
১৩ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের শেষের পাতায় রঙিন একটা ছবিসহ ছাপা হয়েছে খবরটা। সুলতান আকন নামে তাদের একজন প্রেসকর্মী মারা গেছেন। প্রতিদিন ঢাকার কাগজগুলো দেখা হয়ে ওঠে না। পুরনো পত্রিকা দেখা আমার অভ্যেস। ব্রাউজ করতে করতে ইত্তেফাকের শেষের পাতায় এসে চোখ আটকে গেলো। এই ছেলেটাকে আমি চিনতাম জানতাম বহুদিন আগে থেকে। দাদাভাই বেঁচে থাকতে দীর্ঘদিন সে ছিলো দাদাভাইয়ের অফিস সহকারী বা পিওন। দাদাভাই তাঁকে পিওন বলতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। মিষ্টি মায়াময় একটা হাসি লেগে থাকতো ছেলেটার মুখে। আমাকে খুবই পছন্দ করতো। আমি আর আমীরুল ইসলাম একসঙ্গে প্রায়ই যেতাম দাদাভাইয়ের কাছে। গপ্পোসপ্পো করতে। কিংবা লেখা পৌঁছে দিতে। আমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলে দাদাভাইয়ের চাইতেও বেশি খুশি হয়ে উঠতো সুলতান। ওর হাত থেকে এই জীবনে কতো শত কাপ চা খেয়েছি তার কোনো হিশেব নেই। দাদাভাই অনুপস্থিত থাকলেও সে আমার জন্যে চা আনতে ছুটতো। কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি চায়ের বিলটা কি দাদাভাই-ই দেবেন নাকি তুমি দিবা?
ইত্তেফাকে গিয়ে দাদাভাইকে তাঁর কক্ষে না পেলে সুলতানকে আমি জিজ্ঞেস করতাম—তোমার দাদাভাই কই? মিষ্টি হেসে সুলতান বলতো—হ্যাতো আম্নেগো দাদাভাই। মোর দারে হ্যাতো স্যার। সামনা সামনি দাদাভাইকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতো সুলতান। কেবল আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সে তার স্যারকে দাদাভাই বলতো।
আমি সুলতানকে তুমি সম্বোধন করলেও আমীরুল তার স্বভাবজাত তুই সম্বোধনেই কথা বলতো। এতে করে সুলতান কি মনে কোনো কষ্ট পেতো? কারণ সুলতান আকন তো কেবল একজন অফিস সহকারীই ছিলো না। সে তো একজন ছড়াকারও! একদিন আমি একা গিয়েছি ইত্তেফাকে। আমীরুল সঙ্গে ছিলো না। আমার মনে হলো যদি এ বিষয়ে ওর মনে কোনো কষ্ট থেকে থাকে তাহলে সেটা দূর করে দিই। ওকে বললাম—অই মিয়া তোমাকে আমীরুল তুই করে বলে, এজন্যে তুমি কি মনে কষ্ট পাও? ও না সূচক মাথা নাড়লেও সেটা নাড়াতে ওর কয়েক সেকেণ্ড দেরি হয়েছিলো। আর সেটা দেখে আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে কষ্ট সে কিছুটা পায় বটে। আমি তখন আমীরুলের দিলখোলা স্বভাবটাকে ব্যাখ্যা করে ওকে বুঝিয়েছিলাম— আমীরুল কাউকে ছোট করার জন্যে এটা করে না। তুই করে কথা বলতেই ওর আনন্দ। পারলে তো আমাকেই তুই করে বলে!
আমার কথা শুনে সুলতানের সে কী হাসি!—না না আমি আমীরুল ভাইয়ের উপ্রে একটুও রাগ করি নাই।
আমি দাদাভাইয়ের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে মাঝে মধ্যে দাদাভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তাঁর কক্ষে বসেই দাদাভাইয়ের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে থাকলে মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত সুলতান আমাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করতো। একদিন ওইরকম একটা পরিস্থিতিতে আমার বিপুল চোটপাটের পর সুলতান বললো—কিন্তু দাদাভাই তো আমীরুল ভাইয়ের চাইয়া আম্নেরেই বেশি ভালোবাসে।
–তোমাকে বলেছে দাদাভাই?
–হ। কইছে তো সেইদিন।
–কি বলেছেন দাদাভাই?
আমার জেরার মুখে তাৎক্ষণিক একটা বানোয়াট সমাধান দিতে তৎপর হলো সে—সেইদিন দাদাভাই কইলো যে কইলো রিটন কিন্তু আমীরুলের চেয়ে অনেক বেশি ভালো ছেলে। (আমি জানি এরকম কথা দাদাভাই বলেননি। সুলতান আমাকে খুশি করার জন্যে বানিয়ে বানিয়ে বলছে। সুলতান জানে না আমিও দাদাভাইয়ের ওপর চোটপাটটা বানিয়ে বানিয়েই করছি। হাহ হাহ হাহ। এটা ছিলো আমার কাছে টাইম পাস করার একটা খেলা।)
অবশ্য দাদাভাইয়ের ওপর সুলতানের একটা অভিমান ছিলো। দাদাভাইয়ের পিওন বলেই নাকি দাদাভাই কচি-কাঁচার আসরে সুলতান আকন নামের নবীন একজন ছড়াকারের লেখা তিনি ছাপেন না।
–তুমি দিয়েছিলে কখনো?
–অনেকবার দিসি। কিন্তু দাদাভাই ফেলাইয়া দেছে।
আমার হাতে প্রায়ই কয়েকটা ছড়া ধরিয়ে দিতো সুলতান। আমি কয়েক জায়গায় ওর ছড়া ছাপিয়েও দিয়েছি বহুবার। আমার সম্পাদিত ছোটদের কাগজেও সুলতানের ছড়া আমি ছেপেছি। আমি কোনো পত্রিকায় কাজ করি জানতে পারলে আর রেহাই ছিলো না। আমি অবশ্য খুব সমাদরের সঙ্গেই ওর লেখা নিয়ে যেতাম। পিওন হোক দারোয়ান হোক কিংবা ম্যানেজিং ডিরেক্টর হোক ছড়াকার তো ছড়াকারই। বাংলাদেশের সব ছড়াকারই আমার আত্মার আত্মীয়। এটা সুলতান জানতো। আর জানতো বলেই আমাত হাতে ওর লেখা ছড়া ধরিয়ে দিত অবলীলায়। আমাকে একদিন সম্ভবত নিজের পয়সায় চা-সিঙ্গারা খাওয়াতে খাওয়াতেই সুলতান প্রসঙ্গটা তুলেছিলো—আমি একটা ছোটখাট পিওন হেইয়া লইয়া আম্নে যে আমারে অসোম্মান করেননা তা আমি জানি। হেই কারণেই আম্নেরে ভালা পাই।
আমি কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে দাদাভাইকে গালাগাল করলাম। সুলতান দেখি আমাকে সমর্থন করে—হ। দাদাভাই মানুষটা আসলে খারাপ কিন্তু অতো খারাপ না। মানুষটা ভালো কিন্তু গরিব মাইনষেরে সোম্মান দিতে চায়না। অনেক বড়লোক তো…সুলতানের দীর্ঘশ্বাস আমাকে জানিয়ে দেয় দাদাভাইয়ের একধরণের রেসিজম বা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির শিকার তাঁর অফিস সহকারী সুলতান। আসলে বড়মাপের মানুষদের অনেক ক্ষুদ্রতাও থাকে। বাইরে থেকে হয়তো সেই ক্ষুদ্রতাকে চট করে বোঝা যায় না কিন্তু কাছের মানুষজনের কাছে সেটা লুকানো থাকে না।
শেষদিকে একদিন দাদাভাইকে সুলতানের বেদনার কথাটা বলেছিলাম– সুলতান পিওন বলেই কি সুলতানের কোনো ছড়া কচি-কাঁচার আসরে ছাপেন না আপনি? বলার আগে তাঁকে প্রমিস করিয়েছিলাম—এই নিয়ে সুলতানকে তিনি বকাঝকা করতে পারবেন না। আমার কথার কোনো জবাব দেননি দাদাভাই। মাছের ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়েছিলেন আমার দিকে। আমি চলে এসেছিলাম দাদাভাইয়ের কক্ষ থেকে দ্রুত। কারণ প্রসঙ্গটা তাঁর জন্যে বিব্রতকর। জানিনা এরপর দাদাভাই তাঁর মনোভাব পাল্টেছিলেন কিনা। সুলতানের ছড়া তিনি ছাপতেন কিনা কচি-কাঁচার আসরে সেই খবরটা আমার আর জানা হয়নি।
এক পর্যায়ে আমার জীবনটা কী রকম উলট পালট হয়ে গেলো। হইয়া আমি দেশান্তরী দেশ বিদেশে ভিরাই তরী। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে বারো হাজার তিনশ কিলোমিটার দূরের একটা বরফাচ্ছাদিত দেশে স্থায়ী ভাবে আটকে গেলাম। সুলতান আকনের সঙ্গে আমার সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। একটা কথা সুলতানকে বলার জন্যে জমিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু ওর সঙ্গে আর দেখাই তো হলো না। এতোবার দেশে গেলাম কিন্তু ইত্তেফাকে আর যাওয়া হয় না বলে সুলতানের সঙ্গেও দেখাটা আর হলোই না। ওকে বলাই হলো না যে—সুলতান, আরে মিয়া মাটি থেইকা ছত্রিশ হাজার ফিট উপ্রে আসমানে বইসা বইসা বিমানে পত্রিকার পাতায় তোমার ছড়া পর্ছি মিয়া। এই খবরটা তোমারে যে দিলাম তার জন্যে আমারে কয়টা সিঙ্গারা খাওয়াইবা কও?
সুলতান, আমার ছড়াবন্ধু, তোমার জন্যে আমার অনেক অনেক ভালোবাসা।
অটোয়া, কানাডা
