
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। অমর একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমির পুকুরের পাশ দিয়ে হাঁটছি। আমার সামনেই শামসুর রাহমান ও সালেহ চৌধুরীর মুখোমুখি হলেন মফিদুল হক। সহসা দেখি মফিদুল হকের হাতে থাকা বড় খাম খুলে শামসুর রাহমানের হাতে একটি বই দিলেন। খুব কাছাকাছিভাবে থাকায় বইয়ের শিরোনামটি পড়তে অসুবিধে হলো না : শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা।
পুরো কাচের চশমার আড়ালে কবির ঝসলে ওঠা চোখের দীপ্তি আমাকেও জানান দিল। মায় দুজন স্মিত হাসির মানুষের নীরব চাহনীর মুখ থেকে চোখ ফেরাতে মন চাইলো না। চেয়ে রইলাম। রাহমান ভাই, কেমন হয়েছে? এই ছোট বিনীত অথচ আত্মবিশ্বাসী এক জিজ্ঞাসার উত্তরে দুইহাতে মেলে ধরা বই থেকে এক হাত দিয়ে মফিদ ভাইয়ের হাত চেপে ধরে কবির উত্তর : ভীষণ সুন্দর হয়েছে মফিদ! কবি প্রথম পাতাটি উল্টিয়ে পুরো পাতা জুড়ে তাঁর অসাধারণ স্মিত হাসির ছবিটি দেখলেন। কী আশ্চর্য যে, বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে হাসিটা লেগে গেল তাঁর টোল পড়া লজ্জা মেশানো মুখের স্মিত হাসিতে। কবির পাশে থাকা সালেহ চৌধুরীও এই হাসি ও খুশির ফোরায়ায় ভিজে গেলেন। সামান্য দূরে থেকে আমাকেও স্পর্শ করলো সেই খুশি-ফোয়ারার আনন্দের জলকণা। এক অদৃশ্য তৃপ্তিকর প্রশান্তির বাতাস আলিঙ্গন করলো অনেক মানুষের ভিড়ে গোপনে আমাকেও।
সহসা দেখি বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছেন পুরো কাচের চশমা চোখে, কালো পাইপমুখে দীর্ঘদেহী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সাথে রশীদ হায়দার। দুজনেরই ব্যাকব্রাশ করা চুল। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ঢেউ খেলানো চুল আকাশে উড়ে যাবার তাড়নায় উদ্যত। কবির সাথে দুই কথাসাহিত্যিকের কুশল বিনিময় হলো। যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে পরস্পর হাঁটলেন আপন উদ্দেশ্যে। আমি চেয়ে দেখলাম বাংলা কাব্য-সাহিত্যের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কদের আপন আপন পদচারণার বিনীত ভঙ্গিমা।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে এই আমার প্রথম চোখের সামনে থেকে দেখা। কিন্তু একটি মানুষকে সারাজীবন মনে রাখার মতো এই একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। এই চোখ। চোখে থাকা এই চশমা। চশমার আড়ালে থাকা গভীর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি। একবার দেখলে কে ভুলে যেতে পারে!
এর অনেক অনেক দিন পর আবার সেই মানুষটিকে দেখবার সুযোগ এলো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক জন্ম বার্ষিকীতে একটি আলোচনার আয়োজন করলেন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’। শান্তিনগর মোড়ের এক বহুতল অট্রালিকায় লেখক শিবিরের অফিস কক্ষে সেই আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। পত্রিকায় দেখলাম সেখানে আলোচনা করবেন বদরউদ্দীন ওমর ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এই আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত উল্লেখ করে পত্রিকায় আমন্ত্রণ জানানো হলো।
লেখক শিবিরে তো লেখকরাই থাকবেন। নিদেনপক্ষে লেখক শিবির কর্মকর্তাদের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক লাইন বা দলের অনুসারী। আমি তো এর কোনটাই নই! স্থির করলাম কেউ জিগ্যেস করলে বলবো আমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভক্ত। কতটুকু ভক্ত? বাজিয়ে দেখতে কেউ যদি ঠেলে ফেলে দেয় মানিকের পদ্মার জলে? পরখ করে দেখতে চায় কতটুকু আয়ত্বে আছে সেই গভীর জলের উত্তাল ঢেউ থেকে বাঁচার সাহিত্যের সাঁতার! তাহলে তো আমি শেষ! কুবের আর কপিলার সাথে যে আমার জীবনযাপন করা আছে, এদেরকে আমি চিনি একথা কি সেখানে বলা যায়! শশী ও কুসুমের কথা পড়ে যে আমি এক অপ্রকাশ্য তাড়নায় একা একা মাইলের পর মাইল রাতের অন্ধকারে হেঁটে গিয়েছি অজানার উদ্দেশ্যে একথা কি এদের কাউকে বলা যাবে! এই সাতপাঁচ ভেবে তবু গেলাম। বিষয়টা যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়! আর সেখানে বলবেন স্বয়ং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস! অনেকটা ভীরু পায়ে আমি লেখক শিবিরের কক্ষে গিয়ে উপস্থিত হলাম। কেউ আমাকে কিছু জিগ্যেসে করলো না। তবু আমার মনে হলো আমি এক অনাহূত আগন্তুক। উপস্থিতি এতো কম যে নিজেকে ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে ফেলারও কোন উপায় নেই। মাত্র দশবারো জন শ্রোতাদর্শকদের মধ্যে অনাহুত আগন্তুক বৈশিষ্ট্যহীন আমার চেহারার একজনের উপস্থিতি কারো মনে কোন প্রশ্নের উদ্রেকই করলো না। আমি অধীর আগ্রহে বসে রইলাম কখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলবেন। কোন আনুষ্ঠানিকতা না করে সরাসরি বদরউদ্দীন ওমর শুরু করলেন। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম বিষয়ক কিছু কথার উত্থাপন করলেন। কথা সামান্যই বললেন তিনি। এবং উল্লেখ করলেন মূল আলোচক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আলোচনাই আমরা সবাই শুনবো।
ইলিয়াসও পাশে বসে এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা বা অনুষ্ঠানের নান্দীমুখ শুনলেন। বদরউদ্দীন ওমর ইলিয়াসকে আলোচনায় আহবান করলে তিনি আট মিনিট বিরতির সময় চাইলেন। বদরউদ্দীন ওমরের কথা শেষ হলে আট মিনিট সময় নিয়ে ইলিয়াস বসা থেকে ওঠে বারান্দায় গেলেন। পকেট থেকে একটি প্যাকেট বের করে সেটা থেকে একটু পরিমাণ মতো তামাক হাতে নিয়ে প্যাকেটটি প্যান্টের পকেটে রেখে দিলেন। এবার হাতে নেওয়া তামাকটি একটি হাতের তালুতে রেখে অন্য হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঢলতে লাগলেন। প্রায় চার মিনিট সেই তামাক ঢলার পর আরেক পকেট থেকে বের করলেন একটি পাইপ। সেই পাইপের নির্দিষ্ট গর্তে ঢলা তামাকখানি নিপুণ শিল্পীর মতো স্থাপন করে দেশলাইকাঠি দিয়ে জ্বালিয়ে একটি মাত্র টান দিলেন। দেশলাইকাঠির আগুনের শিখা চিরাচরিতভাবে উপর দিকে না গিয়ে পাইপ মুখে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের টানে তামাক পুড়িয়ে নিজেই নিঃশেষ হয়ে গেলো। ইলিয়াস বিশ থেকে ত্রিশ সেকেণ্ডের এক টানে সম্পূর্ণ তামাক জ্বলার ধোঁয়া ভিতরে নিয়ে ধরে রইলেন দম বন্ধ করে। অতঃপর চোখ বন্ধ করে আকাশের উদ্দেশ্যে মুখ খুলে ছেড়ে দিলেন ধারণকৃত ধোঁয়ার কুণ্ডলী। একটি পাইপের তামাক পুড়িয়ে এক টানে ধোঁয়া ধারণ করা এক নিপুণ শিল্পীর সেই ছবিটি আমার চোখে লেগে আছে আজও।
জন্মদিনে আজ তাঁর সেই ছবিটি আমার চোখের সামনে ভাসছে! আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : আমাদের কালের এক সাহিত্যশিল্পীর নাম।
তাঁর স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
টরন্টো, কানাডা
