
কার্তিকের শেষ আর অঘ্রানের শুরু।
গেল ভাদ্রমাসে যে ডালাগুলোতে বাউকূলের কলম লাগানো হয়েছিল সেগুলো অল্পদিনেই প্রচুর ডালপালা এবং ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কুয়াশা ঢাকা একটা খোলা তেপান্তর। অরো বেশী ভালো লাগে যখন গাছটির নিচে যাই। হাজারো মৌমাছির পাগল করা ছুটাছুটি, এক ফুল থেকে অন্য ফুলে – এক ডাল থেকে অন্য ডালে। সপ্তা না ঘুরতেই মৌচাক ভরে যায় মধুতে আর সুবাসি পুস্প-রেনুতে। মৌ বাক্সের হানি চেম্বার খুলতেই সেই কি শিউলি সুবাস আর চকচকে মধু – অনেকটা কুমিল্লার রসমলাই এর মালাই স্বাদের।
কোন এক শান্ত বিকেলের কথা। অল্প কদিন হয় হলে এসেছি।
ভাবছি আজ আমি আর মুকুট (Mudabber) পেয়াজু, সিদ্ধকরা সবুজ মটর-ছোলা আর মুড়ি কিনে আঁকা বাঁকা মেঠো পথে হাঁটবো, কাঁচা মরিচের ক্ষেত থেকে কয়েকটা টাটকা মরিচ কুঁড়াবো। আর শেষটায় গিয়ে বসবো সেই অর্ধ নিমজ্জিত পাথরের টুকরার উপর। যেখানে হাত বাড়ালেই পানি ছোঁয়া যায়, ইচ্ছে হলেই রক্ত শাপলা উঠানো যায়। গত হেমন্তে এটি আমরা মাঝে মাঝেই করেছি। আমার খুব একটা বন্ধু নাই, তাই দুজন কিংবা বড়জোড় তিন জনের আড্ডা, এর বেশী না। কাটা পাহাড়ের শেষ মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেট। পাশের ঝুপড়ী দোকান গুলো থেকে ঝাল-মুড়ি হাতে সোজা পূর্বদিকে নাক বরাবর হাঁটলেই এক কিলোমিটার পর ছোট ছোট টিলা ঘেরা এই মায়াবী পুকুর। বিকেলে বেড়াতে গেলে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত আসে, তাও মনে হয় পুকুর ঘাটে বসে থাকি। যখন সন্ধ্যা নামে তখনকার দৃশ্যটি খুব মধুর। পাহাড়ের পাদদেশে ছিল কয়েকটি ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর। সন্ধ্যা নামার আগে আগেই মেয়েরা আসে পানি নিতে। খুব সলজ্জ ভঙ্গিতে যখন ওরা ঘাটে এসে দাঁড়ায়, আমরা তখন ঘাটের পাথর ছেড়ে দেই। মনে হয় এ এক চির চেনা মুহূর্ত, না বলা বন্ধন। এই বন্ধন মাটির সাথে মানুষের, এই বন্ধন প্রকৃতির সাথে প্রকৃতি-প্রেমির।
দীর্ঘ দিন থেকেই ইচ্ছা আমার রুমের সামনে একটা মৌমাছি ভর্তি মৌ-বাক্স রাখবো। এজন্য খালি বাক্সও এনে রেখেছি, কিন্তু মৌমাছি পাওয়া যাচ্ছে না। মৌমাছিদের সাথে খেলতে আমার খুব ভালো লাগে। এতো হিংস্র মৌমাছিরা অল্প ক’দিনের দিনের মধ্যেই কিভাবে এতো পোষ মানে, সুবোধ হয় – এই অত্যাশ্চার্য বিষয়টি দেখতে ইচ্ছে হয় বার বার। মাত্র দুদিন হয় শাহজালালের তিন’শ বার থেকে চার তলার চার’শ বারোতে মুভ হয়েছি। হঠাৎ দেখছি আমার সাবেক রুমমেট লোকমান দৌড়ে এসেছে আমার কাছে, খুব হাফাচ্ছে। বলছে: ‘তোমার খালি ওয়াড্রবে হাজার হাজার মৌমাছি এসে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। রুমে চলাচল করা যাছে না। তোমার মৌমাছি তুমি উপরে নিয়ে আসো।’ অবাক ব্যাপার হলো এতো জায়গা থাকতে মৌমাছিরা এখানে এলো কেন? এটা কি কাকতালীয় না অতি-প্রাকৃতিক – এর জবাব আজো আমি জানিনা। এই ঘটনা অতি বিস্ময়ে অবলোকন করেছে সেই সময়কার আশেপাশের সব রুমমেটরা।
এরপর সব মৌমাছিদের খালি বাক্সে ঢুকিয়ে উপরে নিয়ে আসা হলো এবং আমার রুমের সামনে রাখা হলো। শাহজালাল হলে মৌচাষের এই যে সুচনা তার ইতি ঘটেছে আমি হল ছাড়ার পর। এর পঁচিশ বছর পরের কথা। দুই হাজার বারো এর ডিসেম্বর মাস। সেই শাহজালাল হলে গেলাম পুরানো স্মৃতি খুঁজতে। হলের পরানো জৌলুস অনেকাটাই মৃয়মান। সিরামিক ইটের পড়তে পড়তে গাঁড় সবুজ শ্যাঁওলা জমেছে অনেক। একজন পুরানো স্টাফের দেখা পেলাম। বয়সের ভারে তিনিও ভঙ্গুর প্রায়। বললেন: আপনি হল ছেড়েছেন ঠিকই কিন্তু আপনার মৌমাছি এখনো হল ছাড়ে নাই। ওরা বাসা বেঁধেছে পুরনো ফাঁকা ওয়ালের মাঝে মাঝে, কয়েক জায়গায়। আমি দেখলাম সত্যি সত্যিই ওরা বাসা বেঁধেছে হলে ঢুকতেই কার্নিশের ফাঁকে এবং আরো কয়েক জায়গায়। চঞ্চল মৌমাছিরা আনমনে মধু আর ফুলের রেণু নিয়ে আসা যাওয়া করছে অবিরত। এরা এখন পুরুপুরি স্বাধীন, কেউ আর ওদের মধু চুরি করতে আসে না। এক বিন্দু সময়ও নেই ওদের এক সময়ের বন্ধু এই মানুষটির দিকে তাকানোর। আবারো মনে পড়ে ছোট্ট বেলায় পড়া কবিতার সেই লাইন গুলোর কথা ……।
মৌমাছি মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াওনা একবার ভাই,
ঐ ফুল ফুটে বনে, যাই মধু আহরনে
দাঁড়াইবার সময় তো নাই।
উইন্ডসর, কানাডা

