
আমাদের মফস্বল শহরটা তখনও জনারণ্য হয়ে ওঠেনি। সবাই সবার দাদা বাবাদের চেনে। এক পড়ার মানুষ অন্য পাড়ায় অনায়াসে হেঁটে চলাফেরা করে।বিকেল হলেই টি স্টলে আড্ডা বসে যায়।আমরা হেঁটে হেঁটে স্কুল কলেজে যাই। দুপুরে কারো বাসায় ইলিশ মাছ রান্না হলে তার ঘ্রান ভেসে আসে। পাঁচিলের উপর দিয়ে বা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তরকারীর বাটি আদান প্রদান হয় । রান্না করতে গিয়ে তেল ফুরিয়ে গেলে অনায়াসেই পাশের বাড়ি থেকে আনা যায় । রিক্সা সাইকেল ছাড়া তেমন ভারী জানবাহন চোখেই পরেনা।
আমি তখন সবে বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়া শুরু করে দিয়েছি।দস্যু বনহুর আর ভাল লাগেনা , আর এই সব বইয়ের যোগানদাতা আমার জানের প্রানের বন্ধু সোমা ।সোমাদের বাড়িতে গেলেই আমার মনটা নিমিশেই ভাল হয়ে যায়। আলমারি ভর্তি শুধু বই আর বই ।
ক্লাস নাইনে ওঠার পর সোমা আমাদের স্কুলে এসে ভর্তি হল। লম্বা ছিপছিপে হাসলে গজ দাঁত টা বেড়িয়ে পরে । প্রথম দিন ক্লাসে এসেই বেঞ্চে আমাকে ঠেলে দিয়ে আমার পাশে বসে পরল ।আমি একটু চুপচাপ টাইপের ছোট খাট মানুষ । ও প্রথম দিন ই ক্লাস মাতিয়ে ফেললো । সেদিন আমাদের শামসুন্নাহার আপা ক্লাসে আসেন নি ও স্মার্ট ভাবে সবার সামনে ওর পরিচয় দিল ।আমরা জানলাম ওর বাবা আমাদের স্থানীয় সরকারি কলেজে ফিজিক্সের অধ্যাপক হিসাবে বদলি হয়ে এসেছেন । সব থেকে আনন্দের ব্যাপার আমাদের বাসার গলির শেষ মাথায় সোবহান চাচার নতুন একতলা নারিকেল গাছ ঘেরা ছাদ পিটানো বাসাটা ওরা ভাড়া নিয়েছে ।
এরপর থেকে সোমা আর আমি প্রতিদিন একসাথে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাই । এক সাথে ফিরি ।
ওদের বাড়িতে প্রথম দিন গিয়েই এই বইয়ের সাম্রাজ্য আবিস্কার করি। আমি হলাম বই পোকা । এর পর থেকে আমি ওদের বাড়ি থেকে বই আনি আবার পড়া হলে ফেরত দিয়ে আসি । একদিন আলমারি খুলে বই দেখছি । সোমা মনে হয় চা আনতে গেছে । বলে রাখি এই বাসায় সবাই চা খায় কি সুন্দর সুগন্ধি চা। কি সুন্দর কাপ।আর সাথে ফুলফুল সুগন্ধি বিস্কুট । আমাদের বাসায় চা খাওয়ার চল ছিল না ।আমার আব্বা ছিলেন পোষ্ট মাষ্টার অফিস থেকে ফেরার সময় আব্বা বাজার থেকে চা খেয়ে আসতেন।
সোমা আমদের বাড়িতে এলে আমার লজ্জা লাগত। কি খেতে দেব এই চিন্তায় । ও আমাদের বাড়িতে এলে আম্মা প্রায় সময় চাল ভেজে গুড় আর আমাদের গাছের নারিকেল কোরানো দিয়ে খেতে দিত । সোমা যে কি খুশি হত ! মুঠো ভর্তি করে চালভাজা মুখে পুরতো । আমি লজ্জায় তখন ওর দিকে তাকাতে পারতাম না ।
খুট করে শব্দ করে কেউ ঢুকল । তাকাতেই দেখি ছিপছিপে গড়নের একটা ছেলে। সোমার কাছে শুনেছিলাম ওর বড় ভাই শামিম এর কথা যে এগ্রিকালচার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । সম্ভবত উনি হবেন ।
এই আমার বইয়ের আলমারিতে তুমি কি কর? বলেই তেড়ে এলো আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকি । সেই সময় সোমা চা হাতে এসে হাজির
বড় ভাই শম্পা আমার বন্ধু । এই আলমারিতে আমার ও বই আছে। ও আমার বই পড়বে তুই ভাগ এখান থেকে ।
সেদিনের মত আমি চা খেয়ে চলে আসি তবে সেদিন সাথে বই নিয়ে আসিনা । কয়েকদিন ওদের বাসায় যাই ও না লজ্জায় ।
এক সপ্তাহ পর সোমা স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাকে ওদের বাসায় হাত ধরে টেনে ঢুকায় । ঢুকেই দেখি শামিম ভাই বারান্দায় বসে আছে ।
কিরে তোর বান্দরনি মাইন্ড করছে নাকি ? বলেই হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকে । ( উনি বান্ধবী কে বান্দরনি বলে ক্ষেপাতেন)
বড় ভাই তুই শম্পাকে বান্দরনি বললি কেন ? জানিস ও কত ভাল গান করে। শুনলে ফিট হয়ে পরে যাবি ।
তাই নাকি ? তাহলেত আমি এখানে থাকতে থাকতেই একদিন গান শুনতে হয়।
জ্বি না আমার বন্ধুর গান এমনি এমনি শোনা যাবে না ।ফি লাগবে
যা ভাগ বলে শামিম ভাই আমাদের তাড়িয়ে দেয় ।
সব ঠিক ঠাক ই চলছিল আমি তখন ক্লাস টেনে । একদিন খেয়াল কলাম এই শামিম ভাইয়ের জন্যে আমার মন কেমন করছে অকারনে কান্না আসছে। উনি ছুটিতে কবে আসবেন সেই খবর শোনার জন্যে কান খাড়া করে থাকছি ।শামিম ভাই বাড়িতে আসলেই আমি ছটফট করতাম ওনাকে দেখার জন্যে অথচ উনি আমাকে দেখলেই কি রে সোমার বান্দরনি আজ পর্যন্ত একটা গান ও তো শোনালি না।বলে টিপ্পনি মারতেন ।
আমি সোমা কেউ ই ভাল আঁকতে পারতাম না উনি দারুন সুন্দর করে আমাদের খাদ্য পুস্টির প্রাক্টিক্যাল খাতায় এঁকে দিয়েছিলেন।সেই জন্যে ওনাকে আমাদের বাড়িতে বানানো নারিকেলের নাড়ু ঘুষ দিতে হয়েছিল। আর সোমার থেকে মাথা দলাই মলাই করে নিয়েছিলেন ।
এর মধ্যে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে কিন্তু আমি শামিম ভাইকে বুঝতেই দেইনি আমি তাকে কতটা ভালবাসি।জীবনেও বলতে পারব না।আচ্ছা উনি এমন কেন। কেন বুঝতে পারেন না!
আমরা ততদিনে কলেজে উঠে গেছি।সোমা একদিন একটা ছবি দেখিয়ে বললো শম্পা দেখ এইটা হচ্ছে মিমি আপু বড় ভাইয়ার সাথে এর সম্পর্ক। বড় ভাই একে বিয়ে করবে।এই মাসেই বিয়ে।শুনে আমার বুকের খাঁচাটা ভেঙ্গে আসতে চাইল।আমি কান্না লুকাতে লুকাতে বললাম বাহ দেখতে কি সুন্দর তাইনা রে!
হলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে সব কিছুতেই সোমা আমাকে কাছে রাখলো। জরির ফিতে দিয়ে খাট সাজাতে সাজাতে সোমা আমাকে হটাত জড়িয়ে ধরলো
তুই যে বড় ভাইকে ভালবাসিস তা কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি শম্পা তুই ভাইয়াকে কেন বললি না?
কি হত বল? তার চেয়ে থাকুক সে আমার প্রানের মাঝে।শিশির বিন্দু হয়ে।
আমরা দুই বন্ধু গলা জড়িয়ে কাঁদতে থাকি।
শামিম ভাই বিয়ের পরের দিন ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে ও সোমার বান্দরনি ওর নাম শনপাপড়ি মানে শম্পা। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি । নতুন ভাবি আমাকে কাছে নিয়ে গল্প করলেন।খুব ভাল একজন মানুষ।
শরতের পেজা তুলোর মেঘের মত সময় চলে যায় । ওর বাবার অবসর গ্রহনের পর সোমারা একটা সময় ওদের নিজস্ব বাড়ি ঈশ্বরদীতে চলে যায় ।কিছুদিন আমার সাথে সোমার চিঠিতে যোগাযোগ ছিল । এক সময় বন্ধ হয়ে যায় । আমি একটা এন জি ও তে জয়েন করি । বাড়িতে বলে দিয়েছি বিয়ে করব না । ছোট বোনের বিয়েটা যেন দিয়ে দেয় ।
আসলে শামিম ভাই আমার ভিতরে এমন ভাবে গেঁথে আছে এ কাঁটা কিছুতেই যাবে না ।
সেবার এন জি ওর একটা সেমিনারে রাজশাহী গিয়েছি । একজন কৃষিবিদ আমাদের মাঠ পর্যায়ের উন্নতির ব্যাপারে বক্তব্য দেওয়ার জন্যে মঞ্চে উঠলেন ওনাকে দেখে আমি হার্ট বিট মিস করলাম । মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো শামিম ভাই !তেমনি আছেন এত বছরে কিছুটা মোটা হয়েছেন । উনি মঞ্চ থেকে নামতেই প্রায় ছুটে গেলাম আমাকে দেখেই চিনতে পারলেন ।
কি রে শন পাপড়ি তুই এখানে! ভাল আছিস । ইশ কত বছর পর দেখা ! বলেই শামিম ভাই অবাক হয়ে চীৎকার করে উঠলেন ।
অনুষ্ঠান শেষে
শামিম ভাই প্রায় ধরে বেঁধেই ওনাদের বাড়ি নিয়ে গেলেন । ওনারা বিশাল বাড়ি বানিয়েছেন । চারিদিকে সবুজের সমারোহ কত ফুল ! আমি মুগ্ধ হয়ে প্রজাপতির উড়াউড়ি দেখি । ফুল ছিঁড়ে কানে গুঁজি ।বেলি ফুলের সুবাস নেই ।
আমাকে দেখে খালাম্মা অবাক হয়ে জড়িয়ে ধরলেন । খালু খুব খুশি হলেন । আমি বললাম ভাবি কই ? খালাম্মা আমার কথা শুনে বললেন আগে বস মা । একটু আরাম কর তারপর বলি । এই ফাঁকে খালা সোমাকে টি এন্ড টি ফোনে কল দিয়েছে , ওর শশুর বাড়ি এই শহরেই ।চলে এলো বলে । দুপুরে খেতে খেতেই সোমা হৈ হৈ করে চলে এলো ।খাবার টেবিলেই শুনলাম ভাবীর বাচ্চা হতে গিয়ে মারা যাওয়ার খবর । ওনার প্রচণ্ড হাই প্রেশার ছিল । এক্ল্যাম্পশিয়ায় বাচ্চা মা দুই জনার কাউকেই বাঁচানো যায় নি । আমি খাবার টেবিলেই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম । অনেকেই হয়ত ভাবছেন আমি খুশি হয়েছি সত্যি বলছি প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে আমি খাবার থেকে উঠে পরলাম ।
সেই দিন রাতেই আমার ফিরতি বাস ।
সোমা যখন শুনল আমি বিয়ে করিনি ও প্রচন্ড ভাবে আমাকে অনুরোধ করতে লাগলো । খালাম্মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমি যেন তার এই দুখী ছেলেটার পাশে দাড়াই । আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না । এত দিন যার জন্যে বিয়ে পর্যন্ত করিনি আজ তাকে পেয়েও কেমন বাঁধো বাঁধো লাগছে ।
খালু যখন এসে আমার হাত দুটি ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন আমি শুধু বললাম আব্বা আর আম্মার সাথে কথা বলেন ।
আমার আর সেদিন ফেরা হলনা ।
রাজশাহিতে সেদিন রাতে প্রচণ্ড শীত পরেছে । সোমা আমাকে একটা শাল দিয়ে গেছে কিছুক্ষন আগে । সেই শাল গায়ে জড়িয়ে নিয়েছি । আমি আর শামিম ভাই বারান্দায় পাশাপাশি বসে আছি ।
টুপটুপ করে শিশির পরে গাছ গুলি কেমন ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ।
দূরে থেকে মাইকে নিঝুম ও সন্ধ্যায় গানটা ভেসে আসছে হয়ত কোথাও পিকনিক হচ্ছে ।
আমি নিরবতা ভেংগে কান্নায় বুজে আসা গলায় বলি ”আপনি কি বুঝতে পারতেন যে আমি আপনাকে প্রচণ্ড পছন্দ করতাম ?
হু , বুঝতে পারতাম রে কিন্তু আমি তখন মিমির সাথে জড়িয়ে গেছি
শামিম ভাই কোন দিন আপনাকে আমি মিমি ভাবির কথা জিজ্ঞাসা করব না।রুমের ভিতর বাঁধাই করা ছবিও সরিয়ে ফেলব না।
আমি তোকে অনেক ভালবাসব।কোন কিছু থেকে বঞ্চিত করব না।
প্রতিদিন কিন্তু আমার শাড়ির কুচিতে সেপ্টিপিন লাগিয়ে দিতে হবে।
দেব!
প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে আমাকে একটা করে চিঠি লিখতে হবে ।
আচ্ছা লিখব।
আচ্ছা আমাকে আজ বান্দরনি বলে ডাকলেন না যে !
তুই আমাকে আজ পর্যন্ত একটা গানও শোনালি না অথচ আমি জানি তুই কত ভাল গান গাস ।
বিয়ের পর আমাকে কিন্তু তুই তুই করতে পারবেন না
আমাকে আপনি আর ভাই করে ডাকলে তোর চুল টেনে ছিঁড়ব
আপনার আলমারির সব বই কিন্তু এখন থেকে আমার ।
দিতে পারি এক শর্তে প্রতিদিন গান শোনাতে হবে।
কি রাজি ?
আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলি ।
খোলা বারান্দায় উত্তর দিক থেকে শিরশির করে হিম বাতাস বয়ে আসছে …
আমার নাকের ডগায় জমে যাওয়া বিন্দু বিন্দু ঘামের শিশির বিন্দু শামিম ভাই তার ঈষৎ উষ্ণ আঙ্গুল দিয়ে মুছে দিলেন ।
আমি কি এক ভাল লাগায় কেঁপে উঠি ।
ঠিক সেই সময় এসে গেছি এসে গেছি বলতে বলতে চায়ের ট্রে হাতে সোমা ঘরে ঢুকে পরে….
সব কিছু আমার স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে । আমি হাস্নুহেনার গন্ধ মেখে ভাসতে থাকি স্বপ্নের রাজ্যে ।
