পাখির বাসা

ইংরেজি ক্লাসে দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাজাই গল্পটা পড়াতে পড়াতে হঠাৎ থেমে গিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকতো চন্দনার দিকে

আজ সকালে গোসল করে লাল একটা সুতী শাড়ি পড়েছে চন্দনা। কালো ব্লাউজ। চোখে কাজল দিয়েছে। মাঝে মাঝে কাজল দিতে ভালোই লাগে। শিহাবও খুব পছন্দ করে কাজল। লাল শাড়িতে বেশ মানিয়েছে চন্দনাকে। গত বছর পহেলা বৈশাখে এই শাড়িটা কিনে দিয়েছিল শিহাব। শাড়ি অবশ্য পরা হয় না তেমন। আজ কেন জানি ইচ্ছা হল শাড়িটা পরতে। চন্দনার গায়ের রং বেশ ফর্সা, স্বাস্থ্য ভালো। বাবু হওয়ার পর আরেকটু মোটা হয়ে গেছে অবশ্য। তবু শিহাবের আরও বেশি ভালো লাগে এখন বউটাকে। বিয়ের পর পাঁচ বছর কেটে গেছে। কিন্তু তাদের ভালোবাসা একটুও কমেনি, বরং যেন বাড়ছে দিনদিন। চন্দনা খুব চাপা স্বভাবের সংসারী মেয়ে। চুপচাপ নিরিবিলি থাকতেই ভালোবাসে। ঘর থেকে বের হয় না তেমন। সারাদিন ঘর সাজায়, রান্না করে আর বাবুকে খাওয়ায়। বাবুর বয়স দুই বছর। এই বয়সেই অনেক কথা বলে সে।

শিহাবের বাবা-মা গ্রামে থাকেন। এখন দুই জনই অসুস্থ। মাঝে মাঝেই তাঁদের ঢাকায় নিয়ে আসে শিহাব। চন্দনা কোন আপত্তি করে না কখনো। বরং যথেষ্ট সেবা-যত্ন করে শ্বশুর শাশুড়ির। চন্দনার বাবা-মা নেই। শ্বশুর শাশুড়িকেই বাবা-মা মনে করে সে। শিহাবের বাবা-মাও খুব ভালোবাসেন তাঁদের একমাত্র ছেলের বউকে। বউটা এতিম, ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন রোড এক্সিডেন্টে। চাচার বাড়িতে মানুষ হয়েছে চন্দনা। চাচা অবশ্য তাকে মেয়ের মতই ভালোবাসেন। কিন্তু চাচী খুব একটা পছন্দ করতেন না চন্দনাকে। তাই লেখাপড়ায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরেই বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়েতে তেমন খরচও করেননি চাচা। শিহাব নিজেই পছন্দ করেছিল চন্দনাকে। চন্দনাদের কলেজে ইংরেজির লেকচারার হিসেবে জয়েন করে শিহাব। শ্যামলা রঙের লম্বা, হালকা পাতলা একটা ছেলে, চোখে ভারী চশমা। টিচার বলে মনে হতো না।

- Advertisement -

ইংরেজি ক্লাসে “দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাজাই” গল্পটা পড়াতে পড়াতে হঠাৎ থেমে গিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকতো চন্দনার দিকে। চন্দনার তখন স্যারকেই জিম বলে মনে হতো। আর নিজেকে মনে হতো ডেলা। একদিন স্যার একটি গ্রামার বই দিলেন চন্দনাকে। বইয়ের ভিতরে ছোট্ট চিরকুট:

“ও আমার ছোট্ট পাখি, চন্দনা,

একটি শীষেই জাগিয়ে গেল,

লাগছে তাও মন্দ না।”

ইংরেজি স্যারের বাংলা গানে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ে গেল চন্দনাও। দেখাও করলো গোপনে দুই একবার নদীর ধারে। তবে শিহাব অপেক্ষা করতে পারেনি বেশিদিন। বাবা-মাকে সরাসরি বলে দেয় সে তার ভালো লাগার কথা। শিহাবের পছন্দে আপত্তি করেনি কেউ। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে চন্দনা এ গ্রেড পেয়ে। তারপরই বিয়ে হয় তাদের। চন্দনার চাচী হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। চাচীর নিজেরও দুই মেয়ে বড় হচ্ছে। তাদের কথাও তো ভাবতে হবে। চন্দনার চাচা চাননি এত তাড়াতাড়ি এতিম মেয়েটাকে পর করে দিতে। হাজার হোক, অকাল প্রয়াত বড়ভাইয়ের একমাত্র সন্তান এই চন্দনা। মেয়েটা পড়াশোনায় ভালো। চাচা চেয়েছিলেন, চন্দনাকে ডাঃ বানাবেন। মেয়েটার মেধা ভালো। কিন্তু চাচীর চাপে বিয়েতে রাজী হয়ে গেলেন চাচা। আর শিহাবকেও চাচার পছন্দ হয়েছিল। শিক্ষিত, মুক্তমনা ছেলে। বিয়েতে এক পয়সা যৌতুক নেয়নি। বরং দামী বেনারসি শাড়ি আর সোনার গয়না দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে গেছে চন্দনাকে।

নিজের ছোট্ট পাখির বাসার মত সংসারে সত্যিই খুব ভালো আছে, সুখে আছে চন্দনা। চাঁদের মত ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। আর শিহাব এত ভালোবাসে! শ্বশুর-শাশুড়ি, একমাত্র ননদ সবাই খুব ভালো মানুষ। ঝামেলা নেই বললেই চলে। এর বেশি আর কি চাই একটা মেয়ের জীবনে? ননদ শিমুর বিয়ে হয়ে গেছে গত বছর। প্রবাসী স্বামীর সাথে কানাডা চলে গেছে সে। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা হয়। শিহাব আর চন্দনা খুব ভালোবাসে তাদের একমাত্র ছোট বোনটাকে।

গরম গরম মুচমুচে পরোটা আর চা খেতে খেতে এক দৃষ্টিতে চন্দনার দিকে তাকিয়েছিল শিহাব। আজকেও সে ক্লাসে পড়াবে ও হেনরির বিখ্যাত ইংরেজি ছোটগল্প ” দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাজাই”। ডেলার মতই এক ঢাল লম্বা, সোনালি চুল তার বউয়ের। এই চুল দেখেই তার প্রেমে পড়েছিল শিহাব। চন্দনা হেসে বলে,”কি দেখো?”

“তোমাকে।”

“ও আচ্ছা। তাই বুঝি?”

“হুম।”

“দেখা শেষ হয় না তোমার?”

“নাহ্। এই জীবনে হবে না।” চন্দনার কাজল পরা টানা টানা চোখের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে শিহাব।

“আরেকটা চশমা লাগাও।” ঠোঁট টিপে মিষ্টি করে হাসে চন্দনা।

চন্দনার হাত ধরে কাছে টানে শিহাব। চন্দনা ঘড়ির দিকে তাকায়,”দশটা তো বেজে গেছে। তোমার না সাড়ে দশটায় ক্লাস?”

শিহাব আরেকটু কাছে টানে চন্দনাকে। তার সুগন্ধি চুলে নাক ডুবিয়ে দেয়। কী মিষ্টি ঘ্রাণ! বুক ভরে শ্বাস নেয় শিহাব। আর ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠে বাবু। চন্দনা এক ছুটে চলে যায় বাবুর কাছে। বাবুকে কোলে নিয়ে শিহাবের কাছে আসে। শিহাব গাল টিপে আদর করে বাবুকে, বাবুর মা’কেও। তারপর রওনা হয় কলেজের পথে। বাসার কাছেই কলেজ। দশ মিনিটের পথ। হেঁটে যেতে যেতে তার মনে হয়, জীবনটা খারাপ না তো! বেঁচে থাকাটা সত্যিই দারুন ব্যাপার!

- Advertisement -

Read More

Recent