তেলিগাতি হ র র: (খন্ড ৩)

২০৫ রুমে ঢুকে সবচে পেছনের লাইনে চুপচাপ বসে পড়লাম পাশে ন্যাটা নিপন আমার একাডেমিক দোস্তো

সকালে পিকলু স্যারের ট্রান্সপোর্টেশন ক্লাশ। ভোর বেলা ওঠার মতো কঠিন কাজ পৃথিবীতে নাই। শয়তান নাকি শান্তির চাদর বিছিয়ে দেয় শরীরে। আজ আর শয়তানের চাদর গায়ে দিলাম না। সুবোধ বালকের মতো উঠে পড়লাম। একা একা রুমে ভয় করতে পারে। তাই ক্লাশে গেলাম।

জুতো পায়ে দিতে গিয়ে দেখি শুকনো রক্ত। হাত দিয়ে ঘসলাম। উঠে গেলো। বুড়োর শরীরের রক্ত নাতো? শার্লক হোমসের মতো ডাক্তার ওয়াটসন মাকসুদকে বললাম, রক্তটা একটু দেখবি নাকি?

- Advertisement -

ব্যাটা, ওইটা কুকুরের আঁচড়। আমার পায়েও ছিলো। চিন্তার কিছু নাই যে।

তুই কি নিশ্চিত?

হুম। নিশ্চিত। এবং তুই যা ভাবছিস তা না।

আমি কি ভাবছি সেটা তুই জানিস?

তোর মাথা থেকে ওই বুড়া যায় নাই যে।

তুই শিওর বুড়োর রক্ত আমাদের গায়ে লাগে নাই?

শিওর। আমি গতকালই চেক করছি। খুব ভালো করে।

বহুদিন পর দুবন্ধু একত্রে ক্লাশে বেরুলাম। দোকান থেকে একটা ফরাসী আর কলা নিলাম। এটিই বাংলাদেশের একদল হবু প্রকৌশলীর রোজকার ব্রেকফাস্ট। ফরাসী কুয়েট ক্যাম্পাসের ইউনিক ফুড। ফ্রান্স থেকে আমদানীকৃত কোনো খাবার নয়। হয়তো তেলিগাতির কারো বাড়ির বেকারীতে প্রস্তুত। পাউরুটির ভেতর একটু মিষ্টি ক্রীম। কিন্তু নাম ফরাসী হলো কি করে সে রহস্য চার বছরেও শার্লক হোমস ভেদ করতে পারে নাই।

২০৫ রুমে ঢুকে সবচে পেছনের লাইনে চুপচাপ বসে পড়লাম। পাশে ন্যাটা নিপন। আমার একাডেমিক দোস্তো। ও না থাকলে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী কবি কাজী দীন মুহম্মদের কবিতার মতো ‘সুতায় ঝুলানো রোদ’ হয়ে থাকতো।

স্যার পড়াচ্ছেন ফ্লেক্সিবল পেভমেন্টে অ্যাসফল্টের মেল্টিং পয়েন্ট। লেকচারে বলে চলছেন, টেক্সাসের রাস্তায় তীব্র গরমে উচ্চ তাপমাত্রায় হাইওয়ের অ্যাসফল্ট গলে যায়। রোডের উপর চাকার টায়ার মার্ক পড়ে! সেগুলো……

কানে হঠাৎ তালা পড়লো আমার। স্যারের আর কোনো কথা মাথায় ঢুকছে না। মার্ক! টায়ার মার্ক! মার্ক! এ কথাটাই বারবার চক্কর দিচ্ছে। কাল রাতে ঘটনাস্থলে একটা মার্ক রেখে এসেছিলাম। বড় একটা পাথর। কিন্তু ফেরার সময় চোখে পড়েনি। বুড়ো ওটা নিয়ে যায়নি হানড্রেড পারসেন্ট শিওর।

তাড়াহুড়োয় আসার সময় চেক করিনি। ওটা কি ছিলো ওখানে? মাকসুদ কি দেখেছে? এখনই জিজ্ঞেস করা দরকার। কিন্তু ও বেশ দূরে। অপোজিট কর্ণারে, অপোজিট জেন্ডারের কাছাকাছি।

ক্লাশ শেষেই দৌড়ে গেলাম। দোস্ত বাইরে আয়।

কি হইছে?

আগে বাইরে চল।

লবিতে বললাম, তুই কি ফেরার সময় খেয়াল করছিলি পাথরটা ঐ জায়গায় আছিলো কিনা।

থমকে গেলো মাকসুদ। “অনেকবার তোরে জিজ্ঞেস করতে চাইছি যে। ভুলে গেছি বারবার। তুই দেখছিলি?”

সর্বনাশ পুরো ব্যাপারটাই রহস্যজনক। শোন, আজ আবার যাবো।

তোর মাথা খারাপ হইছে? বেশি হ্যাডাম দেখাইস না। পুরা চাইপা যা।

না। আমি যাবোই।

তুই যা। আমি নাই।

মাকসুদ, দিনে যাবো। দুপুরে চাচার হোটলে ভাত খাওয়ার পর।

কিন্তু লাভ কি? যদি গতোরাতে আমরা আসার পর থেকেও থাকে, পরে কেউ হয়তো নিয়ে গেছে। সুতরাং, না পাওয়াটা প্রমাণ করে না যে ওটা কাল ছিলোনা।

অকাট্য যুক্তি। বললাম, তবু দোস্ত… দুপুরে আমার সাথে খেতে যাবি।

খাইতে যাওয়া ঠিক আছে। যাবো। বলেই ক্লাশে ব্যাক করলো মাকসুদ।

প্রায় প্রতিদিনের ব্যাপার। ফার্ষ্ট ইয়ার থেকেই চাচার হোটেলে দুপুর আর রাতের খাবার খাই। থমথমে মুখে দুজন ঢুকলাম। চাচা পাইশ্যা মাছ রেঁধেছে। দুজনে একই মেনু অর্ডার দিলাম। খেতে দিয়ে চাচা সবসময়ই আমাদের সাথে গল্প করতে বসে। ইনিয়ে বিনিয়ে হঠাৎ গতকালের ঘটনাটা তুললাম। মাকসুদ হাত চেপে ধরলো। ইশারাটা বুঝেও আমি চালিয়ে গেলাম।

চাচা, এখান থেকে প্রায় কিলো তিনেক দূরে হাতের ডানে ফাঁকা একটা বাড়ি আছে। চেনেন?

হ্যা সবাই চেনে। ফাটা বাড়ি।

ফাটা বাড়ি মানে?

মানে ঐ বাড়িতে রাইতে জ্বীন ভুত আসে।

বাড়ির মানুষজন কই যায় তখন?

ঐ বাড়িতে কোনো মানুষ থাকে না।

কি কন চাচা! আপনি নিশ্চিত জানেন?

এই এলাকায় আমার জন্ম। মাঝখানে খালি কয়দিন শেফের চাকরি নিয়া রংপুর ক্যাডেটে গেছিলাম। এইখানকার নাড়িনক্ষত্র আমি জানি।

ঐ বাড়িতে কোনো বুড়া পাগল থাকেনা?

‘কইলামনা। কেউ থাকে না। সবাই বাড়িটারে ডরায়। ডরে কেউ দখলও করেনা।’

ও আচ্ছা।

চাচা আবার শুরু করলেন। ‘ব্রিটিশ আমলে লতু মন্ডল নামে এক চকপেয়াদা ছিলো। জমিদারের খাস চকপেয়াদা। থাইকপার লাইগা জমিদার ভিটাডা ওকে দেয়। ওর কাম ছিলো কার ক্ষেতে কেমন ফসল হইছে সেইটা দেখা। আর, খাজনা না দিলে ফসল কাইট্যা জমিদারের গোলায় নিয়া আসা।’

বললাম, তারপর?

‘লতু মন্ডল হঠাৎ জ্বীন ভূত চালান দেওয়া শেখে। ক্ষেতখামার চক ফালায়া এক সাধকের আখরায় গিয়া পইড়া থাকে। জমিদার জানতি পাইরা চাকুরী খাওয়ার হুমকি দেয়। তাতেও কাম হয়না। একদিন হঠাৎ মারাত্মক কাশি ওঠে লতুর। সাথে প্রচন্ড জ্বর। গলা দিয়া রক্ত বাইর হয়। দেশ ভাগের আগের বছর জষ্ঠি (জৈষ্ঠ) মাসে লতু মইরা যায়। কেউ কয় ক্ষয়রোগ! কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের ধারণা ওর নিজের জ্বীন ওরে মাইরা ফালাইছে।’

আড়চোখে মাকসুদের দিকে তাকালাম। বুঝলাম ওর বিশ্বাস হচ্ছেনা আজগুবি গল্প। তবু শুনে চলছি দুজন। কিন্তু পরের অংশে ঢোক গিললাম।

‘মরার পর লতুর ভিটা জমিদার ফেরত নেয় নাই। কিন্তু পরিবারের দায় দায়িত্ত্বও নেয় নাই। লতুর বিধবা বউ সুপারী বেওয়া দুইটা ছোট ছেলে নিয়া পড়লো বিপদে। না খায়া মরার দশা। গৃহস্ত বাড়িতে কাজ জোটেনা। জমিদারি হুকুমে ক্ষেতের ফসল কাটার সব রাগ লতুর উপর। দুই এক বাড়িতে কাম পাইলেও গৃহস্তের কুনজর থাইক্যা বাঁচা কঠিন। এপরেও আরেক সমস্যা।’

এটুকু বলে চাচা তাঁর ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে মুখ মুছলেন। বললেন, ‘আপনাদের কইতে বাবা শরম করে।’

বললাম, ‘না চাচা কোনো সমস্যা নাই। বলেন।’

আমরা শুনছি ওই বাড়ির বদজ্বীনগুলা রাইতে সুপারী বেওয়ার সাথে জোর জবরদস্তি মেলামেশা করতো। ঘরে বাইরে সম্ভ্রম হারায়া সুপারী বেওয়া একদিন গলায় কলস বাঁইধা বিল ডাকাতিয়ায় ডুইবা মরে।

এরপর? বিড়বিড় করে জানতে চাইলাম।

বড় পোলাডা পরে পাগল হয়া যায়। ছোটোডার নাকের তলায় গোঁফ গজাইতেছে কেবল। রাখালগিরি আর ক্ষেতে কামলা দিয়া খাইতো। দুইভাই থাকে ফাঁকা বাড়িতে। আশপাশে কেউ নাই। মা মরার তিন বছর বাদে এক রাইতে দুষ্টু জ্বীন আইসা দুই ভাইরে খুন করে। লাশ পইড়া আছিলো ছয়দিন। পরে পুলিশ আইসা বাড়ির উঠানে মার পাশেই কবর দেয়।

ভাইরা যদি মরেই থাকে, তাহলে রাতে বাড়িতে আলো জ্বালায় কে?

আলো? মাথা খারাপ। পল্লী বিদ্যুৎ একবার ঐবাড়ির উপর খুঁটি গাড়তে গেছিলো। দিনে দুপুরে কোনখান থাইকা ইটের ঢেলা। ওরা কাম করতে পারে নাই। পরে লাইন ঘুরায়া নিয়া গেছে।

সুপারী বেওয়া গলায় কলস দেয় কত সালে? বলতে পারেন?

সন তারিখতো আমরা জানিনা বাবা। তবে আইউব খান যে বছর মার্শাল ল’ দিলো সেই বছর।

মাথায় বিদ্যুত খেলে গেলো আমার মাথায়। মাকসুদ? এই মাকসুদ?

পাতে ভাত রেখে মাকসুদের খাওয়া থেমেছে আগেই। হাতের এঁটো শুকিয়ে চটচট করছে। সাদা ফর্সামুখ লাল হয়ে গেছে! আমার ডাক শুনে হকচকিয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করলাম, ১৯৯৫ থেকে ১৯৫৮ বাদ দিলে কতো হয়? আইউব খান ক্ষমতা নেয় ৫৮ সালে।

মনে মনে বিয়োগ করে চোয়াল শক্ত করে বললো, ‘৩৭ বছর।’

এর সাথে ২১ কিংবা ১৩ যোগ কর। পটকা ওদের মায়ের মৃত্যুর সময় দুভাইয়ের বয়স এরকমই বলছিলো।

তারমানে দাঁড়াচ্ছে যে, বেঁচে থাকলে ওদের বয়স হতো ৫৮ আর ৫০! মাকসুদের তড়িৎ হিসাব।

ইয়েস! এন্ড উই মেট দেম এক্সাক্টলি এ্যাট দিস এইজ!!

চাচা এবার বোকার মতো তাকিয়ে আমাদের দিকে। বাবা আপনেরা কি হিসাব নিকাশ করতেছেন? আমার মাথায় কিছুই ঢুকতেছে না।

চাচা আমার শেষ একটা প্রশ্নের জবাব দেবেন? যদি জানা থাকে আপনার।

‘বলেন বাবা।’

লতু মন্ডল কি কখনো জ্বীন দিয়ে অন্যকাজ করিয়েছে?

কি’রাম কাম?

ধরুণ মানুষ খুন করা, ধান কাটা, মাটি কাটা, বাড়ি বানানো?

না। সেরাম কিছু শুনি নাই। তবে শুনছিলাম জমিদার বাড়ির পুকুরের জন্য আসাম থাইক্যা জ্বীন দিয়া কিছু পাথর আনছিলো।

আমার মাথায় এবার পাথর ভেঙে পড়লো। মাকসুদের পুরো শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। দুজন দুজনের দিকে তাকালাম। ভেতরে শিরশিরে অনুভূতি। গলা দিয়ে ভাত নামছেনা। পাইশ্যা মাছের ঝোলে ধনিয়া পাতার গন্ধটা কী অমৃত লাগছিলো। এখন বমি আসছে। কালরাতে আমরা কার সাথে মারামারি করলাম? কাকে পটকা মাছ ডাকছিলাম? প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে যাঁরা মারা গেছে?

বিদ্যুত নাই! আলো জ্বালানোর মানুষ নাই! তবু এতো আলো কোত্থেকে জ্বললো? এগুলো কি জ্বীনভূতের আলো? না কি সবই মায়া? মায়াজাল?

মায়াতো কেবল শক্তি। শক্তি অনুভব করা যায়। স্পর্শ করা যায়না। আমরা স্পর্শ পেয়েছি। মা যাইসনে… সুস্পষ্ট ডাক শুনেছি। জলে ঝাঁপ দেবার ঝপাং শব্দ শুনেছি। এসব কি? এসব কি তাহলে হ্যালুসিনেশন?

হ্যালুসিনেশন হতে হলে পূর্ব ঘটনা জানা থাকতে হয়। আমরা আজকের আগ পর্যন্ত এসব ইতিহাস জানতাম না। তাছাড়া দু’জনের একত্রে হ্যালুসিনেশনের ব্যাখ্যা কি মনোবিজ্ঞানে আছে? প্যারাসাইকোলজি হয়তো একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে! কিন্তু প্যারাসাইকোলজি বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত নয়। প্রকৌশল বা ভৌত বিজ্ঞানের দুই ছাত্রের সামনে বিশাল প্রশ্নবোধক ভৌতিক চিহ্ন!

ব্রাম্পটন, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent