তিস্তা ব্যারেজের গপ্পো

বিজ্ঞানী অ্যালেক্সান্ডার মিচেল কেল্লাস তত্ত্ব দিয়েছেন হিমালয়ের উচ্চ চূড়ায় উঠতে মানবদেহে সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন প্রয়োজন নেই

সনি আর টুনি দুই ভাই। তিব্বতের শেরপা সম্প্রদায়ের লড়াকু পর্বত সৈনিক। স্কটিশ বিজ্ঞানী অ্যালেক্সান্ডার মিচেল কেল্লাস এই দুই ভাইকে আবিষ্কার করেন ১৯১১ সালে। পাহাড়ি জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা সুঠাম দেহী দুই ভাইকে আবিষ্কারের পেছনে এক বিশাল বৈজ্ঞানিক রহস্য লুকিয়ে আছে।

বিজ্ঞানী অ্যালেক্স ছিলেন রসায়নবিদ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পারদ তখন উত্তুঙ্গে। বিজ্ঞানীরা বিশ্ব সমাজের সবচে বড় সেলিব্রেটি। সেসময় তাঁর ‘হাই-আলটিচ্যুড ফিজিওলজি থিওরি’ হৈ চৈ ফেলে সারা বিশ্বে। বাই প্রোডাক্ট বিষফোঁড়ার মতো সমালোচনার ঝড়ও ওঠে। অন্য বিজ্ঞানীরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তাঁকে। বিদ্রুপ করা হলো, কাগজের বিজ্ঞানপত্রকে মানবদেহে প্রতিস্থাপন করে ‘থিওরি’ প্রমান করুণ মিস্টার কেল্লাস?

- Advertisement -

বিজ্ঞানী অ্যালেক্সান্ডার মিচেল কেল্লাস তত্ত্ব দিয়েছেন হিমালয়ের উচ্চ চূড়ায় উঠতে মানবদেহে সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন প্রয়োজন নেই। হাই-আলটিচ্যুড ফিজিওলজিতে তিনি তাত্ত্বিকভাবে সরলীকরণ করেছেন সুঠাম দেহের সুগঠিত সুস্থ ফুসফুসে বাড়তি অক্সিজেন ছাড়াই মানুষ হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে পারে। এক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত বায়ু চাপ এবং অপ্রতুল অক্সিজেন বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেনা।

অ্যালেক্স ভারতবর্ষে এলেন। সীমানা পেরিয়ে উত্তরের পর্বত মালায় গেলেন। তিব্বতের পাহাড় জঙ্গল গ্লেসিয়ার চষে বেড়ালেন। সুখী শেরপা গোষ্ঠির যুৎসই সুঠামদেহী মানুষ খুঁজতে লাগলেন। গিনিপিগ হিসাবে নয়। কাউকে তিনি গিনিপিগ বানাতেন না। মানবীয় গুণের বিশাল মনের মানুষটির হার্ট বা হৃদয়টাই কেবল বড়ো ছিলোনা। ছিলো বিশাল একটা ফুসফুস। যা দিয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নিতেন। একারণে নিজেই হতে পেরেছিলেন বিখ্যাত মাউন্টেনিয়ার বা পর্বতারোহী। পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে তাঁর দমে ঘাটতি হয়নি কখনো।

হঠাৎ একদিন সনি টুনির দেখা পেয়ে গেলেন। ভীষণ পছন্দ হলো ওঁদের। দুই ভাইয়ের শারীরিক গড়ন এবং সাহস মুগ্ধ করলো এই বিজ্ঞানী কাম পর্বতারোহিকে। টিমের সদস্য করলেন। ট্রেনিং দিলেন। এবার এসাইনমেন্ট!!

বেশ কঠিন এসাইনমেন্ট দেয়া হলো। উঠতে হবে ৭ কিলোমিটার উঁচু পর্বত চূড়ায়। কাঞ্চনজঙ্গা থেকে ৭৫ কিলোমিটার উত্তরে পাউহুনরি নামক পর্বতচূড়ায়।

আনুমানিক রুট আগেই ঠিক করা ছিলো। এবার কবি নজরুলের দুস্তর পারাবারে দুর্গম গিরি যাত্রা। নিশ্চিত মৃত্যু মাথায় রেখে তিন বীর সনি, টুনি, অ্যালেক্স যাত্রা শুরু করলেন। অক্সিজেন বোতল ছাড়াই শুরু হলো আরোহন। পাহাড়ি জঙ্গলে বিষাক্ত পোকা, সর্পদংশন, বৃক্ষ কন্টক আর পা হড়কে ভয়ংকর মৃত্যুকূপে পতিত হবার শংকা। একফুট একফুট করে উপরে উঠছে। উঠতে হবে ২৩ হাজার ৩৮৬ ফুট!

নীচে তাকালে ভয়াবহ গিরিখাত। পাথুরে খাঁড়া গা। মাথা ঘুরে অজ্ঞান হবার দশা! হলিউড থ্রীলার এর কাছে নস্যি। থ্রী-ডি থিয়েটারে বসে এমন দৃশ্য দেখলে দর্শকের সীট থেকে পড়ে যাওয়া নিশ্চিত! আর ওঁরা সেটি বাস্তবে রূপদান করে যাচ্ছে……।

১৪ জুন ১৯১১। দুটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড। এক. সর্বোচ্চ চূড়ায় মানুষের নন-মেক্যানিক্যাল আরোহন। দুই. ৭ কিলোমিটারের অধিক উচ্চতায় সাপ্লিমেন্টারী অক্সিজেন ছাড়া মানুষের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহন।

রেকর্ড বলবৎ ছিলো ১৯২৮ পর্যন্ত। পামির মালভূমিতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন পিক (বর্তমানে তাজিকিস্তানের ইবনে সিনা পর্বতচূড়া) বিজয়ের মাধ্যমে এ রেকর্ডের অবসান হয়।

মনে মনে এবার পাঠকের প্রশ্ন। অক্সিজেন, ফুসফুস, রসায়ন, বায়োলজি আর পর্বত চূড়ার সাথে শিরোনামে দেয়া ‘তিস্তা ব্যারেজের ইতিকথা’র সম্পর্ক কি? জানি… সবাই এখন আজাইরা প্যাঁচালের দায়ে লেখকের মুন্ডুপাত করছেন। তবে হ্যাঁ, সম্পর্ক একটা আছে। “কোথাকার জল কোথায় গড়ায়”, এই আপ্তবাক্যের সত্যতা যাচাইয়ের চমৎকার প্রেক্ষাপট হতে পারে এই গল্প। রসায়ন, বায়োলজি আর ভূগোলের বরফ জল পাউহুনরি থেকে গড়িয়ে চুপিচুপি ডুব দেয় যমুনার উষ্ণ পানিতে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটের কাছে।

কেনোনা অ্যালেক্স তাঁর অক্সিজেন ফিজিওলজি প্রমাণ করতে হিমালয়ের পাউহুনরি নামক যে চূড়ায় উঠেছিলেন, সেটিই আমাদের প্রিয় নদী তিস্তার জন্মস্থান।

চীন-ভারত সীমানায় পাউহুনরি পয়েন্টের বরফ গলা পানি থেকে উৎপন্ন সোলামো (Tso Lhamo) লেক বা হ্রদ। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৫১০০ মিটার উচ্চতায় এ হ্রদ। সোলামো হ্রদের দক্ষিণে বহমান স্রোতের নাম তিস্তা। উত্তরবঙ্গের লক্ষ কোটি কৃষকের ফসলি জমির তৃষিত জলধারা। রুক্ষ শুষ্ক মৃত্তিকা কন্যার মন ভেজানোর প্রাকৃতিক কৌশল। প্রকৃতির যে কৌশলে ঊষর মৃত্তিকার নরম জঠরে জন্মে সবুজ ফসল। গোলাভরা শস্য।

প্রকৃতির কী আশ্চর্য খেয়াল! চীনের তিব্বতের পাউহুনরি পর্বত চূড়ার বরফ গলা জলে সৃষ্ট সিকিমের সোলামো হ্রদ। সেখান থেকে দীর্ঘ ৪১৪ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তিস্তার শেষ বিন্দু গড়িয়েছে বাংলাদেশের যমুনায়। কুড়িগ্রাম গাইবান্ধার বিশুষ্ক চরাঞ্চলে!

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent