
মিল্টন? গলা ফাটিয়ে চিৎকার মাকসুদের। ‘বুড়োর হাঁটু বরাবর ল্যাঙ মার।’
ছোটো খাটো গড়ণের খেলুড়ে মাকসুদের তড়িৎ ফ্লেক্স। ঝাঁপিয়ে বাঁ দিকে সরে গেছে। আমি দ্বিধান্বিত। পা কাঁপছে। বয়ষ্ক একটা মানুষকে লাথি দিবো? কিন্তু জান বাঁচাতে সবই জায়েজ। কষে বাম পা চালালাম। কোঁত করে আওয়াজ বেরুলো। পাথর সহ মুখ থুবড়ে মাটিতে আছাড় খেলো। উপুড় হয়ে আছে বুড়ো। লুঙ্গি ঢিলে হয়ে গেছে। ভাগ্যিস বাতাস নেই। তা’নাহলে অন্য দৃশ্য দেখতে হতো!
ভূঁইফোরের মতো দৃশ্যপটে আগমন ঘটলো চতুর্থ ব্যাক্তির। কখন এসে দাঁড়িয়েছে দেখি নাই। পটকা মাছের মতো দেখতে। মলিন একটা জামা গায়। ভাঙাচোরা শরীর। তোবড়ানো গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। খাটো একটা লুঙ্গি। সুতোর বুনন পাতলা হয়ে গেছে। যেকোনা মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে।
মাটিতে ঝুঁকে মিঞা ভাই মিঞা ভাই বলে কাৎড়াতে লাগলো। আমি স্তম্ভিত। ভয় পাচ্ছি। চিৎকার করে লোক জড়ো করলে কি অবস্থা হবে? পুলিশি মামলা। ৩০৭ ধারায় হত্যার চেষ্টা। ডাইরেক্টর স্যার কালকেই ক্যাম্পাস থেকে ঘাড় ধরে বের করে দেবেন। মাকসুদের বাবা চট্টগ্রামে নামকরা উকিল। ছেলেকে ঠিকই ছাড়িয়ে আনবেন। আমি শালা জেলে পঁচে মরবো।
অসহায়ের মতো মাকসুদের দিকে তাকালাম।
বললাম, দোস্ত কি করবি?
চল দৌড়ায়া পালাই।
রাস্তায় লোকজন ধইরা ফালাইলে?
থাম। একটু চিন্তা করি যে।
আর চিটাগাইঙ্গা ‘যে’ ‘যে’ করিস নাতো। শালা সব কথার শেষে যে! এখন বাঁচার উপায় কি, উকিলের পো বুদ্ধি দে।
নিচে মিঞা ভাই আর ছোট ভাইয়ের গোঙানি শুনছি। এখনো কেউ ওঠে নাই। ব্যথা পেয়েছে বড় ভাই। কিন্তু গোংড়ানি ছোটোটার বেশি।
কিং কর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। উনিশশো পঁচানব্বুই সাল। হাতে মোবাইল দূরে থাক, একটা পেজারও নাই। হলের বন্ধুদের খবর পাঠাতে পারলে এসে উদ্ধার করতো। সেটা এখন সম্ভব না। চারিদিক অন্ধকার। ফিজিক্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী অবজেক্টের উপর আলোর অভাব। কিন্তু আমার মনে তখন সাইকোলজিক্যাল অন্ধকার। আশার আলো নাই। একটু আগে উপভোগ করা আলো জলের চুম্বন দৃশ্যকে পাপ মনে হলো।
পটকা মাছ ভাইটা হঠাৎ দেবদূত হয়ে আশীর্বাদ সংবাদ বয়ে আনলো। ‘স্যার, আপনারা যানগা। আমি মিঞা ভাইরে বাড়িত নিয়া যাই।’
ওর মুখে স্যার শুনে অবাক হলাম। পরে ভাবলাম সে মনেহয় আমাদের হলে যাতায়াত করে। হলের বয় বেয়াড়ারা আমাদের স্যার বলে।
বুকে সাহস ফিরে পেলাম। মাকসুদ উঠে প্যান্টের ধুলো ঝাড়ছে। ফিটফাট বয়। নিয়মিত ফেসওয়াশে মুখ ধোয়। ডোভ সাবানে গোসল করে। মাঝে মাঝে বন্ধুদের জন্য নিয়ে আসে। বিশেষ করে লালন শাহ হলের এক্সটেনশন ৫ নম্বর ব্লকের জন্য। পটকা মাছকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার ভাইয়ের কি হইছে যে?’
আমার বয়স যহন তেরো। ভাই একুশ। বাপ মরছে আগেই। মা মাইনষের বাড়িত কাম কইরা সংসার চালাতি।
তোমাদের বাড়ি কোনটা?
আঙুল দিয়া দেখালো। অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যায়না। একটা টিমটিমে আলো। অনেক বোঝার চেষ্টা করলাম। আসার সময় দিনের আলো ছিলো। হ্যাঁ.. একটা ফাঁকা ভিটেবাড়ি দেখেছিলাম। আশে পাশে দু তিনশো গজের ভেতর আর কোনো লোকালয় নাই।
তারপর?
একদিন মা বিল ডাকাতিয়ায় ঝাঁপ দেয়।
‘মানে?’ এক সাথে কথা বলে উঠলাম আমি আর মাকসুদ।
জ্বী। কলসি গলায় প্যাঁচায়া ঝাঁপ। আর কোনোদিন ওঠে নাই।
কোনোদিন ওঠে নাই? সেটা বুঝলা ক্যামনে?
পুলিশ জাল ফালায়া ছয় দিন বাদে লাশ তোলে। এরবাদে আমাগি বাড়ির উঠানে কবর দেয়।
তো তোমার মিঞা ভাইয়ের সমস্যা কি?
মা মরার বাদে ভাই পাগল হয়। সে বিশ্বাস করেনা মা মরছে।
কেনো? কবর দিতে দেখে নাই?
কবর দিতি দেখিছে। কিন্তু ছয় দিনের গলা লাশ। মাছে চোখ মুখ খায়া ফালাইছে। চেনা যায় না। মিঞা ভাই কইছে, এইডি আমায় মা না।
সে কি মনে করছিলো?
মিঞা ভাইর ধারণা মা গোসল করতি গেছিলো। আবার আসপানে।
“আর তাই তোমার ভাই প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মনে করে মা বিল থাইক্যা উঠবে। তারপর দুই ছেলের রাতের খাবার রেডি করবে। ঠিক না?” বিজ্ঞের মতো বললাম আমি।
জ্বী স্যার। আপনি বুঝতি পারলেন কেমনে?
মাকসুদের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসলাম। মনে মনে নিজেকে শার্লকহোমস মনে হলো। বললাম, বন্ধু ওয়াটসন, চলো বেকার স্ট্রিটে ফিরে যাই। মামলা ডিসমিস। রহস্যের আর কিছু নাই।
পটকা মাছ ভাইটারে বললাম, তোমার মিঞা ভাইকে নিয়ে যাও। কাল ডাক্তার দেখাও। আমরা খুবই দুঃখিত।
দুই ভাই উঠে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো। আমি আর মাকসুদ কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। ওদের চলে যাওয়া দেখছি। অন্ধকারটা একটু যেনো চোখ সওয়া হয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে মাটির ঘাস বোঝা যায়।
মক, ওদের বাড়িটা দেখবি?
বন্ধু, আমার শখ মিটা গেছে যে। তুই যাইলে যা।
বাড়ি পর্যন্ত দরকার নাই। কাছাকাছি কোথাও দাঁড়াবো।
না তুই একা যা।
না রে একা মজা নাই।
মজা নাই.. নাকি ভয় পাইতাছিস যে?
হেসে দিলাম। দোস, দুইটাই।
আচ্ছা চল।
ঘাস মাড়িয়ে সামান্য পশ্চিমে হাঁটছি। অসম্ভব নির্জন জায়গা। বাতাসের শন শন হালকা শব্দ ছাড়া কোনো আওয়াজ নেই। কেমন দম আটকানো ভাব। সামনে বেশ আলো দেখছি। কিন্তু শব্দ নেই। মাকসুদকে বললাম, আর যাওয়ার দরকার নেই।
ঠিক আছে।
খেয়াল করছিস প্রচুর আলো বাড়িটায়।
বললো, হ্যাঁ। একটু আগেও পুরো অন্ধকার দেখছিলাম।
মনে হয় ওরা বাড়ি ঢুকে সব আলো জ্বালিয়েছে।
ছোট ভিটে বাড়ি। প্রান্তিক দরিদ্র মানুষ। কয়টাই বা ঘর? কয় ঘরে আলো জ্বলবে যে?
সেটাই! আশ্চর্য!!
সবগুলো বাতি আবার একত্রে নিভে গেলো।
হাউ কাম? মাকসুদ চেঁচিয়ে উঠলো।
আমিও অবাক হলাম। এমন মিলিটারি স্টাইলে সব বাতি একত্রে নেভানো বড় লোকের বাড়িতেও সম্ভব না। প্যারালেল কানেকশন? এরকম হত দরিদ্রের ভিটায়? কতজন থাকে ও বাড়িতে?
চমক অপেক্ষা করছিলো। সব বাতি একত্রে আবার জ্বলে উঠলো। দশ সেকেন্ড বাদে একই কায়দায় নিভে গেলো।
মাকসুদ রে। এতো দেখছি অ্যামিটিভিল হরর। চল, হলে যাই। এ্যাডভেঞ্চার বহুত হইছে।
পশ্চিম থেকে মুখ ফিরিয়ে দক্ষিনে হাঁটা দিলাম। জায়গাটা ফাঁকা। দূরে তেলিগাতির রাস্তাটা। গেলেই একটি ভ্যান পেয়ে যাবো।
“মা.. মা… মা…. যাইস নে। মা যাইস নে। দোহাই…।” হঠাৎ দূর থেকে চিৎকার। ভয়াবহ চিৎকার। হন হন দৌড়ের সাথে যেমন চিৎকার বেরোয় তেমনি।
“মা তুই দাঁড়া।” বার্ধক্যে কাতর আর্তনাদি গলা।
দুজন থমকে দাঁড়ালাম। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। সাদা শাড়ি পরা লম্বা চিকন ছায়ামূর্তি দৌড়াচ্ছে। পেছনে সাদা গেঞ্জির বুড়োটাকে চেনা যাচ্ছে। অন্ধকারে দুজনের পোশাক সাদা হওয়ায় সুবিধে হলো। কথিত মৃত মহিলা দৌড়াচ্ছে সোজা বিল ডাকাতিয়ায়। পেছনে চিৎকার। মা যাইস নে। মা যাইস নে।
এরপর ঝপাত। একবারই শব্দ। ঝপাং করে কেউ পানিতে পড়লো।
বুড়ো পাড়ে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে কান পেতে বুঁদবুঁদ আওয়াজ শোনার চেষ্টা করলাম।
দোস্ত আর কোনো শব্দ পাইছিস।
না যে।
ঘটনাটা কি হইতেছে ক তো?
বোঝার চেষ্টা কইরা কাম নাই। চল ভাগি।
ঠিক আছে। চল। মাগার… এই মাকসুদ! মাকসুদ! বুড়া কই? বুড়া কই? খুব অস্থির হয়ে বললাম।
এইমাত্র দেখলাম। কই গেলো?
ভোজবাজির মতো উড়ে গেলো? পানিতে পড়লে নির্জনতায় নিশ্চিত ঝপাং শব্দ পেতাম।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বুড়া বাড়ি যেতে পারবে না যে!
হ’ দোস্তো। সুপারন্যাচারাল ব্যাপার! যা বোঝার বুইঝ্যা গেছি। বাঁচতে চাইলে ‘লৌড়’ দে।
পড়িমড়ি করে রাস্তায়। ভ্যান রিক্সা কিচ্ছু নাই। কেবল দুটো নেড়ি কুত্তা পিছু নিয়েছে। ঘেউ ঘেউ শব্দে খানখান নীরবতা। নেকড়ের মতো হামলে পড়ছে পায়ের উপর!
টরন্টো, কানাডা।
