
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শুরুতে প্রেডিক্ট করেছিলাম এই গ্রূপ থেকে ইন্ডিয়া-নিউজিল্যান্ড এবং অন্য গ্রূপ থেকে অস্ট্রেলিয়া-আফগানিস্তান উঠবে।
এখন পর্যন্ত ইন্ডিয়া-নিউজিল্যান্ড নিজেদের নাম নিশ্চিত করেছে।
ওদিক থেকেও অস্ট্রেলিয়া মোটামুটি তৈরী, আফগানরা এখনও কিছুই করতে পারেনি। এখনও ওদের বাতিল বলাটা ঠিক হবেনা, তবে খুব সম্ভব সাউথ আফ্রিকা এগিয়ে যাবে।
আমি বাংলাদেশের সাপোর্টার, কিন্তু রিয়েলিটি মেনেই প্রেডিক্ট করেছিলাম। এর পেছনে কোন আবেগ, মান, অভিমান কিছুই কাজ করেনি। লজিক ছিল, এবং দুনিয়ায় সাধারণত লজিকই জিতে।
আমি নাইন্টিজের কিড, সেসময়ে ক্রিকেট দেখে বড় হয়েছি। সেই দশকের ভাল ক্রিকেট দল ছিল সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান এবং মাত্র কয়েক বছরের জন্য শ্রীলংকা। এককালের সম্রাট ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখন সূর্যাস্ত মুহূর্ত চলছে। ইন্ডিয়া পুরোপুরি টেন্ডুলকার নির্ভর দল ছিল। ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড মাঝেমধ্যে সমীহ জাগাতো, কিন্তু ধারাবাহিকতা ছিল না। বাংলাদেশ একেবারেই দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিল। আমরা সম্মানজনক হারের জন্য মাঠে নামতাম। কেনিয়া আমাদের হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিত। জিম্বাবুয়ের কাছেও পাত্তা পেতাম না। জিম্বাবুয়ে মাঝেমধ্যে জায়ান্ট কিলার হয়ে পৃথিবীকে চমকে দিত। তাই ৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পরে আমাদের সবার মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই অনুভূতি এই জেনারেশনের কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। বাংলাদেশ যদি অস্ট্রেলিয়াকেও হারায়, তবুও না।
তা সেই সময় থেকে মোটামুটি সব দেশগুলোর “ট্রেন্ড এনালিসিস” করছি। এবং চোখের সামনে দেখলাম ইন্ডিয়া কোথা থেকে কোথায় চলে গেল। আমাদের অপর দুই এশিয়ান দল, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকা কোথা থেকে কোথায় নেমে এলো। দশ পনেরো বছর আগেও যে আফগানিস্থান জাপান, হংকংয়ের সাথে খেলতো, ওরা আজকে কোথায় উঠে গেল। উন্নতি আমাদেরও হয়েছে। আমরা এখন যে ক্রিকেট খেলি, বিশ্বাস করেন, নব্বইয়ের দশকে এমন ক্রিকেট কল্পনাতীত ছিল। কিন্তু বাকিদের তুলনায় আমাদের উন্নতি এতটাই কম যে আমাদের অবস্থানগত তেমন পরিবর্তন ঘটেনি।
এখন আমরা আমাদের প্রতিবেশী ইন্ডিয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবতে পারি, “অইছিছি ওদের ফেভার করে। ওরা চোরামী করে জিতে। ওদের পন্ডিতরা জাদুটোনা করে।” ইত্যাদি ইত্যাদি।
বা পাকিস্তানী সাবেক ক্রিকেটারদের মতন (ওয়াসিম-ওয়াকার ছাড়া) ক্যামেরার সামনে বসে ননসেন্স কথাবার্তা, বর্তমান দলের খেলোয়াড়দের গালাগালি ইত্যাদি করতেই পারি। এতে আমাদের ভিউয়ার আসবে, উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানো যাবে।
অথবা এই গবেষণা করতে পারি যে, “ওরা কি করছে যা ওদের সাফল্য এনে দিচ্ছে? এবং আমরা কেন ওদের মতন হতে পারছি না?”
আপাতত ধরে নেই শেষের এপ্রোচটা লজিকাল। কারন বেহুদা কান্নাকাটি করে কারোরই কোন লাভ হয়না। সফল হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো আগে সমস্যা স্বীকার করা। তারপরে সেটা সমাধানে কাজ করা। আমাদের ভাগ্য খুবই ভাল, আমাদের জন্য রেফারেন্স হিসেবে বহু সফল দল আছে, আমাদেরকে শুধু ওদের পদ্ধতি আক্ষরিক অর্থেই নকল করতে হবে। তারপরে একটা সময়ে যদি নিজেরাই উন্নতি ঘটাতে পারি, সেটাও যুক্ত হবে।
যেমন, নব্বইয়ের দশকে ইন্ডিয়া যখন মার খাচ্ছিল, ওরা তখন ওদের ডমেস্টিক ক্রিকেটের স্ট্যান্ডার্ড বাড়াচ্ছিল। কারন অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা মাত্র দুই কোটি এবং ক্রিকেট সেদেশে জনপ্রিয় না হলেও ওরা শুধুমাত্র ওদের ঘরোয়া ক্রিকেটের স্ট্রাকচারের কারণেই বিশ্বশাসন করছে।
ইন্ডিয়া জানতো টেন্ডুলকার আউট হলেই ওদের বারোটা বেজে যেত। তাই ওরা এই বিষয়ে কাজ করে গেছে। ওরা জানতো ওদের কোন ফাস্ট বোলার ছিল না। ওরা সেটা নিয়ে কাজ করেছে। ওরা যখন ফাস্ট বোলার পেল, তখন দেখে ডেথ বোলার নাই। সেটা নিয়েও কাজ করেছে। উপরের দিকে ব্যাটসম্যানরা রান তুলে দিলেও ভাল ফিনিশারের অভাবে ওরা ম্যাচ হারতো। ফিনিশারও তৈরী করা হলো। একদিনের ঘটনা না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটেছে। স্ট্যাটস দেখে দল তৈরী করেনি, একটা পরিকল্পনা করে দল সাজানো হয়েছে।
একটা আদর্শ ওয়ানডে দল কেমন হওয়া উচিত? একজন বিদ্ধংসী ওপেনার, যে শুরু থেকেই আক্রমন শুরু করে।
পাশাপাশি এমন ওপেনার যে বুঝে শুনে খেলে। উইকেট ধরে রাখে।
মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা ইনিংস মেরামতে মনোযোগী হবে, পাশাপাশি রোটেশন অফ স্ট্রাইক থাকবে, যাতে রানরেট কখনই না নামে।
শেষের দিকে দ্রুত রান তোলার মতন কিছু ব্যাটসম্যান লাগবে। অলরাউন্ডার লাগবে যারা প্রয়োজনে ব্যাট চালিয়ে রান তুলতে পারে। বিশ্বমানের স্পিনার লাগবে। ফাস্ট বোলার লাগবে যে গতি দিয়ে চমকে দিবে। আবার এমন ফাস্ট বোলারও লাগবে যে লাইন লেন্থ, সুইং ইত্যাদি দিয়েও ব্যাটসম্যানদের উপর চড়াও হবে। ডেথ ওভারে নিখুঁত ইয়র্কার করতে পারবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আজকের ইন্ডিয়াকে দেখেন। পনেরোজনের একটা দল নিয়ে টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছে। যে এগারোজন দলে চান্স পায়, ওরাই পারফর্ম করে। বেঞ্চে যারা বসে থাকে, ওদেরকে নিয়েও একটা আস্ত দল বানানো সম্ভব যারা বিশ্বের যেকোন দলকেই চ্যালেঞ্জ করে লড়তে পারবে।
একজন খেলোয়াড় ইনজুরড হলেও সমস্যা নাই, অন্য কেউ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। শুরুর দিকে রোহিত আউট হলেও সমস্যা নাই, গিল-কোহলি টেনে নিয়ে যায়। কোহলি আউট হলেও চিন্তা নাই। রাহুল, সুরেশ, পান্ডিয়া, সুরিয়া সবাই আছে। ওদের ক্রিকেটাররা ভয়ভীতি ছাড়াই ক্রিকেট খেলছে।
ওদের দলের ক্রিকেটারদের ফিটনেস দেখছেন? উড়ে উড়ে বল ধরে, গত টি-২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলো শেষ ওভারের ঐ ক্যাচের কারনে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা হলে ওটা ছয় হয়ে যেত নিশ্চিত। প্রফেশনাল ক্রিকেটে ফিটনেসকে কিভাবে অস্বীকার করবেন?
ওদের স্টেটস লেভেল ক্রিকেটে ইয়ো ইয়ো টেস্ট হয়। যদি কোন খেলোয়াড় পাশ করতে না পারে, তাহলে সে স্টেট লেভেল দলেই চান্স পায়না, সে জাতীয় দলে চান্স পাবে কিভাবে? কোহলি, রোহিত, জাদেজা যত সিনিয়রই হোক, সবাই ফিটনেসকেই নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি দেয়।
আর বাংলাদেশের প্লেয়াররা ভরপেট ভুড়িভোজন করে। পাকিস্তানী কোচ ফিটনেসের ইস্যু তোলায় প্লেয়াররা রাগ করে সেই কোচকে বরখাস্তই করিয়ে ফেলে।
আশি-নব্বই দশকের দূর্বল ইন্ডিয়া আজকে তিন মোড়লের একটি। ওদের কথায় আইসিসি উঠে বসে।
আশির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর নব্বইয়ের ভয়ংকর শ্রীলংকা এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
প্রথম দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ গত ওয়ানডে বিশ্বকাপও কোয়ালিফাই করেনি। ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডস, মাইকেল হোল্ডিংরা এখনও জীবিত। তাঁদের চেহারার দিকে তাকানো যায়না।
এইগুলি অশনি সংকেত। এর মানে আমরা যদি আমাদের উন্নতিতে কাজ না করি, তাহলে আমরাও ওদের মতন বাতিলের খাতায় নাম লেখাবো। বড় বড় টুর্নামেন্টে নতুন কোন দল এগিয়ে আসবে, আমরা তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো।
