
আজ সোনালী রোদ মাখা নীলাভ ঠাণ্ডার এক শীত সকাল।
কুয়াশা কাটেনি এখনো, চারিদিক শুভ্রুতায় ঢাকা। এই মাঘে শীতের প্রকোপ প্রচন্ড হলেও সকালের রোদটা গাঁয়ে লাগাতে খুব ইচ্ছে করছে। গেট থেকে বের হয়ে দেখি পুরো রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। ডিগ্রী কলেজ রোডে দু’একজন মানুষ চাদুরমুড়ি দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। কালা মিয়াঁ এসেছে ভার কাঁধে মাটির কলসিতে খেজুর রস নিয়ে। আজ সে এনেছে আগ-কাটার রস। এই রস খেতে খুব মিষ্টি এবং সুস্বাদু। কালা মিয়াঁ আর লাল মিয়াঁ জমজ দুই ভাই। গত সাত বছর থেকে এঁদের দেখছি কিন্তু আজও পার্থক্য করতে পারিনা। দুই ভাই অবিকল একই চেহারার এবং দেখতে একই রকমের। দেশের বাড়ী ফরিদপুরে হলেও শীতের এই সময়টাতে ওরা দুই ভাই থাকে আমাদের দৌলতপুরে। শীতের মৌসুমে খেজুর গাছ কাটে আর এর পর নিজের দেশের বাড়ীতে চলে যায়। খুব ভালো মানুষ এই দুই ভাই। আমি প্রায়ই ভুল করে কালা মিয়াঁককে ডাকি লাল মিয়াঁ আর লাল মিয়াঁকে কালা। কিন্তু একটুও রাগ হয় না বরং যেদিন খুব ঠান্ডা পড়ে এবং আগ কাটার রস আসে সেদিন নিজ থেকেই রস দিয়ে যায়। আজ ইচ্ছে মতো কাঁচা রস খেলাম এবং আরো এক কলসি কেনা হলো পিঠা আর ফিরনী রান্নার জন্য। শীতের শুরুতেই আমাদের টিন শেডের ঘরের পাশে বানানো হয়েছে দু-চোখা মাটির চুলা। আমার মার হাতে মাটির চুলায় পিঠা খুব ভালো হয়। আমাদের অনেক ভাই-বোনের সংসার। সবাই কাঠের পিড়ি নিয়ে মাটিতে বসেছি। এক চুলায় ভাপা পিঠা, অন্য চুলায় চিতৈ পিঠা। লাভলী এবং চামেলী এসেছে ওদের শহুরে খালতো ভাইকে নিয়ে ফুফুর হাতের পিঠা খেতে। সবাই মিলে একসাথে চুলার পাশে আগুন পোহানো আর পিঠা খাওয়া। আহা! সেই কি তৃপ্তি, সেই কি নির্মোহ আনন্দ – শুধুই স্মৃতি।
“কোথা সে ছায়া সখি, কোথা সে জল;
কোথা সে বাঁধানো ঘাট অশ্বথ তল।“
এখন কিছুই নেই আমাদের ডিগ্রি কলেজ রোডের সেই বাড়ীতে।
নেই মাটির ঊনুন, নেই টিনের ঘর – আছে শুধু বিশালকায় অট্টালিকা। আমাদের বাড়ির চারদিকে ছিল আম, জাম, আমড়া, বড়ই, নারিকেল এবং খেজুর গাছ সহ রকমারি গাছের সমাহার। আর গাছ গাছালির ফাঁকে বসানো হয়েছিল ছয়টি মৌমাছির কলোনী (মৌবাক্স)। কার্তিকের শেষে বিশালকায় বাউকুল গাছটিতে বসতো হাজার হাজার মৌমাছির মেলা। গুন গুন শব্দে মনের আনন্দে এরা মধু সংগ্রহ করতো আর সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো। প্রতিদিন সকালে উঠেই দেখতাম মৌবাক্সের হানি-চেম্বার ভরাট হতে আর কতো সময় বাকি। বাউ ফুলের হালকা সুবাস আর চকচকে বাদামী মধুর ফিকে ঘ্রান মস্তিকের স্নায়ুতন্ত্রের সাজগোজ এলোমেলো করে দিয়ে নিয়ে যেতো মাধবীলতার দেশে।
উইন্ডসর, কানাডা
