প্রমত্তা ইয়াংজি নদীর থ্রী গর্জেস বাঁধ

কালজয়ী কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটক বা উপন্যাসে বেকার অলসরা বেশ গুরুত্ত্ব পেয়েছে

কালজয়ী কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটক বা উপন্যাসে বেকার অলসরা বেশ গুরুত্ত্ব পেয়েছে। তিনি পেশাজীবি চরিত্র এঁকেছেন কম। সেটিও উকিল সর্বস্ব। দু’একটা দুর্বল চরিত্রের ডাক্তার উপস্থাপন করেছেন। আর প্রকৌশলী প্রসঙ্গ তুলছেন অফিসের বস কিংবা কনে পক্ষের আত্মীয় হিসাবে।

মহান এই লেখক প্রকৌশলীদের চমকে দিলেন তিস্তা ব্যারেজ নাটক দিয়ে। আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারের ভূমিকায়। তুলির আঁচরে প্রকৌশলীদের দেশপ্রেম তুলে ধরলেন চারুকলার শিল্পীদের মতো করে। নির্মাণ শেষে ব্যারেজ থেকে পড়ে গিয়ে প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যু হয়। এ দৃশ্য তখন কাঁদিয়েছে অনেককে। সংস্কৃতি জগতের মানুষের কাছে প্রকৌশল একটি কাটখোট্টা এপ্রেসিয়েশন বিহীন পেশা। নাটকটি নিয়ে তাঁদের কোনো উঁহু আহা শুনিনি।

- Advertisement -

তিস্তা ব্যারেজের কাজ শেষ হয়েছে বেশ দেরী করে। ৭৯ সালে শুরু হওয়া ব্যারেজ সমাপ্ত হয় ৯৮ সালে। যদিও মূল ব্যারেজ শেষ হয় আগষ্ট, ১৯৯০ সালে। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী। বাংলাদেশ ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, দুদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন ইত্যাদি ঝামেলা পেরিয়ে ব্যারেজের সক্রিয় পরিচালনা শুরু হতে সময় লেগেছিলো। নব্বুইয়ের মাঝামাঝিতে এরশাদ সাহেবের গদি চূড়ান্ত নড়বড়ে। নড়বড়ে গদিতে বসে আন্তর্জাতিক নদী সামাল দেয়া মুশকিল। তিস্তা ব্যারেজের গল্পে হয়তো সেসব আলোচনা আসবে। এবার তিস্তা আদলে চীন দেশের এক শক্তিধর ব্যারেজের গল্প শোনা যাক।

ব্যারেজের পেছনের মানুষটিও চীনের ইতিহাসে সবচে শক্তিধর। …ঠিকই ধরেছেন। মাওসেতুং স্বয়ং এ ব্যারেজের কার্যকরী উদ্যোক্তা। ১৯২২ সালে ইয়াংজি নদী শাসনের ঘোষণা দিলেও একঘটি জলও কেউ আটকাতে পারেনি। যদিও ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বাঁধ কর্তৃপক্ষ ইউএস ব্যুরো অব রিক্ল্যামেশনসের চীফ ইঞ্জিনিয়ার জন এল স্যাভেজ ইয়াংজি নদী পরিদর্শন করেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি সার্ভেও হয়। তিনি ৫৪ জন চাইনিজ প্রকৌশলীকে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে ট্রেনিং করান।

আরো একযুগ পরে ১৯৫৩ সালে মাও সেতুং নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডির বাজেট বরাদ্দ দেন। সেই বছরেই শুরু হয় সমীক্ষা।

১৯৫৮ সালে দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্ট প্রকাশের পর কিছু প্রকৌশলী এর বিরোধীতায় নেমে পড়েন। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি কাজ স্থগিত, জেলেদের মাছ ধরা, স্থানীয় অধিবাসী উচ্ছেদ এসব কারণে তাঁরা বাঁধ নির্মাণ চাননি। এই অপরাধে মাও সেতুং তাঁদের সকলকে জেলে পুড়েন। গতি হারায় বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ। ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের তিরোধানের পর আবার ধাক্কা খায় ইয়াংজি শাসনের স্বপ্ন।

বাঁধ নির্মাণে কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ে। হাজার লক্ষ মানুষকে পিতৃভূমি হারাতে হয়। তাঁদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয় চৌকষ নেতৃত্ব। তানাহলে হয় ব্যাপক অনাচার। চীনের ইতিহাসে অত্যাচার অনাচারের অভাব নেই। এই বাঁধ নির্মাণেও রয়েছে নির্মম অত্যাচারের গল্প।

আনুমানিক দুই কোটির উপর মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে মাত্র সোয়া দুই কিলোমিটার বাঁধের জন্য। এতো ব্যাপক উচ্ছেদ সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো নির্মাণ ইতিহাসে নাই। ১৩টি বড় শহর, ১৪০টি মফস্বল শহর এবং ১৩৫০টি গ্রাম থেকে মানুষ সরিয়ে নেয়া হয়। বাঁধ হওয়ার পর আপস্ট্রিমে নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। প্লাবিত হয় এসব শহর এবং গ্রাম। সরকারী হিসাব অনুযায়ী ২০০৮ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।

ব্যাপক দুর্নীতিও হয়েছে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায়। এর ভেতর প্রমাণিত বা ভেরিফায়েড দুর্নীতির খবর হলো ১৩০০ হাজার কৃষকের পুনর্বাসনের টাকা উধাও হওয়া। সরকারী টাকা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর সে টাকার আর হদিশ মেলেনি। বাঁধ নির্মাণে প্রকৌশল ব্যয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ পেলেও প্রমাণ মেলেনি।

বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশ চীন। ব্যাক্তি ধনী হতে না পারলেও সামষ্টিক অর্থনীতি বিশাল। বড়লোকের বাড়িতে চুরি হলে হীরে জহরতই চুরি যায়। গরীবের বাড়িতে একখান কাঁসার থালা। ইনভেন্টরি হিসাবে কাঁসার থালার হিসাব বের করা যতো সহজ, হীরে জহরত তারচে শতগুন কঠিন। চীনের বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতির যেনো বিকল্প নেই। সেটি অবশ্য বাঁধের ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যা তৈরী করতে পারেনি। অতএব দুর্নীতির অংশ শিকেয় ঝোলানো থাকুক। বাঁধ নির্মাণের চ্যালেঞ্জটা দেখা যাক।

চীনের বৃহত্তম নদী ইয়াংজি। দৈর্ঘ্য ৬৩৮০ কিলোমিটার। বেসিন সাইজ অর্থাৎ জলজ আয়তন (গাণিতিক ক্ষেত্রফল) ১৮ লাখ ৮ হাজার ৫০০ বর্গ কিলোমিটার। যা বাংলাদেশের আয়তনের ১২ গুণ। স্রোতের গতি গড়ে ৫৮ সেমি/সেকেন্ড। ঘন্টায় দাঁড়ায় ২ কিলোমিটারের উপর। মাঝে মাঝে সেটি দ্বিগুন হয়ে যায়। এমন নদীতে বাঁধ দেয়া দুরন্ত ষাঁড়ের গলায় রশি বাঁধার মতোই বিপদজনক। তাও আবার স্রোতের বিপরীতে আড়াআড়ি বাঁধ।

নদী স্রোতের ভয়াবহতা, উচ্চতা, চাপ, খরচ ইত্যাদি বিবেচনায় আমেরিকান প্রকৌশলীরা আগেই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন মাটি নয়, কংক্রীটের বাঁধ হবে ইয়াংজিতে।

চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিক নির্মাণ শুরু হয়। তবে পূর্ণগতিতে কাজ চলে ১৯৯৪ সাল থেকে। ১৭ বছর ধরে চলতে থাকে বাঁধ নির্মাণ। সব মিলিয়ে হিসাব করলে ২৩ বছর। কেননা বাঁধের সাথে শিপ লিফটিংএর কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ২০১৫ সালে। যদিও বাঁধ খুলে দেয়া হয় ২০০৯ সালে।

সোয়া দুই কিলোমিটারের বেশি ১৮৫ মিটার উঁচু এ বাঁধের ফাউন্ডেশন বেশ গভীর। যে কারণে কংক্রীটের বাঁধ হওয়া সত্ত্বেও মাটি কাটতে হয়েছে প্রচুর। ১০৩ মিলিয়ন ঘনমিটার মাটি কাটতে হয়েছে। বাংলাদেশের ৫ টনের ট্রাক হিসাবে যার পরিমান প্রায় ২ কোটি ১৪ লাখ ট্রাক মাটি।

ভিত্তির কাছে এটি ১১৫ মিটার চওড়া। ধীরে ধীরে চিকন হয়ে উপরে উঠেছে। পানির উপর সারফেসে ৪০ মিটার চওড়া। এর পুরোটাই কংক্রীটৈর স্ট্রাকচার। নির্মাণে ২৭.২ মিলিয়ন ঘনমিটার বা প্রায় ৯৬ কোটি সিএফটি কংক্রীট ব্যবহার করা হয়েছে। ৪ লাখ ৬৩ হাজার টন রড রয়েছে এর ভেতর যা দিয়ে ৬৩টি আইফেল টাওয়ার বানানো যায়।

আপস্ট্রিম থেকে ডাউনস্ট্রিমে জলপতনে টারবাইন ঘুরে যে বিদ্যুত উৎপন্ন হয় তা এ মুহূর্তে বাঁধটিকে পৃথিবীর একক বৃহত্তম জলবিদ্যুত কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এর ক্ষমতা ২২,৫০০ মেগাওয়াট। ২০১৮ সালে সর্বমোট বার্ষিক উৎপাদন ছিলো ১০১.৬ টেরাওয়াট-আওয়ার যা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হুভার ড্যামের চেয়ে ২০ গুন বেশি।

এই যে এতো বড় ইয়াংজি নদীর উপর বাঁধ হয়েছে। পেছনে ছিলেন মাও সেতুং এবং পরবর্ত্তীতে আরো অনেক নেতা। কৌতুহল জাগে নদীর নামে কিংবা নেতাদের নামে বাঁধ হয়নি কেনো? থ্রী গর্জেস বাঁধ নামটা এলো কোথা থেকে? ব্যাপারটা খুবই সাধারণ এবং আইনজ্ঞদের ভাষায় নজির বিহীন। যে কোম্পানী এখানে বিদ্যুত উৎপাদন করছে এবং রাষ্ট্রের পক্ষে বাঁধের মালিকানা ভোগ করছে তার নাম ইয়াংজি পাওয়ার। ইয়াংজি পাওয়ার কোম্পানি চায়না থ্রী গর্জেস কর্পোরেশনের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। তাই এতোবড় বাঁধটার নাম কামিয়ে ফেললো সামান্য একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

পরিশেষে খরচের খাতাটা একটু দেখে নেয়া যাক। মাত্র ৩২ বিলিয়ন ইউএস ডলার। যার মাত্র অর্ধেকটা গিয়েছে নির্মাণে। বাকিটা পুনর্বাসন, বন সংরক্ষণ, ভর্ত্তুকী আর দুর্নীতি নামক রাঘববোয়ালের পেটে!!

 

টরন্টো, কানাডা।

- Advertisement -

Read More

Recent