হায়াৎ মামুদ-জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

হায়াৎ মামুদ জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

ছাত্র জীবন থেকেই তাঁরা বন্ধু : মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। কিন্তু বন্ধুত্বের নামে সম্বোধনের সম্মান-শ্রদ্ধার পারস্পরিক পারদটি অবস্থান করলো প্রথম সম্বোধনের জায়গায়; একই ভারসাম্যে।

এ এক বড়ো বিরল ব্যবহার এই চলমান জীবনে; ব্যক্তি এককের গন্তব্যে পৌঁছার দ্রুততার যুগে। সাহিত্য সৃষ্টিতে তাঁরা দুজনেই মনোনিবেশ করলেন। মূলত রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ঢাকা কেন্দ্রিক সরকারী সিদ্ধান্ত বিরোধী আন্দোলনে তাঁরা একটি প্রেরণার জায়গা খুঁজে পেলেন। মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান কবিতা দিয়েই নিজেকে প্রকাশ করতে উদ্যোগী হলেন। কিন্তু মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান নামে আরেকজন কবি আছেন। তাই, মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান মধ্যযুগের তাঁর প্রিয় কবির নামে নিজের নতুন নাম রাখলেন ‘হায়াৎ মামুদ’। সেই থেকে বাংলা সাহিত্যে এক দুর্দান্ত নাম: হায়াৎ মামুদ।

- Advertisement -

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত নিজেকে প্রকাশ করলেন গল্পে। সেই গল্প গদ্যেও মিশে থাকলো কবিতার মতো ভাষাচিত্রের কাব্য প্রলেপ। একেবারে শুরু থেকেই নিজেকে বিশিষ্ট ভাবে এবং ভাষার ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে নিয়ত প্রচেষ্টার কৌশল আয়ত্ত করলেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। গত পঞ্চাশ বছরে তিনি গল্প লিখেছেন যত; নিরীক্ষণেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তত নিবিষ্টচিত্তে।

সাতচল্লিশ উত্তর ঢাকা কেন্দ্রিক সাহিত্য চেষ্টা শুধুই শখের লেখালেখি খেলা ছিলো না। আত্মপরিচয় উন্মোচনের পাশাপাশি ছিল আত্মপ্রতিষ্ঠার বহুদা প্রচেষ্টার শুরু।

হায়াৎ মামুদ যেমন ক্রমান্বয়ে ভাষার শুদ্ধতম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ত নিয়োজিত করলেন, পাশাপাশি আমাদের সাহিত্যের পাঠোন্মোচন করে দেখিয়ে দিলেন লেখাটির সাফল্য-ব্যর্থতার আলোছায়ার দিক। সমালোচনা সাহিত্যে অগ্রগণ্য করে আমাদের সাহিত্য ক্ষেতের জমিকে ক্রমশ উর্বর করে তুলতে লাগলেন। গড়ে তুলতে সচেষ্ট হলেন সাহিত্যের উর্বর জমিতে চাষ করার সৃজনশীল নবীন কৃষকের ফসল তোলার ঘর। দুই বন্ধু মিলে প্রকাশ করতে উদ্যোগী হলেন সাহিত্য পত্রিকা।

এদিকে তাঁদের আরেক বন্ধু আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁদেরই অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে প্রকাশ করতে লাগলেন সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’। তার পরের সবই ইতিহাস। যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে সমান্তরাল হয়ে লেখা থাকবে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে।

আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যের দুজন ভিত্তি কারিগর হায়াৎ মামুদ, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। তাঁদের দুজনকে আমার অপরিমেয় শ্রদ্ধা।

 

ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

‘এখন সেই আশ্চর্য বৃষ্টি নেমেছে শ্রীমন্ত। এত ধূসরতার পরে। যার জন্যে আমি উন্মুখ প্রতীক্ষায় ছিলাম। এবং তাই উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। তুমি সে কথা জানতে। আমি ভেবেছিলাম, আমার মতো তুমিও অমনি প্রফুল্ল হবে এবং আমার আনন্দের সঙ্গী হয়ে আমায় তৃপ্ত করবে। অথচ শ্রীমন্ত, তুমি এখন আশ্চর্য রকম নীরব হয়ে আছ, তোমাকে ব্যথিত দেখাচ্ছে- যেন কাঁদতে পারলেই খুশি হও তুমি।

খানিকক্ষণ আগে আমি যখন এই ঘরে ঢুকলাম- তুমি আগে থেকেই বসে ছিলে, তোমার দৃষ্টি আমায় কোমল গাঢ় আশ্লেষে আবদ্ধ করল, শ্রীমন্ত। অথচ তারপরে, তুমি সেই দৃষ্টিকে ভাঙলে, ছড়ালে, কণায় কণায় আমার অঙ্গে ছড়িয়ে দিলে আর সেই অজস্র কণা তোমার দু’চোখে আকুল হয়ে থিরথির করে কাঁপতে লাগলো।’

(‘পরমাত্মীয়’

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

সাহিত্যম্।। কলকাতা)

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প পড়ে মানুষের প্রতি মমতা আর ভালোবাসার ছোট ছোট অনুষঙ্গগুলো অনুভব করেছিলাম। প্রকৃতির ঝড় জাপটার সাথে প্রাকৃতজনের জীবন আর জীবনের টানাপড়েন জেনেছিলাম হাসান আজিজুক হকের গল্প পাঠ করে। দক্ষিণা বাতাসে যেমন নারকেলপাতার ছেঁড়া অংশকে একবার বুক দেখায় আর একবার পিট দেখায়; তেমনি, জীবনের বাতাসে প্রান্তিক মানুষেরও একবার বুক দেখাতে হয়, তো আরেকবার পিট দেখাতে হয়। গল্পের আদলে এসবই ভাষার রঙ দিয়ে ভাষাচিত্রের গল্পকলা। অসাধারণ গল্পকলার শিল্পী এঁরা দু’জনেই। কিন্তু জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত যখন গল্প বুনেন তখন গল্পের সীমানা পার হয়ে তা কবিতার সাথে সখ্য গড়ে তুলে। এ এক আশ্চর্য কুশলতাসম্পন্ন নির্মিতি। বাংলা সাহিত্যে যা একেকটি অতি মূল্যের মোহর। উপরের গল্পটি একটি গল্পের সামান্য অংশের উদাহরণ মাত্র।

জ্যোতিদার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent