গল্প- শঙ্খচিল

ছবিশ্যামল বসাক

ছিনতাই, রাহাজানি- এসব জীবনে অনেক করেছে রাজীব। কিন্তু কিডন্যাপ এই প্রথম। তাও আবার কিডন্যাপ করেছে জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক কয়েস সামীকে। কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে ঢাকা থেকে একটু বাইরে, গাজীপুরে।। দরজা জানালা বন্ধ ছোট্ট একটা রুমে তালা বন্ধ করে রেখেছে তাকে। রুমটা দেখে কয়েস সাহেব বেশ অবাক হলেন। সাধারনত কিডন্যাপ করে এনে এমন বিলাসবহুল  রুমে থাকতে দেয়া হয় না। সুন্দরভাবে সময় কাটানোর জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই আছে এতে। একটা বিছানা, তাতে ধবধবে সাদা একটা চাদর, একটা পড়ার টেবিল সাথে একটা চেয়ার, ছোট্ট একটা বুক শেল্ফ যাতে বেশ কিছু বই রাখা, আর রয়েছে দেয়ালে লাগানো বিশাল সাইজের স্মার্ট টিভি।

-তুমি আমাকে কেন ধরে এনেছো? আমাকে চিনতে পারছো না তুমি? আমি… আমি লেখক কয়েস সামী। ছেলেবুড়ো সবাই এক নামে চেনে আমাকে। তুমি আামাকে চিনতে পারছো না ছেলে? এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বললেন রওনক।

- Advertisement -

-স্যার, আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি বলেই এনেছি।

শ্রদ্ধা মেশানো গলায় বলল রাজীব।

-মানে কী? কী চাই তোমার?

-একটু সময় দেন স্যার, বলছি।

-দেখো ছেলে, কাজটা তুমি মোটেও ভালো করছো না। তুমি বুঝতে পারছো না এর পরিণতি কী হবে।

কয়েস সাহেব এবার উত্তেজিত।

-স্যার, আপনি এখন উত্তেজিত। এখন কথা বলার দরকার নাই। র‌্যাস্ট নেন। আমি পরে কথা বলব। দুপুরে লাঞ্চ পাঠিয়ে দেয়া হবে, খেয়ে নিয়েন। হিম শীতল কণ্ঠে কথাগুলি বলে রাজীব দরজায় তালা দিয়ে বাইরে চলে গেল।

কয়েস সামী খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। জীবনে এমন অবস্থায় কখনো পড়েননি। ছেলেটার মোটিফটাও ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। বাসার কথা খুব মনে পড়ছে তার। তার স্ত্রী নিশ্চয়ই চিন্তা করছে।

ঘুম থেকে উঠে বাজার করতে বেরিয়েছিলেন তিনি। প্রতি শুক্রবার তিনি নিজে বাজার করতে বের হন। তাও আবার হেটে হেটে যান। এতে মাস্ পিপলের সাথে এক ধরণের যোগাযোগ  হয়। লেখার থিম পেয়ে যান তিনি। আর সেই লেখার থিম খুঁজতে গিয়ে এমন ঝামেলায় পড়ে যাবেন,  ভবেননি কখনো। ছেলেটা নিশ্চয়ই এতক্ষনে আর্ট স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে। বাবা ফিরছেন না দেখে কী করবে সে? এয়ার কন্ডিশন্ড রুমে বসে তিনি ঘামতে থাকলেন।

২.

চোখ খুলে কয়েস সাহেব বুঝতে পারলেন না, দিন নাকি রাত। দুপুরে বেশ ভাল লাঞ্চ দেয়া হয়েছিল তাকে। মাগুড় মাছের ঝোল, পাবদা মাছ, শুটকি ভর্তা আর ভাত। কয়েস সাহেবের প্রিয় খাবার। তার কোনো এক বইয়ে লিখেছিলেন ব্যাপারটা। ছেলেটা মনে হয় পড়েছে।

ছেলেটা তার বই পড়ে বুঝতে পেরে খানিকটা স্বস্তি  পেয়েছেন । আর যাই করুক, তাকে নিশ্চয়ই মারবে না সে। তিনি হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন। সন্ধ্যা সাতটা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার ১০ ঘন্টা হয়ে গেল। রিমোট নিয়ে অন্যমনস্ক রওনক টিভিটা অন করলেন। চ্যানেল আইয়ের সংবাদ চলছে। এ যে দেখি তারই ছবি টিভিতে!

প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক আজ সকাল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। সকাল দশটার দিকে বাজার করতে বের হয়েছিলেন তিনি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি বাসায় ফিরেননি। তার মোবইলটাও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা কিছুক্ষন আগে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলেছিলাম। দেখুন তার ভিডিও ফুটেজ।-

টিভি স্ক্রিনে ভেসে আসল লেখকের বাসার ড্রয়িং রুম। একমাত্র ছেলেকে পাশে নিয়ে বসে আছে তার স্ত্রী। অনেকগুলো মাইক্রোফোন তার সামনে। কান্না কান্না গলায় সে বলছে, সকাল সকাল বেরিয়ে গেল লোকটি। বললাম, গাড়ি নিয়ে যাও। না করলো। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত কোথায় আছে কিছু জানতে পারলাম না। দিনে দুপুরে দিব্যি নাই হয়ে গেল লোকটা!… টিভি ক্যামেরা ঘুরে গেল চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টারের দিকে।

জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক কয়েস সামীকে পাওয়া না যাওয়ায় সারা দেশে উৎকণ্ঠার শুরু হয়েছে। গুলশান থানায় ইতোমধ্যে জিডি করা হয়েছে। এই মুহূর্তে খবরটা নিয়ে আমরা যাচ্ছি মাননীয় স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর কাছে।

স্বরাস্ট্রমন্ত্রির সামনে মাইক্রোফোন। আমরা ব্যাপারটা বেশ সিরিয়্যাসলি নিয়েছি। একজন কথা সাহিত্যিক গুম হয়েছেন এটাতো মেনে নেয় যেতে পারে না।

কোন আলটিমেটাম?

৪৮ দিনের? ঘিরে থাকা সাংবাদিকদের মধ্য থেকে প্রশ্ন ভেসে আসল।

এই স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আগেরজনের পথ ধরলেন না। না, কোন দিন তারিখ ক্ষণ মেপে বলা যাবে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে তৎপর হয়ে পড়েছে। আমরা ব্যাপারটা খতিয়ে দেখছি।

টিভি আবার স্টুডিওতে ফিরে এলো। কয়েস টিভি বন্ধ করে দিলেন। সারাজীবন অন্যের খবর নিয়ে গল্প উপন্যাস লিখেছেন আর আজ তিনি নিজেই খবর হয়ে গেলেন!  স্ত্রীর কান্না দেখে বুকের মধ্যে ব্যাথা শুরু হয়েছে!  তিনি আবার বালিশে মাথা রাখলেন।

৩.

-স্যার, তিনদিন হয়ে গেল। আপনার উত্তেজনা কি কমেছে?

-আমি আসলে বুঝতে পারছি না, তুমি কি চাও। টাকা চাও, টাকা? কত চাও বল।

-না, টাকা চাই না।

-কী চাও তবে? ষ্পষ্ট করে বলো।

-আমি চাই থ্রিলার।

-মানে কী? ঝেড়ে কাশো।

– ধীরে…ধীরে বলুন। উত্তেজিত হবেন না। আপনার আবার হার্টে প্রবলেম আছে। কিছু হয়ে গেলে ডাক্তার দেখাতে পারবো না।

-এত নাটকীয়তা কিসের তোমার? বলি, এত নাটকীয়তা কী? এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

– বলছি স্যার। পানি খাবেন? একটু পানি খেয়ে নেন। অবশ্য আমি আপনার কাছে যা চাইবো, সেটা আপনার জন্য খুব সহজ।

– আরে বাবা, সেটাই তো জানতে চাচ্ছি!

-আমি চাই আপনি আমাকে একটা থ্রিলার লিখে দেবেন। এখানে আপনাকে থাকতে হবে ঠিক ততদিন যতদিন না আপনি লেখাটা শেষ করবেন। থ্রিলার শেষ হলেই আমি ছেড়ে দেব আপনাকে।

কয়েস সাহেব অবাক হলেন। বলে কী ছেলেটা!

-থ্রিলার দিয়ে তুমি কী করবে?

-বলছি। থ্রিলারটা  লিখে আপনি ওটা আমাকে দিয়ে দিবেন। ওটা হয়ে যাবে আমার লেখা।

বিষ্ময় উপচে পড়ছে লেখকের চোখ দিয়ে।

-ওটা দিয়ে তুমি কী করবে?

-আমি ওটা আমার নামে প্রকাশ করবো।

– কিন্তু কেন? তোমার উদ্দেশ্য কী?

-আপনার লেখা খুব বিক্রি হয়। ছাতা-মাথা যাই লিখেন তাই দেখি বিক্রি হয় দেদারসে। আপনার শেষ লেখাটা আমি পড়েছি। প্রবেশ নিষেধ। নামটা মাসুদ রানা থেকে নিয়েছেন। চমৎকার নাম। পড়ার পর থ হয়ে বসেছিলাম অনেকক্ষন। শেষে যে অমন একটা টুইস্ট আসবে ভাবতেই পারিনি। আপনার একটা লেখা যদি আমার নামে ছাপাতে পারি, তবে আর চিন্তা নেই আমার।

-কেন? তোমার আবার কীসের  চিন্তা?

লেখক এবার কৌতুহলী হলেন।

-আমার অনেক টাকার দরকার। প্রতিদিন ড্রাগ না হলে চলে না আমার। প্রচুর টাকা লাগে। ছিনতাই করতে আর ভাল্লাগে না। সেদিন আমার বন্ধুটা ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। এখন সে পুলিশ কাস্টডিতে আছে। পুলিশ কাস্টডি আমি ভয় পাই না। পুলিশের কাছে ড্রাগ পাব না, সেটাই সমস্যা। ড্রাগ ছাড়া আমার একদম চলে না।

-তাই বলে তুমি আমার একটা লেখা নিজের বলে চালিয়ে দিতে চাও?

-হু। এটা নিশ্চিত একটা ইনকামের উপায়। আপনার শেষ বইটা দেখলাম ইতোমধ্যেই রকমারির বেস্ট সেলার তকমা পেয়ে গেছে। আপনার একটা বই যদি আমার নামে ছাপাতে পারি, তবে এটা একটা নিশ্চিত আর নিরাপদ ইনকামের উপায় হবে, নয় কি?

-ও আচ্ছা! এই বুদ্ধি!

কয়েস সাহেব চরম উত্তেজিত এবার।

– তা তোমার কী করে মনে হলো আমার স্বত্তা তোমার কাছে বিকিয়ে দেবো? লেখালেখি আমার কাছে কী, সেটা জানো? আমার আত্মা। আমার আত্মা!

চিৎকার করে উঠলেন কয়েস সাহেব।

-আমি জানি লেখালেখি আপনার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না যে, তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ আপনার জীবন।

-তুমি কি আমাকে খুন করার হুমকি দিচ্ছো?

-আপনি মানুষের মন নিয়ে খেলা করেন।  আর আমার কথা আপনি বুঝবেন না, তাই কি হয়? ঠিক ধরেছেন। আপনি যদি আমার প্রস্তাবে রাজী না হন, তবে আমি সেটাই করব। আর জানেন তো এদেশে খুনের কোনো শাস্তি হয় না। সাগর রুনি নিয়ে তো অনেক করলেন আপনারা। খুনীদের কিছু হয়েছে? যতদূর মনে পড়ে আপনিও তো পত্রিকায় এ নিয়ে একটা কলাম লিখেছিলেন।

-তুমি যুবক ভুল করছো। ভুল মানুষকে ধরে এনেছো। রওনক সাহেবের দৃঢ় উচ্চারণ।

-ঠিক আছে। তবে তৈরী হোন।

রাজীব পকেট থেকে ছোট্ট রিভলবারটা বের করলো।

-স্যার, আপনি আমার জন্য কাজটা কঠিন করে দিলেন। ছোটো বেলা থেকেই আপনার লেখা পড়ছি। আপনার এক বিরাট ফ্যান ছিলাম তখন। আপনাকে খুন করাটা আমার জন্য কিছুটা কষ্টের। তবু, উপায়,নেই।

রাজীব রিভলবারটা রওনক সাহেবের কপালে ঠেকালো।

কয়েস সাহেবের ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। এত স্মার্ট একটা ছেলে, পড়ুয়া একটা ছেলে তাকে খুন করবে। তবু বন্দুকের শীতল স্পর্শে তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।

-স্যার, স্যাকন্ড থট দেবেন? অনেক সময় স্যাকন্ড থট অনেক বিবেচনাপ্রসূত হয়। স্যার, আপনার ছেলের কথাটা একবার ভাবেন। পিচ্চি ছেলে। সে কি করে তার বাকিটা জীবন কাটাবে, একবার ভাবেন। আপনার স্ত্রী কি সারাজীবন তাকে আগলে রাখতে পারবে? আপনি মরলে কী হবে আপনার ছেলের?

কয়েস সাহেবের চোখে তার ছেলেটার নিষ্পাপ চেহারা ভেসে উঠলো। সেদিন টিভিতে তার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছিল ছেলেটা কতটা অসহায় হয়ে পড়েছে। সেই ছেলেটাকে নিজের লেখার জন্য এতিম করে দেবেন তিনি? ছেলে বড়ো, না লেখা বড়ো? নিশ্চয়ই ছেলে। আর কিছু ভাবলেন না তিনি। রাজী হয়ে গেলেন রাজীবের প্রস্তাবে।

৪.

কয়েস সাহেব লিখছেন। আর কোনো কাজ নাই। সারাদিন লেখা। কাহিনী নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, সংলাপ নির্বাচন- লেখায় এমন নিবিড় ভাবে মনোনিবেশ আর কখনোই করতে পারনেনি তিনি। লেখা তরতর করে এগিয়ে চলেছে। একটাই চিন্তা তাড়াতাড়ি লিখতে হবে। যত তাড়াতাড়ি শেষ করা যাবে লেখাটা, রওনক সাহেবের মুক্তি তত তাড়াতাড়ি হবে।

বন্দী অবস্থায় আজ সাতদিন হয়ে গেল। দিনে একবার রাজীব আসে। লেখার অগ্রগতী সম্পর্কে জানতে চায়। পাঁচ দশ মিনিট পর চলে যায়। আজ প্রথম আলো পত্রিকা নিয়ে এলো সে। বলল, স্যার, আপনাকে নিয়ে বাইরেতো তুলকালাম অবস্থা। আজ প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পড়ে দেখেন।

সম্পাদকীয় তাকে নিয়েই লেখা হয়েছে।

কয়েস সামী কোথায়?

অতি দ্রুত তাকে খুঁজে বের করা হোক

২০ এপ্রিল, ২০১২ ঠিক এমন একটি শিরোনাম দিয়ে আমরা একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। বারো বছর পর  আজ আবার একই শিরোনামে লিখতে হল বলে আমরা মর্মাহত। সেবার অন্য একজনের কথা বলেছিলাম, আর আজ বলছি কয়েস সামীর কথা। মানুষ দুজন দু’জগতের। একজন রাজনীতির জগতের। আরেকজন সাহিত্যের। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক কয়েস সামী বাংলাদেশের এক বিরল সম্পদ। মাত্র এক দশকে বাংলা সাহিত্যকে তিনি যেখানে নিয়ে গেছেন তাতে তার প্রতি আমরা চির কৃতজ্ঞ। তার কল্যানে বাংলাদেশের সাহিত্য আজ সারা বিশ্বে সমাদৃত। তার শেষ উপন্যাস প্রবেশ নিষেধ জায়গা করে নিয়েছে উইকিপিডিয়ার লিস্ট অব ব্যাস্ট সেলিং বুকস এ। অতি সম্প্রতি তিনি পেয়েছেন দ্যা ম্যান বুকার প্রাইজ যা আমাদের দেশের জন্য এক বিরল সম্মানের বিষয়। তার কাছ থেকে আমাদের পাবার আছে আরো অনেক কিছু। এমন একজন লেখক রাজধানীর রাস্তা থেকে দিনে দুপুরে উধাও হয়ে গেছেন- এ খবর উদ্বেগজনক। উদ্বেগ আরো বেড়ে যায় যখন আমরা দেখি বিষয়টিকে পলিটিসাইজ করা হচ্ছে ন্যাক্কারজনকভাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা অনাদিকাল থেকে এমন কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়ি দেখে আসছি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা এমন অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে এই গুম রহস্যের ত্বরিত সমাধান চাই।

সেই সঙ্গে এও বলা দরকার, বিক্ষোভ প্রতিবাদ শান্তিপূর্ন হওয়া বাঞ্জনীয়। কয়েস সামীর নিখোঁজ হওয়ার খবরে লেখক সমিতির সদস্যরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ও ঢাল কেড়ে নেওয়া সহ যে সহিংস আচরণ করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। অপরদিকে থ্রিলার পাঠকদের আসর নামের ফেসবুক পেজ আগামী সোমবার সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। ঘটনা যতই গুরুতর হোক, প্রতিবাদ বিক্ষোভের কারণও যতই যুক্তিসঙ্গত হোক, হরতালের মতো জনভোগান্তিমূলক ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর কর্মসূচি পরিহার করাই ভাল।

কয়েস সাহেব পত্রিকা বন্ধ করলেন। রবি ঠাকুর ঠিকই বলেছিলেন, সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি!

৫.

থ্রিলার লেখা শেষ। নামটিও কয়েস সাহেব দিয়েছেন। শঙ্খচিল। পান্ডুলিপিটা রাজীবের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বললেন, এই নাও। আমার জীবনের সেরা লেখা এটা। জানিনা আর চেষ্টা করেও এমন লেখা লিখতে পারবো কিনা! এবার আমাকে মুক্তি দাও।

রাজীব বলল, আপনি কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কাউকে এ ঘটনা বলবেন না। যদি বলেন তবে কিন্তু আপনার ছেলেকে হারাবেন। মনে রাখবেন, আমার সাথে আরো কয়েকজন আছে।

-না, বলবো না। তুমি নিশ্চিত থাকো। আমাকে যে আজ ছেড়ে দিচ্ছো, সেজন্য সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো তোমার প্রতি। তোমার ভদ্র ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার চিন্তা একটাই। খবরটা নিয়ে দেশে যা শুরু হয়েছে তাতে আমি ফিরে গিয়ে সবাইকে কী বলবো।

-বলে দেবেন লেখালেখির কাজে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। আপনারা লেখক মানুষ। আপনারা এরকম খামখেয়ালী হবেন, এটা সবাই জানে।

-হু, তাই বলতে হবে। দেখা যাক।

৬.

রাজীব বসে আছে অনুজ প্রকাশের তুষার সাহেবের সামনে। অনেক কষ্টে তার দেখা পেয়েছে রাজীব।

-আপনি নিজে পড়েছেন লেখাটা?

-হু, পড়েছি রাজীব সাহেব। ততোটা খারাপ হয় নাই। তবে পাবলিক খাওয়ার মতো হয় নাই। আরো লিখতে থাকুন। আপনার লেখার হাত ভালো। লেগে থাকলে ভালো করবেন।

-আপনি বলছেন, এ লেখা ছাপানো যাবে না?

-কতবার বলব রাজীব সাহেব? লেগে থাকেন। নিশ্চয়ই হবে।

রাজীব অনেক কষ্টে তার রাগ সামলাচ্ছে।

-আচ্ছা স্যার, আমার শেষ প্রশ্ন। এই লেখাটাই যদি কয়েস সামী এনে দিতেন তবে তো না পড়েই ছাপাখানায় পাঠিয়ে দিতেন, নয় কি?

-রাজীব, আপনি কার সাথে কার তুলনা করছেন? কয়েস সামী কখনোই এই মানের লেখা লিখতেন না। আমি এখন উঠবো। কয়েস সাহেবের বাসায় যেতে হবে। বাই। বলেই তুষার সাহেব তার চেয়ার ছাড়লেন।

হতবাক ও উত্তেজিত রাজীব রাগে গজগজ করতে করতে অনুজ থেকে বের হল। সে এ বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে তবেই ক্ষান্ত দেবে।

রাজীবের সামনে আরো বিষ্ময় অপেক্ষা করছিল। বড়ো বড়ো সব প্রকাশনী তো বটেই। ছোটো প্রকাশনীগুলোও তাকে ফিরিয়ে দিল। সবার এক মতামত, বইটা প্রকাশযোগ্য নয়। লেখককে আরো চেষ্টা করতে হবে।

রাজীব এবার অন্য পথ ধরলো। নিজ খরচে বই প্রকাশের ব্যবস্থা করলো। এজন্য তাকে অবশ্য ছিনতাইয়ের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দিতে হলো। বইটা প্রকাশ হলে তো সব টাকা সূদে আসলে ফেরত আসবে। যেনতেন লেখকের লেখা না বইটা।  বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সফলতম থ্রিলার লেখকের কলম নি:সৃত এই পান্ডুলিপি।

৭.

রাজীবকে নিজ বাসায় দেখতে পেয়ে কয়েস সাহেব অবাক। হাতে বড়ো একটি বস্তা। বস্তার ভেতরে কিছু একটা আছে! কারো ডেডবডি নয়তো? কয়েস  আতকে উঠলেন।

-কী ব্যাপার রাজীব! আবার কেন? আবার কী চাও? বস্তার ভেতর এটা কী?

-স্যার, মাপ করবেন আমায়। আপনার পান্ডুলিপিটা ফিরিয়ে দিতে এলাম। বস্তার ভেতরে আমার নামে প্রকাশিত বইগুলোও থাকলো। সব পুড়িয়ে ফেলবেন। একজন পাঠকও আমার বই  কিনেনি, পড়েনি। পান্ডুলিপিটা আপনি আপনার নামে প্রকাশ করুন। আমি বুঝতে পেরেছি লেখা কেউ কখনো চুরি করতে পারে না। করলেও তার কোনো লাভ হয় না। টাকা পয়সা ধন দৌলত কখনোই একজন লেখকের লেখার সমকক্ষ না।

কয়েস সামীর বিষ্ময়ের ঘোর কাটার আগেই রাজীব চলে গেলো। পেছনে পড়ে থাকল বস্তাভর্তি শঙ্খচিল!

000000000000000000000000

12

মায়া

আমরা দুজন কেউ কাউকে ভালোবাসিনা আর,

না পাওয়ার আক্ষেপ আর পোড়ায় না তেমন করে,

আমরা কেউ কাউকে আদরের নামে ডাকিনা আর,

আমাদের আর কোন কথা বাকী নেই;

চাওয়া পাওয়ার কোন আকুতি নেই;

তবুও কিছু একটা আছে,

তাই চাইলেও কেউ কাউকে ছেড়ে যাইনা।

তবুও নিয়ম করে প্রতিদিন ফোন করা হয় আমাদের,

কথা খুঁজে না পাওয়ার ছুতোয় ফোনের দীর্ঘ নীরাবতায়–

হঠাৎ ভারী শ্বাসপ্রশ্বাস কিংবা মৃদু আওয়াজ;

শুস্ক গলাটা একটু সামলে নেয়ার শব্দ,

তাও উপভোগ করি আমরা।

আমাদের কিছু একটা আছে,

তাই চাইলেও কেউ কাউকে ছেড়ে যাইনা।

- Advertisement -

Read More

Recent