেপার, ওর হা করা মুখে হিস্যু করছে জনতা ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং সবই ঘটছে পুলিশি প্রহরায়। পুলিশ নিশ্চিত করবে এই যে লোকটা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছে, ও যেন সীমাতিক্রম না করে। মানে হচ্ছে, উত্তেজিত হয়ে কাউকে মারধর করা, ভাংচুর করা, ইত্যাদি যেন না করে। আবার, কোন অন্ধ ট্রাম্প সমর্থক যেন ওর সাথে হাতাহাতি না করে, সেই নিরাপত্তাও এই পুলিশই দিবে। কি আশ্চর্য্য একটা ঘটনা, তাই না? আমাদের দেশে কল্পনা করা যায়?

আমি কখনই ট্রাম্পের বা নেতানিয়াহুর ছবি নিয়ে ট্রল করিনা। আমি আমার শত্রুকে প্রাণ উজাড় করে ঘৃণা করি, ওর সাথে লড়তে হলে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে লড়ি, কিন্তু নিজের ডিগনিটি কখনই বিসর্জন দেই না।

তা সেদিন দেখলাম শেখ হাসিনার ছবিকে বইমেলায় ডাস্টবিনে ব্যবহার করা হয়েছে।

একজন “ডিগনিফাইড শত্রু” হিসেবে আমি জীবনেও এই কাজ করবো না। মহিলা গণহত্যার আসামি। এবং এ নিয়ে উনার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। আওয়ামীলীগ যতই ষড়যন্ত্র থিওরি আওরাক, “উনি ক্ষমতায় থাকাবস্থায় উনার পাঠানো পুলিশ বাহিনী ব্রাশফায়ার করে সাধারণ মানুষ মেরেছে” – এইটা ফ্যাক্ট।এরশাদের সময়ে এরশাদ যেমন পুলিশ লেলিয়ে মানুষ মেরেছে, এই ঘটনাও একই। মারার পরে যেসব পুলিশ ওদের লাশ পুড়িয়েছে, ওরা সিআইএর এজেন্ট ছিল না। “একটা গুলি মারলে একটাই মরে, বাকিডির কিছু হয়না” – উনারই মন্ত্রীকে এই তথ্য দেয়া পুলিশও বাংলাদেশীই ছিল।

এজন্য ওকে ফাঁসিতে ঝুলানো উচিত।

কিন্তু সবই “সভ্য” তরিকায় করবো। প্রথমে গ্রেফতার, তারপরে বিচার। বিচারে যদি প্রমান হয় উনি আসলেই নির্দেশ, সব করেছে কাউয়া কাদের, তাহলে সেটাও সভ্য তরিকাতেই মেনে নিব।

তাই বলে কারোর লা_শ_কে বিবস্ত্র করে ঝুলানো, জু তা পে টা করা, থুথু ছিটানো, কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়া ইত্যাদি সস্তা কাজে আমি নাই। আমার ধর্ম আমাকে সেই অনুমতি দেয়না।

জ্বি, স্বজন হারানো লোকজনের প্রতি পূর্ণ সিম্প্যাথি রেখেই বলছি।

এই “ডাস্টবিন ঘটনাটাতে” আওয়ামিলীগের লোকজন খুব কান্নাকাটি করেছে এবং সেটাই স্বাভাবিক। ওদের নেত্রীর এই অসম্মান ওরা মেনে নিতে পারছে না। স্বাধীন দেশে অবশ্যই ওদের  অধিকার আছে নিজের অনুভূতি প্রকাশের।

কিন্তু….এই এদেরই অনেককে আমি নিজে দেখেছি হজরত মুহাম্মদ (সঃ) কে করা অবমাননার সময়ে অবলীলায় বলতে “সামান্য বাতাস দিলেই মুছলমান্দের নুনুভূতিতে আঘাত লেগে যায়!” “ঈমানদন্ড খাড়ায় যায়!”

এখন ওদের রাজনৈতিক নুনুভূতি এত সেনসিটিভ হয়ে গেল কেন? চেতনাদন্ডের হঠাৎ কি হলো? এখন ধৈর্য্য ধরা, বা মনকে মুক্ত করতে শেখার নসিহতগুলো কোথায় হারিয়ে গেল?

এই ঘটনায় প্রচুর মানুষকে উল্লাসিতও হতে দেখছি। বেশিরভাগই বিএনপি-জামাতের। ওদের দাবি হাসিনা স্বৈরাচার, গণহত্যাকারী এবং ওকে আরও বেশি অপমান করা উচিত। ডাস্টবিনতো কিছুই না। পাবলিক টয়লেটের কমোড হওয়া উচিত এই ডিজাইনের।

অথচ এই এদেরেকেই আমি দেখেছি খালেদা জিয়ার মূর্তির হাতে পেট্রল বোমা ধরিয়ে যখন মিছিল বের করা হয়েছিল, তখন বলতে “কুত্তালীগের থেকে রুচিশীল কিছু আশা করা যায়?” “অসভ্যতারও একটা সীমা থাকা উচিত!”

আজকে নিজেরা তাহলে সেই সীমা কেন অতিক্রম করলো?

কোন প্রতিষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নামফলক যখন উল্লাস করতে করতে ছাত্রলীগ ভাঙছিল, বা খালেদা জিয়ার বাড়ি থেকে উনাকে বের করে সেটা গুড়িয়ে দিতে তখন যে ছাত্রদলকে সুশীলতা করতে দেখেছি, আজকে সেই সুশীলদেরই দেখছি শেখ মুজিবের মূর্তি/নামফলক/বাড়ি গুড়িয়ে দিতে – এবং তখনকার সেই ছাত্রলীগই আজকে এদের কাছে সুশীলতা আশা করছে!

আজকে যারা উপদেষ্টাদের থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও কথাবার্তা আশা করছেন, এই এদেরকেই কয়েকদিন আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখনিঃসৃত বাণীতে (“খালেদা জিয়া এবং সুদখোর ইউনুসকে পদ্মার পানিতে টুস করে ডুবিয়ে দেয়া উচিত, কিন্তু যাতে না মরে” ইত্যাদি) তেলে গদগদ হয়ে “পুরাই স্যাভেজ, এই কারণেই উনাকে এত ভালবাসি!” বলতে দেখেছি।

আমরা হচ্ছি এমন জাত যারা নিজেরা আজীবন জাহিল থাকবো, কিন্তু অন্যদের থেকে নবী রাসূল টাইপ চরিত্র ও আচরণ আশা করবো।

গ্যালিলিও কি এইসব তামাশা দেখেই বলেছিলেন দুনিয়াটা গোল?

আমি একবার ব্রিটিশদের “সভ্য জাতি” বলায় এক আঁতেল এসে আমাকে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার ইতিহাস আওড়ে প্রমান করার চেষ্টা নিল ওরা কতটা জালিম জাত যে আজও সেজন্য ক্ষমা চায়নি। রানী এলিজাবেথের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা বাঙালিদের ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন প্রমুখদের প্রসঙ্গ টেনে এনে তামাশা করলো – অথচ চোখের সামনের জুলাই-অগাস্টের গণহত্যার সময়ে সে মুখ সেলাই করে ফেলল। এখন আর দেশপ্রেম, মানবতা, ইতিহাস, চেতনা ইত্যাদি কিছুই ওর জন্য কাজ করেনা।

আমাদের এই ইনকনসিস্ট্যান্সি দেখে আমি সত্যিই ফ্রাস্ট্রেটেড।

আমি সত্যিই অনেক অনেক অনেক আশা নিয়ে তাকিয়েছিলাম সামনের দিকে। ভেবেছিলাম এইবার সত্যি সত্যিই বাংলাদেশ পাল্টে যাবে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদির উর্দ্ধে উঠে এইবার বুঝিবা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আইনের উপরে কেউ থাকবে না, সবাই আইনের অধীনে কাজ করবে। অপরাধ করলে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে ভয় পাবে না। কোন মন্ত্রীর ফোনকলে দাগি আসামিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেনা। আদালতের বিচারে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ থাকবে না। সরকারি অফিসার, কেরানি, মন্ত্রী কেউই ঘুষ খাবে না। থাকবে না কোন চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। সবাই “বাংলাদেশকে” ভালবাসবে। যা করবে বাংলাদেশের ভালোর জন্য করবে। কারন এ দেশটাতেই আমাদের আগামী প্রজন্ম বড় হবে। দেশের কল্যাণ মানে আমাদের নিজেদের কল্যাণ।

বিনিময়ে আমরা দেখছি গোটা জাতি দুই ভাগে বিভক্ত। একটা অন্যায় করলে একদল সেটার পক্ষে সাফাই গায় এই বলে যে আগেও এমন অন্যায় করা হয়েছে – আরেকদল নিজেদের কৃত অন্যায়ের জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত না হয়ে এমনভাব নেয় যেন এইমাত্র ফেরেস্তা জিব্রাইলের (আঃ) কাঁধে চেপে বেহেস্ত থেকে নেমে এসেছে। একেবারেই মাসুম বাচ্চা।

কারোর বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ, মূর্তি ইত্যাদি ধ্বংস করে লাভটা কি আমাকে কেউ একটু বুঝাতে পারবেন? কেউ কি বলতে পারবেন কয়টা বাড়ি পুড়ালে দেশের জিডিপিতে কত পার্সেন্ট লাভ হয়? নতুন সরকারের কি দায়িত্ব এই না যে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা? আইন ব্যবস্থার উন্নতি ও প্রয়োগ? বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন করা? চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ – এইসব দিকে উন্নয়ন? কতটুকু করেছেন সেসবের? স্বৈরাচারের বাড়িঘর পুড়িয়ে, গুড়িয়ে আমরা খুব খুশি। অথচ এই খুশিটা আসার কথা ছিল নিজের পরিশ্রমে নিজের বাড়িঘর গড়ার সময়।

- Advertisement -

Read More

Recent