”গণতন্ত্র মুক্তি পাক/ স্বৈরাচার নীপাত যাক”

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিলো অবরোধ দিবস

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিলো অবরোধ দিবস। সারা দেশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলো ঢাকায়।মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো সেদিন ঢাকা নগরী।গুলিস্তান-বংগবন্ধু এভিনিউ-বায়তুল মোকারম এলাকায় জনতার ভিড়ে, সমস্ত জনতাকে ছাপিয়ে বারবার একটি মুখই উদয় হচ্ছিলো। আর সেটি নূর হোসেনের।খালি গা। জিন্সের ট্রাউজার পরনে।বুকে পিঠে স্লোগান লেখা—স্বৈরাচার নীপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক।সে ছুটছিলো এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে।থামছিলো না সে খানিকক্ষণের জন্যেও।ডিউটিরত পুলিশদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হচ্ছিলো তার কর্মকান্ডে।এক পর্যায়ে সেই পথ দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি যাচ্ছিলো।যুবকটিকে দেখে গাড়ি থামিয়ে তিনি তাকে ডাকলেন। বললেন,শিগগির জামা গায়ে দাও, পুলিশ তো তোমাকে গুলি করবে।উদোম-উদ্দাম বুকে পিঠে স্লোগান লেখা সেই যুবক তার প্রিয় নেত্রিকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। তারপর স্লোগান দিতে দিতে হারিয়ে গেলো জনতার ভেতরে।এর কিছুক্ষণ পরেই গুলির শব্দ।বায়তুল মোকারম গেইটের কাছে পুলিশের গুলিতে ঢলে পড়লো সেই যুবক।জনতা কিছুটা ছত্রভংগ।এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পুনরায় সংগঠিত।আবারো গুলির শব্দ।

নূর হোসেনের লাশ ছিনিয়ে নিয়েছিলো পুলিশ। মিছিলের সহযোদ্ধা ক্লাশ নাইনের সুমন এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলো,–‘আমি দেখলাম বায়তুল মোকাররমের গেইটের কাছেনূর হোসেন পড়ে গেলেন। দৌঁড়ে গিয়ে তাকে ধরলাম।এই জায়গায় আরেকজন শহীদ হয়েছেন। শহীদ বাবুল। নূর হোসেনের গুলি লেগেছে পেটের ডানপাশে। বাবুলের গুলি লাগে কোমরের নিচে।আমি নূর হোসেনের গুলি লাগা জায়গা চেপে ধরলাম। আশপাশে কয়েজন রিকশা ডেকে আনে। আমি তাকে কোলে নিয়ে রিকশায় বসি। নূর হোসেন বললেন, আমার কিছু অয় নাই। তবে এরশাদরে যাইতেই হইবো।নূর হোসেন বিড়বিড় করে আরো কী যেনো বললেন। তার খুব কষ্ট হচ্ছিলো……তার শরীর থেকে বেরুনো রক্তে আমার কাপড় ভিজে যাচ্ছিলো।…মনে হচ্ছিলো তিনি যেনো একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন।আমার কান্না পাচ্ছিলো।রিকশাঅলা তাড়াতাড়ি চালাতে চাচ্ছিলো। রিকশা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে আসতেই পুলিশের কয়েকটা গাড়ি রিকশা ঘিরে ফেলে।নূর হোসেন তখন বিড়বিড় করে কথা বলছে।একজন পুলিশ আমার শার্টের কলার চেপে ধরে গালি দিলো। আমাকে বললো রিকশা থেকে নেমে যেতে। আমি বললাম—ও মইরা যাইব, হাসপাতালে নিতে দ্যান।পুলিশ আমাকে টেনে রিকশা থেকে নামিয়ে বন্দুকের বাট দিয়ে পিঠে বাড়ি দেয়। নূর হোসেন মাটিতে পড়ে গিয়ে গোঙ্গাতে থাকে।একজন পুলিশ তাকে দুই পা ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়।পুলিশ ধম্‌কে আমাকে সরিয়ে দেয়।’

- Advertisement -

এরপর নূর হোসেনকে আর পাওয়া যায় নি। নূর হোসেনের লাশ তার গরিব বাবা মাকে একটিবার দেখতেও দেয়া হয় নি। গোপনে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে তাকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।জীবন্ত নূর হোসেনকে স্বৈরাচার এরশাদ যতোটা ভয় পেয়েছিলো তার চে বেশি ভয় পেয়েছিলো তাঁর লাশকে। আর তাই দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো তাঁর সমাধিকে।কিন্তু এরশাদ জানতো না—এ লাশ মাটির তলায় থাকবে না।জেগে উঠবেই।এরশাদ কি জানতো যে নূর হোসেনরা কখনো মরে না?নূর হোসেনরা চলে যাবার আগে বলে যায়—‘আমরা সহস্র হবো অজস্র মৃত্যুতে’।

নূর হোসেনের মা বলেছিলেন, ‘কত থানায় গিয়া তার বাপে কান্নাকাটি করছে, পোলার লাশ দেখতে চাইছে। কেউ তার কথা শোনে নাই।সে যে শহীদ হইছে এইটা পরথম জানবার পারি পেপারে ফটো দেখার পর। রাইতে বিবিসির খবরে তার কথা কয়। আমার অবস্থা তো তখন বুঝেন। হায় হায় কইরা বুক চাপড়াইলাম। কিন্তু কেউ লাশটার খোঁজ দিলো না। আমি নামাজ পইড়া আল্লার কাছে কইলাম, যে জালিম আমার পোলার লাশ পর্যন্ত দেখতে দিলো না, তার উপর য্যান গজব নাজিল হয়।’

পুরান ঢাকার ছেলে আমি।থাকতাম হেয়ার স্ট্রিট,ওয়ারিতে।আমাদের বাড়ির খুব কাছেই ছিলো বনগ্রাম রোড। ওখানে একটা বস্তির মতো ঘুঁপচি গলিতে থাকতো সময়ের সাহসী সন্তান নূর হোসেন। স্বৈরাচারী হো মো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অমর শহীদ নূর হোসেন।নূর হোসেন বেঁচে থাকতে তাঁকে আমরা এলাকায় আলাদা করে কেউ-ই চিনতাম না।চিনেছি তাঁর মৃত্যুর পর।আমি নিজেও তাঁদের বাড়িতে গিয়েছি এরশাদের পতনের পর, বিটিভির ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে।তাঁর বাবা আর ছোট বোনের সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম।কিন্তু হোমোর পতনের আগে,১৯৮৭ সালের ১০নভেম্বর নূর হোসেনের আত্মত্যাগের পর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন, ৮৭-র নভেম্বরের শেষান্তে, একটা সংকলন করেছিলাম আমরা কয়েকজন। সংকলনটির নাম ছিলো ডিগবাজি জেনারেল।ওটার প্রচ্ছদে ছিলো বুকে পিঠে স্লোগান লেখা শহীদ নূর হোসেনের সেই বিখ্যাত ছবিটি।সংকলনটির মূল সংগঠক ছিলেন আবদুল আজিজ। খেলাঘর এর এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক।সম্পাদক হিশেবে নাম গিয়েছে সিরাজুল ফরিদের।প্রচ্ছদের জন্যে ছবিটা আমি এনেছিলাম আলোকচিত্রি পাভেল রহমানের কাছ থেকে।ছবিটা নিয়ে সেই সংকলনের জন্যে বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র নামে একটি তাতক্ষণিক ছড়া রচনা করেছিলাম।নিউজপ্রিন্টের প্যাডে।একটাকা দামের বলপেনে।পুরান ঢাকার একটি নড়বড়ে চায়ের দোকানে বসে। তখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিদিন ‘হটাও এরশাদ বাঁচাও দেশ’ ব্যানার ঝুলিয়ে আমরা প্রতিবাদী অনুষ্ঠান করি। খুব দ্রুততার সঙ্গে সকল কার্য সম্পাদিত হলো।একদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হলো ডিগবাজি জেনারেল।বিকেলে শহীদ মিনারের সামনে ঢাকা মেডিকেলের গেইটের কাছে রিকশা থেকে নামতেই শুনি সৈয়দ হাসান ইমামের ভরাট কন্ঠের আবৃত্তি—বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র, লিখেছেন লুৎফর………।

শহীদ মিনার থেকে বেশ খানিকটা দূরে,সমবেত প্রতিবাদী জনতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমিও শুনলাম আমার সদ্য লিখিত ছড়াটি। পাবলিক আমাকে চিনতে পেরে বিপুল ভাবে অভিনন্দিত করলো। তখন সময়টাই এমন ছিলো যে আমরা গণতন্ত্রকামী স্বৈরশাসন থেকে মুক্তিকামী মানুষগুলো এক গভীর আত্মীয়তার বন্ধনে যেনো বা বাধা পড়েছিলাম।আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না কিন্তু সবাই সবাইকে চিনতাম।

সাতাশির ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কোনো এক হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে এলাকার সমাজকর্মী নগর আওয়ামী লীগের নেতা সালাহউদ্দিন বাদল এসে কড়া নাড়লেন।ঘুম ঘুম চোখে দরোজা খুলে দাঁড়াতেই তিনি বললেন

—তোমার সঙ্গে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন।

–কে এসেছেন?

–শহীদ নূর হোসেনের বাবা।

–আরে!কোথায় তিনি?

–অই তো স্কুটারে বসে আছেন।

ছূটে গেলাম তাঁর কাছে। কাঁচাপাকা দাড়ির এক বৃদ্ধ বসে আছেন চালকের আসনে।আরেকটু এগিয়ে গেলাম। বাদল ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার সঙ্গে—চাচা, এই যে এর নামই রিটন, আপনার ছেলেরে নিয়া কবিতাটা যে ল্যাখছে।

নূর হোসেনের বৃদ্ধ পিতার কোলের ওপর আমি সেই সংকলনটি দেখতে পেলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি আমার ছড়ার সঙ্গে ছাপা নূর হোসেনের ছবির ওপর স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।ঠিক সেই মুহূর্তে আমার কিছু বলা উচিত। কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু তাকিয়ে থাকলাম সেই বৃদ্ধের দিকে।ঠোঁট কাঁপছে তাঁর। চোখ দুটো ভরে গেছে অশ্রুতে। তাঁর কাঁপা কাঁপা একটি হাত উঠে এলো আমার মাথায়। আমি মাথাটা তাঁর দিকে সামান্য নমিত করলাম।কিছুক্ষণ নিরব আশীর্বাদ করে হাতটা নেমে গেলো।হাতটা নামার সময় তাঁর অস্পষ্ট কান্নামিশ্রিত কন্ঠস্বরটি শুনতে পেলাম……বাজান!বাজান!

কাকে ডাকলেন তিনি ওভাবে? আমাকে ডাকলেন তিনি বাজান বলে? নাকি নূর হোসেনকেই বলতে চাইলেন কিছু?

আমি জানি না। আমার জানা হয় নি।

আজ শহীদ নূর হোসেন দিবসে তাঁকে স্মরণ করে পাঠক-বন্ধুদের জন্যে তুলে দিচ্ছি আমার সেই ছড়াটি–

বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র

লুৎফর রহমান রিটন

বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র পিচঢালা পথ লাল

দশই নভেম্বর সকালে শহর উন্মাতাল।

আকাশ বাতাস প্রকম্পিত স্লোগানে স্লোগানে

বিশাল জনস্রোত বয়ে যায় সামনে বাঁয়ে ডানে।

কিন্তু মিছিল যায় না হটে যায় না পেছন দিকে

টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় আকাশ হোক না যতোই ফিকে।

মিছিল মিছিল জঙ্গি মিছিল পরোয়া নেই কারো

যতোই ওরা হিংস্র হবে বাড়বে মিছিল আরো।

বায়ান্নো সাল ঊনসত্তুর এবং একাত্তুরে

কেউ পারেনি রুখতে মিছিল তপ্ত বুলেট ছুঁড়ে।

অবরোধের ডাকে পথে লোক করে গিজগিজ

মিছিলকারী লোকগুলো সব কী ভয়ানক চিজ—

যতোই ছোঁড়েন টিয়ার গ্যাস আর যতোই ছোঁড়েন গুলি

বুক হয়ে যাক ঝাঁঝরা এবং যাক উড়ে যাক খু্লি,

তবুও ওরা এগিয়ে যাবেই এগিয়ে সমুখ পানে

স্বৈরাচারকে রোখার কায়দা মিছিলকারী জানে।

বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র পিচঢালা পথ লাল

দশই নভেম্বর সকালে শহর উন্মাতাল।

ঢাকা শহর মুখর হলো ক্ষুব্ধ জনগণে

বিরাট মিছিল এগিয়ে এলো পুরানা পল্টনে।

উঠলো কেঁপে জিপিও মোড়, জিরো পয়েন্ট জিরো

উদোম গায়ে এগিয়ে এলো দুরন্ত এক হিরো!

কে এই ছেলে? এই ছেলে কে? নাম তো জানা নাই!

আর কেউ নয় আসাদ এবং মতিউরের ভাই।

বুকে পিঠে স্লোগান লেখা জীবন্ত পোস্টার

এমনতরো কান্ড দেখে অবাক স্বৈরাচার!

দিনদুপুরে গণতন্ত্র হুমড়ি খেয়ে পড়ে

জীবন্ত পোস্টারের ছবি পাভেল তুলে ধরে।

বন্ধু আমার, সাথী আমার, নূর, সাহসী বীর

গণতন্ত্রের প্রতীক তুমি, উঁচু তোমার শির।

অবরোধের আন্দোলনে বিলিয়ে দিলে প্রাণ

গণতন্ত্র মুক্তি পেলে গাইবো তোমার গান।

দিনদুপুরে গণতন্ত্র হুমড়ি খেয়ে পড়ে

জীবন্ত পোস্টারের ছবি পাভেল তুলে ধরে।

বন্ধু আমার, সাথী আমার, নূর, সাহসী বীর

গণতন্ত্রের প্রতীক তুমি, উঁচু তোমার শির।

অবরোধের আন্দোলনে বিলিয়ে দিলে প্রাণ

গণতন্ত্র মুক্তি পেলে গাইবো তোমা”গণতন্ত্র মুক্তি পাক/ স্বৈরাচার নীপাত যাক”

লুৎফর রহমান রিটন

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিলো অবরোধ দিবস। সারা দেশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলো ঢাকায়।মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো সেদিন ঢাকা নগরী।গুলিস্তান-বংগবন্ধু এভিনিউ-বায়তুল মোকারম এলাকায় জনতার ভিড়ে, সমস্ত জনতাকে ছাপিয়ে বারবার একটি মুখই উদয় হচ্ছিলো। আর সেটি নূর হোসেনের।খালি গা। জিন্সের ট্রাউজার পরনে।বুকে পিঠে স্লোগান লেখা—স্বৈরাচার নীপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক।সে ছুটছিলো এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে।থামছিলো না সে খানিকক্ষণের জন্যেও।ডিউটিরত পুলিশদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হচ্ছিলো তার কর্মকান্ডে।এক পর্যায়ে সেই পথ দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি যাচ্ছিলো।যুবকটিকে দেখে গাড়ি থামিয়ে তিনি তাকে ডাকলেন। বললেন,শিগগির জামা গায়ে দাও, পুলিশ তো তোমাকে গুলি করবে।উদোম-উদ্দাম বুকে পিঠে স্লোগান লেখা সেই যুবক তার প্রিয় নেত্রিকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। তারপর স্লোগান দিতে দিতে হারিয়ে গেলো জনতার ভেতরে।এর কিছুক্ষণ পরেই গুলির শব্দ।বায়তুল মোকারম গেইটের কাছে পুলিশের গুলিতে ঢলে পড়লো সেই যুবক।জনতা কিছুটা ছত্রভংগ।এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পুনরায় সংগঠিত।আবারো গুলির শব্দ।

নূর হোসেনের লাশ ছিনিয়ে নিয়েছিলো পুলিশ। মিছিলের সহযোদ্ধা ক্লাশ নাইনের সুমন এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলো,–‘আমি দেখলাম বায়তুল মোকাররমের গেইটের কাছেনূর হোসেন পড়ে গেলেন। দৌঁড়ে গিয়ে তাকে ধরলাম।এই জায়গায় আরেকজন শহীদ হয়েছেন। শহীদ বাবুল। নূর হোসেনের গুলি লেগেছে পেটের ডানপাশে। বাবুলের গুলি লাগে কোমরের নিচে।আমি নূর হোসেনের গুলি লাগা জায়গা চেপে ধরলাম। আশপাশে কয়েজন রিকশা ডেকে আনে। আমি তাকে কোলে নিয়ে রিকশায় বসি। নূর হোসেন বললেন, আমার কিছু অয় নাই। তবে এরশাদরে যাইতেই হইবো।নূর হোসেন বিড়বিড় করে আরো কী যেনো বললেন। তার খুব কষ্ট হচ্ছিলো……তার শরীর থেকে বেরুনো রক্তে আমার কাপড় ভিজে যাচ্ছিলো।…মনে হচ্ছিলো তিনি যেনো একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন।আমার কান্না পাচ্ছিলো।রিকশাঅলা তাড়াতাড়ি চালাতে চাচ্ছিলো। রিকশা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে আসতেই পুলিশের কয়েকটা গাড়ি রিকশা ঘিরে ফেলে।নূর হোসেন তখন বিড়বিড় করে কথা বলছে।একজন পুলিশ আমার শার্টের কলার চেপে ধরে গালি দিলো। আমাকে বললো রিকশা থেকে নেমে যেতে। আমি বললাম—ও মইরা যাইব, হাসপাতালে নিতে দ্যান।পুলিশ আমাকে টেনে রিকশা থেকে নামিয়ে বন্দুকের বাট দিয়ে পিঠে বাড়ি দেয়। নূর হোসেন মাটিতে পড়ে গিয়ে গোঙ্গাতে থাকে।একজন পুলিশ তাকে দুই পা ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়।পুলিশ ধম্‌কে আমাকে সরিয়ে দেয়।’

এরপর নূর হোসেনকে আর পাওয়া যায় নি। নূর হোসেনের লাশ তার গরিব বাবা মাকে একটিবার দেখতেও দেয়া হয় নি। গোপনে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে তাকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।জীবন্ত নূর হোসেনকে স্বৈরাচার এরশাদ যতোটা ভয় পেয়েছিলো তার চে বেশি ভয় পেয়েছিলো তাঁর লাশকে। আর তাই দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো তাঁর সমাধিকে।কিন্তু এরশাদ জানতো না—এ লাশ মাটির তলায় থাকবে না।জেগে উঠবেই।এরশাদ কি জানতো যে নূর হোসেনরা কখনো মরে না?নূর হোসেনরা চলে যাবার আগে বলে যায়—‘আমরা সহস্র হবো অজস্র মৃত্যুতে’।

নূর হোসেনের মা বলেছিলেন, ‘কত থানায় গিয়া তার বাপে কান্নাকাটি করছে, পোলার লাশ দেখতে চাইছে। কেউ তার কথা শোনে নাই।সে যে শহীদ হইছে এইটা পরথম জানবার পারি পেপারে ফটো দেখার পর। রাইতে বিবিসির খবরে তার কথা কয়। আমার অবস্থা তো তখন বুঝেন। হায় হায় কইরা বুক চাপড়াইলাম। কিন্তু কেউ লাশটার খোঁজ দিলো না। আমি নামাজ পইড়া আল্লার কাছে কইলাম, যে জালিম আমার পোলার লাশ পর্যন্ত দেখতে দিলো না, তার উপর য্যান গজব নাজিল হয়।’

পুরান ঢাকার ছেলে আমি।থাকতাম হেয়ার স্ট্রিট,ওয়ারিতে।আমাদের বাড়ির খুব কাছেই ছিলো বনগ্রাম রোড। ওখানে একটা বস্তির মতো ঘুঁপচি গলিতে থাকতো সময়ের সাহসী সন্তান নূর হোসেন। স্বৈরাচারী হো মো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অমর শহীদ নূর হোসেন।নূর হোসেন বেঁচে থাকতে তাঁকে আমরা এলাকায় আলাদা করে কেউ-ই চিনতাম না।চিনেছি তাঁর মৃত্যুর পর।আমি নিজেও তাঁদের বাড়িতে গিয়েছি এরশাদের পতনের পর, বিটিভির ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে।তাঁর বাবা আর ছোট বোনের সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম।কিন্তু হোমোর পতনের আগে,১৯৮৭ সালের ১০নভেম্বর নূর হোসেনের আত্মত্যাগের পর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন, ৮৭-র নভেম্বরের শেষান্তে, একটা সংকলন করেছিলাম আমরা কয়েকজন। সংকলনটির নাম ছিলো ডিগবাজি জেনারেল।ওটার প্রচ্ছদে ছিলো বুকে পিঠে স্লোগান লেখা শহীদ নূর হোসেনের সেই বিখ্যাত ছবিটি।সংকলনটির মূল সংগঠক ছিলেন আবদুল আজিজ। খেলাঘর এর এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক।সম্পাদক হিশেবে নাম গিয়েছে সিরাজুল ফরিদের।প্রচ্ছদের জন্যে ছবিটা আমি এনেছিলাম আলোকচিত্রি পাভেল রহমানের কাছ থেকে।ছবিটা নিয়ে সেই সংকলনের জন্যে বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র নামে একটি তাতক্ষণিক ছড়া রচনা করেছিলাম।নিউজপ্রিন্টের প্যাডে।একটাকা দামের বলপেনে।পুরান ঢাকার একটি নড়বড়ে চায়ের দোকানে বসে। তখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিদিন ‘হটাও এরশাদ বাঁচাও দেশ’ ব্যানার ঝুলিয়ে আমরা প্রতিবাদী অনুষ্ঠান করি। খুব দ্রুততার সঙ্গে সকল কার্য সম্পাদিত হলো।একদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হলো ডিগবাজি জেনারেল।বিকেলে শহীদ মিনারের সামনে ঢাকা মেডিকেলের গেইটের কাছে রিকশা থেকে নামতেই শুনি সৈয়দ হাসান ইমামের ভরাট কন্ঠের আবৃত্তি—বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র, লিখেছেন লুৎফর………।

শহীদ মিনার থেকে বেশ খানিকটা দূরে,সমবেত প্রতিবাদী জনতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমিও শুনলাম আমার সদ্য লিখিত ছড়াটি। পাবলিক আমাকে চিনতে পেরে বিপুল ভাবে অভিনন্দিত করলো। তখন সময়টাই এমন ছিলো যে আমরা গণতন্ত্রকামী স্বৈরশাসন থেকে মুক্তিকামী মানুষগুলো এক গভীর আত্মীয়তার বন্ধনে যেনো বা বাধা পড়েছিলাম।আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না কিন্তু সবাই সবাইকে চিনতাম।

সাতাশির ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কোনো এক হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে এলাকার সমাজকর্মী নগর আওয়ামী লীগের নেতা সালাহউদ্দিন বাদল এসে কড়া নাড়লেন।ঘুম ঘুম চোখে দরোজা খুলে দাঁড়াতেই তিনি বললেন

—তোমার সঙ্গে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন।

–কে এসেছেন?

–শহীদ নূর হোসেনের বাবা।

–আরে!কোথায় তিনি?

–অই তো স্কুটারে বসে আছেন।

ছূটে গেলাম তাঁর কাছে। কাঁচাপাকা দাড়ির এক বৃদ্ধ বসে আছেন চালকের আসনে।আরেকটু এগিয়ে গেলাম। বাদল ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার সঙ্গে—চাচা, এই যে এর নামই রিটন, আপনার ছেলেরে নিয়া কবিতাটা যে ল্যাখছে।

নূর হোসেনের বৃদ্ধ পিতার কোলের ওপর আমি সেই সংকলনটি দেখতে পেলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি আমার ছড়ার সঙ্গে ছাপা নূর হোসেনের ছবির ওপর স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।ঠিক সেই মুহূর্তে আমার কিছু বলা উচিত। কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু তাকিয়ে থাকলাম সেই বৃদ্ধের দিকে।ঠোঁট কাঁপছে তাঁর। চোখ দুটো ভরে গেছে অশ্রুতে। তাঁর কাঁপা কাঁপা একটি হাত উঠে এলো আমার মাথায়। আমি মাথাটা তাঁর দিকে সামান্য নমিত করলাম।কিছুক্ষণ নিরব আশীর্বাদ করে হাতটা নেমে গেলো।হাতটা নামার সময় তাঁর অস্পষ্ট কান্নামিশ্রিত কন্ঠস্বরটি শুনতে পেলাম……বাজান!বাজান!

কাকে ডাকলেন তিনি ওভাবে? আমাকে ডাকলেন তিনি বাজান বলে? নাকি নূর হোসেনকেই বলতে চাইলেন কিছু?

আমি জানি না। আমার জানা হয় নি।

আজ শহীদ নূর হোসেন দিবসে তাঁকে স্মরণ করে পাঠক-বন্ধুদের জন্যে তুলে দিচ্ছি আমার সেই ছড়াটি–

বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র

লুৎফর রহমান রিটন

বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র পিচঢালা পথ লাল

দশই নভেম্বর সকালে শহর উন্মাতাল।

আকাশ বাতাস প্রকম্পিত স্লোগানে স্লোগানে

বিশাল জনস্রোত বয়ে যায় সামনে বাঁয়ে ডানে।

কিন্তু মিছিল যায় না হটে যায় না পেছন দিকে

টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় আকাশ হোক না যতোই ফিকে।

মিছিল মিছিল জঙ্গি মিছিল পরোয়া নেই কারো

যতোই ওরা হিংস্র হবে বাড়বে মিছিল আরো।

বায়ান্নো সাল ঊনসত্তুর এবং একাত্তুরে

কেউ পারেনি রুখতে মিছিল তপ্ত বুলেট ছুঁড়ে।

অবরোধের ডাকে পথে লোক করে গিজগিজ

মিছিলকারী লোকগুলো সব কী ভয়ানক চিজ—

যতোই ছোঁড়েন টিয়ার গ্যাস আর যতোই ছোঁড়েন গুলি

বুক হয়ে যাক ঝাঁঝরা এবং যাক উড়ে যাক খু্লি,

তবুও ওরা এগিয়ে যাবেই এগিয়ে সমুখ পানে

স্বৈরাচারকে রোখার কায়দা মিছিলকারী জানে।

বুলেটবিদ্ধ গণতন্ত্র পিচঢালা পথ লাল

দশই নভেম্বর সকালে শহর উন্মাতাল।

ঢাকা শহর মুখর হলো ক্ষুব্ধ জনগণে

বিরাট মিছিল এগিয়ে এলো পুরানা পল্টনে।

উঠলো কেঁপে জিপিও মোড়, জিরো পয়েন্ট জিরো

উদোম গায়ে এগিয়ে এলো দুরন্ত এক হিরো!

কে এই ছেলে? এই ছেলে কে? নাম তো জানা নাই!

আর কেউ নয় আসাদ এবং মতিউরের ভাই।

বুকে পিঠে স্লোগান লেখা জীবন্ত পোস্টার

এমনতরো কান্ড দেখে অবাক স্বৈরাচার!

দিনদুপুরে গণতন্ত্র হুমড়ি খেয়ে পড়ে

জীবন্ত পোস্টারের ছবি পাভেল তুলে ধরে।

বন্ধু আমার, সাথী আমার, নূর, সাহসী বীর

গণতন্ত্রের প্রতীক তুমি, উঁচু তোমার শির।

অবরোধের আন্দোলনে বিলিয়ে দিলে প্রাণ

গণতন্ত্র মুক্তি পেলে গাইবো তোমার গান।

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent