আমার ভালোবাসার মূল্য—পর্ব ০২

এপার ওপারের এই গানটি গায়ক আজাদ রহমানকে জনপ্রিয়তা এনে দিলে তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে গাইতে থাকেন নানান রঙের নানান ঢঙের গান

এপার ওপারের এই গানটি গায়ক আজাদ রহমানকে জনপ্রিয়তা এনে দিলে তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে গাইতে থাকেন নানান রঙের নানান ঢঙের গান। দস্যু বনহুর ছবিতে আজাদ রহমানের গাওয়া ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়/বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়/মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায় মানুষকে কি দেখে চিনবে বলো’ লোকের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করলো। গুনাহগার ছবিতে গাইলেন ‘লোকে আমায় কয় গুনাগার’।

এটাও হিট। ডুমুরের ফুল ছবিতে গাইলেন অসাধারণ একটা গান, মাকে নিয়ে—‘করো মনে ভক্তি মায়ের থাকতে হাতে দিন/হয় না মুক্তি না শুধিলে মায়ের দুধের ঋণ/চিড়া বলো পিঠা বলো ভাতের সমান নয়/খালা বলো চাচি বলো মায়ের সমান নয়/মা হলো গর্ভধারিণী/সব দুঃখ হরণকারিনী/সেই মায়েরে না চেনে যে সে তো অর্বাচীন’।

- Advertisement -

আজাদ রহমান নিজে গাননি কিন্তু সুর করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের। স্মৃতি থেকে কয়েকটা চলচ্চিত্রের নাম এখানে উল্লেখ করি যেগুলোর সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান। তালিকাটা দীর্ঘ। আমি কয়েকটা বলি—পাগলা রাজা, অনন্ত প্রেম, মাসুদ রানা, যাদুর বাঁশী ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। পাগলা রাজায় রুনা লায়লার গাওয়া ‘বনে বনে যতো ফুল আছে/মাথায় মাথায় যতো চুল আছে/ততোদিন, ততোদিন বেঁচে থাকো রাজার কুমার’, মাসুদ রানায় রুনার গাওয়া ‘ও রানা ও সোনা, এই শোনো না/ মধুর এই রাতে আমি যে তোমারই হয়েছি দেখো না/কিছু আজ বুঝিনা হয়েছি দিওয়ানা’, যাদুর বাঁশীতে রুনার গাওয়া ‘আকাশ বিনা চাঁদ হাসিতে পারেনা/যাদু বিনা পাখি বাঁচিতে পারেনা/যাদু পাখি এক দুজনা/ওরে যাদু তোরে ছাড়া জীবনে কিছুই চাহিনা’, অনন্ত প্রেমে সাবিনা ইয়াসমিন এবং খুরশিদ আলমের ডুয়েটে ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি/তুমি হলে মনের রানী/তোমার দৃষ্টি যেনো ছোবল হানে/ যখন তখন শুধু আমার প্রাণেতে হয়ে কালনাগিনী’ গানগুলো আমাকে কী বিপুল আনন্দই না দিয়েছিলো! অনন্ত প্রেমে তিনি অসাধারণ একটি ধ্রুপদী গান নির্মাণ করেছিলেন ‘যুগে যুগে প্রেম আসে জীবনে’।

গহীন বনের ভেতরে রাজ্জাক-ববিতার গোপন বসবাসের দিনলিপি হিশেবে চমৎকার চিত্রায়ণের সঙ্গে ব্যাকগ্রাউণ্ডে বাজছিলো গানটি। অসাধারণ এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সম্ভবত ওস্তাদ আখতার সাদমানী এবং সঙ্গে আরেকটি নারীকণ্ঠ। নাম ভুলে গেছি, স্মৃতি ঠিকমতো কাজ করছে না।

আমাদের চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিশেবে আজাদ রহমানকে আমরা প্রথম পেয়েছিলাম ষাটের দশকের মাঝামাঝি কিংবা শেষান্তে ‘আগন্তুক’ নামের একটি চলচ্চিত্রে। অনেকগুলো শ্রুতিনন্দন গান উপহার দিয়েছিলেন তিনি এই চলচ্চিত্রে। আগন্তুক ছবিতে খুরশিদ আলম নামের একজন নতুন কণ্ঠশিল্পীকে ব্রেক দিয়েছিলেন তিনি। এবং প্রথম গানেই শ্রোতাদের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন খুরশিদ আলম। খুরশিদের কণ্ঠে ‘বন্দী পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে/মুক্ত আকাশখানি কে আমার নিলো কেড়ে/ ও পাহাড় ও নদী বলে দাও কি নিয়ে থাকি/ এ ব্যথা কি দিয়ে ঢেকে রাখি/স্বর্ণ ঈগল মন আমার অসীম আকাশে ওড়ে না আর/ডানা তার ভেঙে গেছে ঝড়ে আঘাতে জানোনা কি?’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। তখন ছিলো রেডিওর যুগ। রেডিওতে নিয়মিত বাজতো এই গানটা। এই গানের মাধ্যমেই খুরশিদ আলম বিশেষ করে নায়ক রাজ্জাকের লিপের অপরিহার্য কণ্ঠ হিশেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিলেন চলচ্চিত্রে। এবং দাপটের সঙ্গে তুঙ্গে অবস্থান করেছেন দশকের পর দশক। ফিল্মী গানের ময়দানে এন্ড্রু কিশোরের আগমনের পর খুব দ্রুতই অস্ত গিয়েছিলো খুরশিদ আলমের একক আধিপত্য ও জনপ্রিয়তার সূর্যটা।

এপার ওপারের ভালোবাসার মূল্য কতো গানটিই আমাকে আজাদ রহমানের মূল্য বুঝতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলো। এই গানটিই আজাদ রহমানের ব্যাপারে আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিলো। আমাদের চলচ্চিত্রের গান এবং আবহসঙ্গীত আধুনিক হয়ে উঠেছে একজন আজাদ রহমানের মেধা আর মননের সমন্বয়ে। সময়ের সঙ্গে ঐতিহ্যের নবায়নই আধুনিকতা। আজাদ রহমান সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় ধারাকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন নিপূণ দক্ষতায়। আর তাই আমরা দেখেছি সুরস্রষ্টা আজাদ রহমানের গানে পুরনো ও নতুন যন্ত্রানুষঙ্গের অপরূপ মিথস্ক্রিয়া। হারমোনিয়ম তবলা বাঁশী ও সেতারের সঙ্গে গীটার কীবোর্ড পারকেশন পিয়ানোর অপূর্ব মেলবন্ধনে আজাদ রহমান নির্মাণ করেছেন সুর ও ছন্দের মোহনীয় অর্কেস্ট্রার অভূতপূর্ব সিম্ফনি। ইলেকট্রনিক এবং একুইস্টিকের যৌথ মূর্ছনায় আজাদ রহমান আমাদের নিয়ে গেছেন অনির্বচনীয় এক আনন্দ-বেদনার ভুবনে।

দীর্ঘকাল তিনি বাংলা খেয়াল নিয়ে গবেষণা করেছেন নিবিষ্ট চিত্ত্বে।

- Advertisement -

Read More

Recent