করিন্থ ক্যানেল নির্মাণে গ্রীক ট্র্যাজেডি!

সুয়েজ খালের গল্পটা অনেক বড়

সুয়েজ খালের গল্পটা অনেক বড়। ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির উপাখ্যান। কেবল তাই নয়, উনবিংশ শতকের কঠিনতম প্রকৌশল অর্জন। ১৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যানেলে সুইং ব্রীজ, টানেল, রেললাইন, নদী শাসন, ওভারহেড বিদ্যুত লাইন, সী পোর্ট, ম্যারিন স্ট্রাকচার, লাইটহাউস কতো কিছুই না ছিলো। পুরো ১০ বছর (১৮৫৯ – ১৮৬৯) লেগে গিয়েছিলো হেভী ইঞ্জিনিয়ারিং এই প্রকল্প শেষ হতে।

১৮৭২ সালে আর্টিফিসিয়াল ক্যানেল সুয়েজ খুলে দেবার পর বিশ্ব বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ইংরেজদের ভারত শাসন করাও সুবিধে হয়ে যায়। উড়োজাহাজ ছিলোনা। জলজাহাজেই আসতে হতো ভারতে। বেনিয়ারা ইউরোপ থেকে ভারতে বা ভারত থেকে ইউরোপে যাতায়াত এবং মাল পরিবহন করতো জাহাজের আটলান্টিক-ইন্ডিয়ান ওশেন রুটে। আসার পথে আটলান্টিক ধরে উত্তর থেকে দক্ষিণে নেমে আবার পূর্ব দিকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিতো। এটি ছিলো ভয়ানক উত্তাল ঢেউয়ে দূর্গম দীর্ঘ পথ।

- Advertisement -

সুয়েজ খাল হবার পর জলপথ জলের মতোই সহজ হয়ে গেলো। জিব্রাল্টার প্রণালী হয়ে জাহাজ ঢুকতো ভূমধ্যসাগরে। এরপর সুয়েজ খাল পাড়ি দিয়ে টুক করে এশিয়ার লোহিত সাগরে। যেনো লাফিয়ে জেদ্দা বন্দরে নেমে যাওয়া যায়। লোহিত সাগর থেকে সামান্য আরব সাগর পাড়ি দিলেই কালিকট, বোম্বে, করাচী বন্দর। ভারত মহাসাগরের ঢেউ দূরে থাক বাতাসটাই গায়ে লাগলো না।

কাহিনী কিন্তু সুয়েজের নয়। ওটা লিখতে গেলে আস্ত ট্রিওলজি উপন্যাস হয়ে যাবে। তিন পর্বেও কুলোবেনা। তবু সুয়েজ প্রসঙ্গ এলো বৃহত্তম মানবসৃষ্ট ক্যানেল হবার কারণে। এই সুয়েজ খাল নির্মাণের মাত্র কবছর পরই সভ্যতার সূতিকাগার গ্রীস উদ্যোগ নিলো একটি কৃত্রিম খালের। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে গতি আনতে দেশের পূর্ব পশ্চিম বরাবর বাঁধাহীণ নৌপথ চালু করতে। ছোট এ ক্যানেলের গল্পটিও ছোট। তবে ট্র্যাজেডি বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের মতো।

রাজধানী এথেন্সের অবস্থান দেশটির এক পার্শ্বে। পুরো দেশ এর উত্তর দক্ষিন আর পশ্চিম দিকে। পূবে কেবল কয়েকটি দ্বীপ আর উপদ্বীপ। এথেন্স শহরটি আজিয়ান সাগর আর ভূমধ্য সাগরের মাঝখানে সারোনিক উপসাগর পাড়ে। কিন্তু দেশটির মধ্যখানে আরেকটি উপসাগর ঢুকে পড়েছে। এর নাম করিন্থ উপসাগর।

ভূগোল বইয়ে এটি উপসাগর হলেও ইঞ্জিনিয়ারিং ডেফিনেশনে লেক বা হ্রদের মতো মনে হয়। অনেকটা লেক অন্টারিওর মতো। তবে নোনাজলের কারনেই বোধকরি লেক হবার মর্যাদা হারিয়েছে। যদিও অর্থনীতিতে এর তেমন বিরূপ প্রভাব নাই।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই, পূব দিকের ভূমধ্য সাগর আর আজিয়ান সাগর থেকে সারোনিক হয়ে করিন্থ উপসাগরে ঢোকার কোনো জলপথ নাই। মাত্র সাড়ে ছয় কিলোমিটার ভূমি তিস্তার জল ঠেকিয়ে দিয়েছে। মানে সারোনিক উপসাগরের জল ঠেকিয়ে দিয়েছে। গ্রীক মাইমিসিসের মতো এটি তাঁদের প্রাকৃতিক ট্র্যাজেডি।

সারোনিক আর করিন্থ উপসাগরকে সংযুক্ত করার একমাত্র উপায় সুয়েজ খালের মতো একটা কৃত্রিম খাল কাটা। কিন্তু সেজন্য প্রয়োজন ম্যালা টাকা। সুয়েজ চালুর পর গ্রীস সরকার মাথা ঘামাতে শুরু করে। বিজ্ঞান আর দর্শনশাস্ত্রের জ্ঞানরাজ্যে তখন অনেক জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। কিন্তু জ্ঞানীদের যেমন অর্থ থাকেনা, গ্রীসের টাকশাল তখন তেমনই অর্থশূন্য।

অটোম্যান সাম্রাজ্য থেকে ১৮৩০ সালে গ্রীস মুক্তি লাভের পর একবার এই ক্যানেল নিয়ে ভেবেছিলো। এবার সুয়েজ দেখে লাভের আশায় সরকার ১৮৮১ সালে ৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ বরাদ্দ করে। ২৩ এপ্রিল ১৯৮২ সালে গ্রীক রাজা প্রথম জর্জ এর উদ্বোধন করেন।

গরীবের কোরবানীর গরু হারিয়ে গেলে নাকি আরেকটা গরু কিনে কোরবানী দিতে হয়। বড় লোকের দিতে হয়না। এটি গরীবের এক প্রকার শাস্তি। কারণ সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও সে গরু কিনেছিলো কেনো? গ্রীসের অবস্থা এমনই হলো। আট বছর ধুকে ধুকে খনন কর্মসূচী চালানোর পর কন্ট্রাক্টর ব্যাংকক্রাপ্সি করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। দুই হাঙ্গেরিয়ান প্রকৌশলী ইস্তভান তুর এবং বেলা গ্যারেস্তার গ্রীস ছেড়ে চলে গেলেন।

করিন্থ (Corinth) ক্যানেল রাজধানী এথেন্স থেকে ৭৭ কিলোমিটার পশ্চিমে। ৬.৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ক্যানেলটি করিন্থ উপসাগর এবং সারোনিক উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। সুয়েজ ক্যানেলের মতোই এটি কোনো প্রাকৃতিক ক্যানেল নয়। প্রকৌশল বিদ্যা প্রয়োগে মানবসৃষ্ট ক্যানেল। ডিজাইনার ছিলেন দুই হাঙ্গেরিয়ান প্রকৌশলী ইস্তভান তুর এবং বেলা গ্যারেস্তার।

বেকায়দায় এবার গ্রীক রাজা। সভাসদ ডেকে উপায় খুঁজলেন। ভান্ডারে মাল নেই। কিন্তু ক্যানেল নির্মাণ শেষ করতে হবে। সাহায্য করতে কোনো রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি। জটিল অবস্থায় ফেলে পূর্ববর্তী ঠিকাদার বিদেয় নিয়েছে।

প্রকৌশলীরাও নাই। মাটির প্রকৃতি নির্ধারণ করে দুপাড়ের স্লোপের অনুপাত হিসাব করা হয়। সেভাবেই মাটি কাটতে হয়। সেভাবেই দুপাড়ে বাঁধ নির্মাণ করতে হয়। বর্তমান সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ একে স্লোপ স্ট্যাবিলিটি বলে। সেসময় জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জিওহাইড্রোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর একাডেমিক গবেষণা প্রায় আঁতুর ঘরে। মেকানিস্টিক ফরমূলা অপ্রতুল। মাটির গ্রেইন সাইজ এনালাইসিস নাই। এঙ্গেল অব ফ্রিকশন বা এঙ্গেল অব রিপোজ নির্ণয়ের ল্যাবরেটরি নেই। ইমপেরিক্যাল ফরমূলাই ছিলো ডিজাইনের মূল সম্বল। নির্মাণ যন্ত্র ছিলোনা। কায়িক পরিশ্রমে কাজ করতে হতো।

জোড়াতালি দিয়ে কিছুদিন পর ১৮৯০ সালে আবার কাজ শুরু হলো। কিন্তু অপ্রতুল অর্থ এবং উপযুক্ত প্রকৌশল পরামর্শের অভাবে মূল ডিজাইনের মতো হলোনা ক্যানেল। বড় জাহাজ দূরের কথা, মাঝারি আকৃতির লঞ্চও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনা এমন সরু খাল! ১৮৯৩ সালে এভাবে শেষ হলো ক্যানেল নির্মাণ। সর্বোচ্চ মাত্র ৫৮ ফুট চওড়া এবং ২৪ ফুট গভীরতার জাহাজ ওয়ানওয়ে ট্র্যাফিক হিসাবে চলাচল করতে পারে।

অর্থাভাব, ব্যাংক্রাপ্সি এবং কারিগরি জ্ঞানের অভাবে সেই যে থেমে গেলো দুই উপসাগরের সংযোগ, গ্রীকরা আজো তা সংযুক্ত করতে পারেনি। এখনো ভূমধ্য সাগর এবং আজিয়ান সাগর থেকে জাহাজ পূর্বদিক দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে পারেনা।

তবে শত বছরের ট্র্যাজেডির একটা মনভুলানো সান্ত্বনা আছে। প্রতিবছর গ্রীষ্মে লক্ষ পর্যটকের ভিড়ে মুখর থাকে করিন্থ ক্যানেল। ছোট্ট জাহাজ উপচিয়ে রঙবেরঙের মানুষের নির্দোষ আনন্দ মিছিল ভুলিয়ে দেয় এর নির্মাণ ব্যর্থতা।

ট্যুরিজম থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায় হয়। এ দিয়েই এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করা হয়।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent