লোভী মধ্যবিত্তের কাতারে

বিগত পনের বছর গ্রামের বদলে যাওয়াটা যদি আপনার নজর না এড়ায় তো জানবেন গ্রামের অসংখ্য গনি মিঞা তার কৃষিজাত পণ্য থেকে সম্পদ সমাবেশে সক্ষম হয়েছিল

বাজারে খুব সস্তায় সবজি পেয়ে আনন্দে এক ব্যাগ সবজি কিনে বাসায় এসে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বউকে বললেন, ”ওগো! শুনছ! সবকিছু সস্তা হয়ে গেছে!” এমনটি যদি আপনার বেলায় ঘটে, তো আমি আপনাকে সেইসব লোভী মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলব, যারা যেকোনভাবে কেবল উপরেই উঠতে চায়। আপনার তৃপ্তি কতশত কৃষককে আত্মহুতির পথে ঠেলে দেবে সে চিন্তা আপনি একবারও করবেন না। গ্রাম থেকে সম্পদ পাচারের অতি চেনা ও পুরোনো বন্দোবস্তে আপনি সেই নাগরিক মধ্যবিত্ত, যার মধ্যে অনেকরকম মানবিক মূল্যবোধ থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু, অর্থনীতির খুব স্বাভাবিক জ্ঞানটাই অনুপস্থিত। দুঃখিত।

এর আগে সম্পদ পাচারের বৈশ্বিক রূপটি নিয়ে কিছু লিখেছিলাম, সম্পূর্ণ না যদিও। এবার সম্পদ পাচারের দেশি মডেল নিয়ে কিছু বলি। ধরা যাক গনি মিঞার কথা, গনি মিঞা একজন কৃষক, সেটা আমরা ছোটবেলা পড়েছি। তো, গনি মিঞা এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করলো, সবমিলিয়ে তার খরচ হলো ১০ হাজার টাকা, মোট টমেটো হলো ১ হাজার কেজি, তাহলে তার উৎপাদন খরচ হলো প্রতি কেজি ১০ টাকা। এখন গনি মিঞা যদি সেই টমেটো বিক্রি করে ১০ হাজার টাকা ফিরে পায়, তাহলে তার কোন মুনাফা হলো না বটে ,তবে, সম্পদ পাচারও হলো না। যদি ১৫ হাজার টাকা পায়, তো বাড়তি ৫ হাজার টাকা সম্পদ হিসেবে গনি মিঞার দিকে গেল। যদি উল্টোটা হয়, তাহলে গনি মিঞা তার সম্পদ হারালো। ধরা যাক, গনি মিঞার প্রতি আপনার কোন মমতা নাই, সে তার উৎপাদন খরচ উঠাতে পারলেই আপনি খুশি, তবু ভাবতে হবে, কারণ, তার তো সংসার চালাতে হবে। তো, মিনিমাম একটা মুনাফা তাকে না দিলে তো চলবে না। কিন্তু, উপায় কী? গনি মিঞার পক্ষে হিমাগারে টমেটো রাখা সম্ভব হলে কথা ছিল না, কিন্তু, আপনার পক্ষে যে লোকটি গনির কাছে গেছে, সে চেষ্টা করছে যত কম দামে টমেটো কেনা যায়। তাহলে নিজের মুনাফা নিশ্চিত করার সাথে সাথে আপনাকে সস্তায় টমেটো দিতে পারবে। তো, তাই হলো, সে ৮ টাকা কেজি দরে টমেটো কিনে আপনার কাছে ১৫ টাকায় বেচলো। আপনিও মহা আনন্দে এক কেজি টমেটো কিনে বউকে বললেন, “ওগো, সালাদটা দারুণ! আহ!”

- Advertisement -

বিগত পনের বছর গ্রামের বদলে যাওয়াটা যদি আপনার নজর না এড়ায়, তো জানবেন, গ্রামের অসংখ্য গনি মিঞা তার কৃষিজাত পণ্য থেকে সম্পদ সমাবেশে সক্ষম হয়েছিল। কৃষিজমির দাম হু-হু করে বাড়ছিল। শুধু কৃষি তো না, পোলট্রি, মাছ সহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গ্রাম গমগম করছিল। বাজারে আপনার হয়তো কষ্ট হতো, মনে হতো, এত দাম! সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় একটা কাজ খুব দক্ষতার সাথে করতে পেরেছিল, সেটা হলো সময়মতো সার ও সেচের ব্যবস্থা ঠিক রাখা, শহরে লোডশেডিং করে হলেও গ্রামে বিদ্যুত ঠিক রাখা, আর কী পরিমান সবজি উৎপাদন করা হবে, তার লক্ষমাত্রা ঠিক করে দেওয়া। সরকার খুব ভালো করেই জানতো, বাড়তি লাভের আশায় সব কৃষক যদি টমেটো চাষ করে, তাহলে বাজারে তার কোন দাম থাকবে না। আবার লস করার পরে পরের বছর ওই সবজি তারা চাষই করবে না। পরের বছর সব কৃষক অন্য কোন সবজির পেছনে দৌড়াবে। বাংলাদেশের কৃষক বহুবছর এই চক্রে আটকে গিয়েছিল। সম্ভবত, আবার তারা এই চক্রে ঢুকে পড়েছে।

 

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent