ইটালিয়ান হোটেলে আমার প্রথম খাওয়ার স্মৃতি

আমার খানাখাদ্যের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র

আমার খানাখাদ্যের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। ভোজন রসিক হিশেবে আলাদা একটা পরিচিতি আছে আমার, নিকটজনদের কাছে। কানাডায় আমার প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় বা খাদ্যাভ্যাসে ইটালিয়ান চিজ অথবা পিটজা কিংবা পাস্তা, নিদেনপক্ষে মাস্ট আইটেম হিশেবে ইটালিয়ান একটা ব্রেড থাকবেই। এখানকার শপিংমলগুলোয় অধিকাংশ ফুডকোর্টেই ইটালিয়ান ফুডের একটা না একটা দোকান আছেই। ইটালিয়ান ফুড আমার খুব পছন্দেরও। সাত বছর কানাডায় বন্দি ছটফটানো জীবন যাপন শেষে প্রথম যখন বাংলাদেশে গেলাম, ২০০৮ সালে, সাংবাদিক আবেদ খান আর সানজিদা আখতার দম্পতি গুলশানে ‘বে-লা ইটালিয়া’ নামের একটা ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আপ্যায়ন নিমিত্তে। আমেরিকা, জার্মানি, ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স এবং কানাডার বিবিধ ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ইটালিয়ান হোটেলে যত্তো খাবার খেয়েছি তার মধ্যে সেরা টেস্টি মনে হয়েছে আমার কাছে বাংলাদেশেরটাই। অবশ্য সেটার নাম ‘বে-লা ইটালিয়া’ নয়। সে প্রসঙ্গে আসছি। তার আগে খানিকটা নান্দীপাঠ।

১৯৮২ সালে ভালোবেসে বিয়ে করার অপরাধে সস্ত্রীক ওয়ারির বাড়ি থেকে বিতাড়িত হবার পর মহাখালিতে বন্ধু খোকনদের বাড়িতে শার্লিকে দিন কয়েক থাকার ব্যবস্থা করে একটা সুইটেবল বাড়ি বা বাসা খুঁজছি। সাবলেট হলে ভালো হয়। পরিবারে বাচ্চা-কাচ্চা থাকলে আরো ভালো। তাহলে শার্লি সারাদিন একা থাকবে না, বোরড্‌ হবে না। বাসা খুঁজছি বাসা খুঁজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। প্রিয় ছড়াকার আবদার রশীদের একটা ছড়া আছে বাসা খোঁজা নিয়ে—‘‘প্রথম ব্যক্তিঃ ভালোবাসা পাবে তুমি স্বদেশের বক্ষে/আর ভালোবাসা পাবে মা-বাবার চোক্ষে/ডট ডট ডট ডট বৃক্ষ ও পাহাড়ে/ভালোবাসা পেতে পারো পানীয় ও আহারে। দ্বিতীয় ব্যক্তিঃ আরে বাপু ক্ষ্যামা দেও ওসব তো কাব্য/ ওসব ভাবের কথা পরে আমি ভাববো/আপাতত এশহরে কোনো ভালো পাড়াতে/ ভালো বাসা পাওয়া যাবে কিছু কম ভাড়াতে?’’ আবদার রশীদের ছড়াটা গুণগুণ করতে করতেই বাসা খোঁজা চলছিলো। কিন্তু সুবিধেমতো বাসা পাওয়ার আগে নিজেকেও তো থাকতে হবে কয়েকটা দিন কোথাও না কোথাও! শার্লির তো গতি একটা হয়েছে কিন্তু আমার তো অপার হয়ে বসে আছি ওগো দয়াময় অবস্থা!

- Advertisement -

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি করেন ছড়াকার মসউদ-উশ-শহীদ। আমাকে খুবই পছন্দ করেন। আমি জানি তিনি একা থাকেন ঢাকায়। তাঁর পরিবার পরিজন চট্টগ্রামে। মসউদ ভাইকে বললাম আমার সাময়িক গৃহচ্যুতির কথা। আমার একটা সাময়িক আশ্রয় আইমিন শুধু রাতে ঘুমানোর একটা জায়গা দরকার। মসউদ ভাই বললেন—চিন্তার কিছু নেই। তুমি আমার ওখানে চলে আসতে পারো। কয়েকটা দিনই তো। কষ্ট করে থাকা যাবে। তারপর বাসা ভাড়া পেয়ে গেলে চলে যেও তুমি।

বিকেলে মসউদ ভাইয়ের অফিস ছুটির পর দু’জনে মিলে গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া এলাকার লেপ-তোশকের দোকান থেকে একটা বালিশ কিনলাম, তাঁর পরামর্শে। কারণ তাঁর কোনো এক্সট্রা বালিশ নেই। তারপর সন্ধ্যায় গেলাম তাঁর বাসায়, একসঙ্গে। গোপিবাগ ফার্স্টলেনে ছোট্ট একটা এককক্ষ বিশিষ্ট রুম। এটাকে আসলে একটা গ্যারেজ বলাই ভালো। গ্যারেজটাকে বাড়িঅলা দুজন ব্যাচেলরের কাছে ভাড়া দিয়েছেন বাসা হিশেবে। লাগোয়া একটা স্পেসে ছোট্ট একটা গোসলখানা কাম টয়লেট। মসউদ ভাইয়ের রুমমেটও আমার অনেক চেনাজানা, আগে থেকেই। তাঁর নাম মামুন কায়সার চৌধুরী। আর্টিস্ট। চারুকলার শিক্ষক এখন। তখন, ১৯৮২ সালে তিনি ছাত্র, চারুকলার। মামুন ভাই তাঁদের ডেরায় আমাকে দেখে ভীষণ অবাক হলেন। বুঝলাম তাঁদের দুজনারই কারো কোনো বন্ধুর আগমন ঘটেনা এখানে। খুবই ছোট্ট রুমটা। একেবারে ঠাঁসাঠাঁসি অবস্থা যাকে বলে। দুটি সিঙ্গেল চৌকি ফেলার কারণে জায়গা আরো কমে গেছে। দুজনার দুটি চৌকি ছাড়া এই ঘরের আসবাবপত্রের তালিকায় একটা ছোট্ট টেবিল আর একটিমাত্র চেয়ার। মামুন কায়সার চৌধুরীর একটা মিনি চায়নিজ রেডিও আছে কলাপাতা রঙের। কানের কাছে ধরে ওটা থেকে খবর শোনেন মামুন ভাই। ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে দেখি মামুন ভাই অতিযত্নে বাংলা গান শুনছেন কলকাতার কোনো একটা স্টেশন থেকে। আমাকে ক’দিনের অতিথি হিশেবে পেয়ে মামুন ভাই খুব খুশি। রাতে আমরা কতো যে গল্প করি! সকালে মামুন চলে যান চারুকলায়, ক্লাশে আর মসউদ ভাই অফিসে। তাঁদের দু’জনার কাছে দুটি মাত্র চাবি। সুতরাং আমাকেও চটজলদি ওদের সঙ্গেই বেরিয়ে পড়তে হয়। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যার পর কিংবা রাতে এখানে এসে ঘুমাই। মসউদ ভাইদের সঙ্গে আমার দেখা হয় প্রতিদিন রাতে। তাঁরা দু’জনেই বাইরে খান। ঘরে এমন কি চায়েরও ব্যবস্থা নেই। বিপুল আগ্রহ নিয়ে আমি দু’জন ব্যাচেলরের জীবন দেখি। কতো কষ্ট করেই না টিকে থাকে মানুষ! মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই যে কতোটা জরুরি সেটা সেই প্রথম উপলব্ধি করেছি।

এমনিতে আমার গভীর রাতে ঘুমিয়ে দেরিতে ওঠার অভ্যেস। কিন্তু গোপিবাগের গলিতে আসার পর আমার অভ্যেসের বারোটা বাজলো। এই দুই ব্যাচেলরের সঙ্গেই আমাকে বেরিয়ে পড়তে হয় সকাল সকাল। আমি গোপীবাগের সরু গলি থেকে মতিঝিলের রাস্তায় এসেই হতবাক হয়ে যাই। অজস্র মানুষের পদচারণায় মুখরিত একটা ভোর। এরকম ভোর দূর বা নিকট অতীতে দেখা হয়নি আমার। টিফিন কেরিয়ার হাতে সারি সারি তরুণ-তরুণী দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। ওরা গার্মেন্টস শ্রমিক। গোপীবাগ-মতিঝিল এলাকায় এতো গার্মেন্টস শ্রমিক থাকেন! ওদের পোশাক আশাকে দারিদ্র্যের চিহ্ন থাকলেও চোখে-মুখে একটা দৃঢ়তার উদ্ভাস। সকাল থেকে রাত অব্দি বিরামহীন কাজ করবে ওরা। টিফিন কেরিয়ারে দুপুরের সামান্য খাবার। সামান্য বলি কি করে! এই খাবারটুকু মোটেও সামান্য নয়। রুমাল দিয়ে মোড়ানো বাটির ভেতরে থাকা ওই খাবারটুকুই রাত পর্যন্ত লড়াই করার ফুয়েল ওদের। খাদ্যকে খুব হেলাফেলায় অগুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হিশেবেই দেখতে অভ্যস্ত আমার মধ্যে নতুন একটি উপলব্ধি এলো জীবনের এই সময়টায়।

মানিব্যাগের যৎসামান্য টাকা সকালের ব্রেকফাস্ট, দুপুরের লাঞ্চ আর রাতের ডিনার বাবদ খর্চা হয়ে যাচ্ছে চোখের পলকে! টাকা বাঁচাতে মিতব্যয়ী হই। রিকশায় চড়ি না। বাসে করে মহাখালি যাই শার্লিকে দেখতে। আবার বাসে করে ফিরে আসি গুলিস্তান। তারপর গুলিস্তান থেকে পায়ে হেঁটে গোপীবাগ। মানিব্যাগে টান পড়াতে ক্রমে সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে আমার খাদ্য-তালিকা। দুটো ডালপুরি আর এককাপ চা, চার টাকায় ব্রেকফাস্টের মামলা ডিসমিস। বাড়তি টাকার হ্যাপা থেকে বাঁচতে মাছ-মাংসযোগে ডালে-ভাতে লাঞ্চ করার চাইতে একপ্লেট বিরিয়ানি সাবড়ে দেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ বিবেচনা করে পনেরো টাকায় কেল্লা ফতে। আর সস্তা হোটেলে রাতের ডিনার কতো কমে সারা যায়? সস্তায় ডিনারের ক্ষেত্রে আমার দুটো বিশ্বরেকর্ড আছে। সেগুলো আরেকদিন বলা যাবে। আজ বলি ইটালিয়ান হোটেলে আমার প্রথম খাওয়ার কাহিনি।

সেই সময়, ১৯৮২ সালে, অনটনের ঘোর লাগা এক সন্ধ্যায়, গোপীবাগে মসউদ ভাইয়ের মেস-এ ফেরার আগে গুলিস্তানে বাস থেকে নেমে মানিব্যাগের ক্ষিণদশার কথা ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম অদ্ভুত একটা জায়গায়। গুলিস্তানের ঘিঞ্জি এই জায়গাটায় খোলা রাস্তার ওপর কয়েকটা খাবার দোকান। ওখানে সমানে পেল্লাই সাইজের আটার রুটি সেঁকা হচ্ছে এবং গর্মাগরম সেই আটার রুটি পরিবেশিত হচ্ছে কাস্টমারদের সামনে। দশ ইঞ্চি ইটের একেকটি আসনে একেকজন কাস্টমারের বসার ব্যবস্থা। ভাঙাচোড়া নয় এমন সুন্দর একটা ইটের ওপর আমি বসে পড়লাম। আমাকে দেখে রুটি সেঁকা থামিয়ে মধ্যবয়স্ক দোকানি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—আপ্নে খাইবেন রুটি?

আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম—খাবো। কতো করে বিক্রি করছেন?

–রুটি একট্যাকা আর গুড় আটানা।

–দ্যান আমাকে রুটি আর গুড়। রুটি দুইটা দিয়েন।

দোকানি আমার পোশাক-আশাক এবং চেহারা দেখে খানিকটা বিভ্রান্ত হলেও অচিরেই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। আমাকে বড়লোকের ‘মাথা খারাপ সন্তান’ বিবেচনা করে বাড়তি খাতির বা যত্ন করার চেষ্টা করছেন। সিলভারের প্লেট আর সিলভারের গ্লাস দুটোকে দুবার করে ধুয়ে তারপর আমার সামনে খুব বিনয়ের সঙ্গে পরিবেশন করেছেন গরম ভাঁপ ওটা আটার রুটি এবং একটুকরো আখের গুড় এবং এক গ্লাস পানি। আমার পাশের ইটাসনে বা ইটের সিটে বসা রিকশাঅলা বেচারা সন্দেহের দৃষ্টিতে বারবার আমাকে দেখছে। একটু সরে বসেছে সে। যাতে আমার সঙ্গে ওর গা-লাগালাগি হয়ে না যায়। ওর পরনের মলিন কাপড় থেকে আমার দামি শার্টে কোনো ময়লা লেগে না যায়।

খুব আয়েস করে খাচ্ছি আমি সদ্যসেঁকা গরম রুটি। ফুটপাতের ইটে বসে খাচ্ছি আখের গুড় আর আটার রুটির অপূর্ব কম্বিনেশন। এরকম সুস্বাদু খাবার আমি এই জীবনে খাইনি। দোকানি আমাকে আরেক টুকরো গুড় দিতে চাইলেন। আমি বললাম—না, লাগবে না। খুব মমতা মেশানো কণ্ঠে তিনি বললেন—খান আপ্নে, এইটার দাম দেওন লাগবো না। অনেকটা জোর করেই আমার প্লেটে তিনি তুলে দিলেন ছোট্ট একটুকরো আখের গুড়।

অজানা অচেনা একজন দরিদ্র্যমানুষের কাছ থেকে এরকম অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পেয়ে আমার চোখে পানি এসে যায়। দোকানি সেটা দেখে ফেলবে সেই ভয়ে শার্টের হাতায় চোখ মুছে ফেলি দ্রুত।

ইটের ওপর বসে খেতে হয় বলে ফুটপাতের ওই খাবার হোটেলের নাম ইটালিয়ান হোটেল। এই জীবনে পৃথিবীর বহু ইটালিয়ান হোটেলে আমার খাওয়ার সুযোগ ঘটেছে কিন্তু গুলিস্তানের সেই ইটালিয়ান হোটেলের মতো এতো অসাধারণ খাবার আমি কোথাও খাইনি।

কয়েক বছর পর আবারো এক ঘোর লাগা সন্ধ্যায় হঠাৎ তুমুল হাওয়ার দাপট এবং সেইসঙ্গে ‘কুকুর-বেড়াল বৃষ্টি’তে ভিজতে ভিজতে আমার খুব মনে পড়লো ইটালিয়ান হোটেলের অচেনা সেই রুটি বিক্রেতার কথা। এবং মনে পড়া মাত্র, ঝটিতি নাকে এসে ঝাপটা মেরে বসলো গরম রুটি আর আখের গুড়ের মোহনীয় একটা ঘ্রাণ। তাঁকে একঝলক দেখার জন্যে আমার প্রিয় লাল হোন্ডাটিকে গুলিস্তানমুখী করে ছুটে গিয়েছি গুলিস্তানের সেই স্মৃতিময় জায়গাটিতে। কিন্তু ততোদিনে ওখানকার ইটালিয়ান হোটেলগুলোকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। লোকটার নাম জানি না বলে কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারলাম না কিছু। নিষ্ঠুর শহরে এই ধরণের লড়াকু মানুষগুলো বেঁচে থাকার সংগ্রামে টিকে থাকবার জন্যে অনবরত জীবিকা পালটায়। নগর সভ্যতার উচ্ছেদের কবলে পড়ে কোথায় ভেসে গেছেন তিনি কে জানে!

আজ আবারো খুব মনে পড়ছে আমার সেই দোকানিকে, যিনি পরম মমতায় আমাকে বাড়তি একটুকরো গুড় দিয়ে বলেছিলেন—খান আপ্নে,এইটার দাম দেওন লাগবো না।

খড়কুটোর মতো ভাসতে থাকা আশ্রয়হীন এক ছড়াকারকে সেই সন্ধ্যায় কতো যত্ন করে খাইয়েছিলেন তিনি! সেই একটুকরো গুড়ের ঋণ আমি কী করে মেটাই? মুদ্রিত টাকার অংকে মানুষের ভালোবাসার দাম কোনোদিন পরিশোধ করা যায় না। দরিদ্র সেই রুটি বিক্রেতার কাছে আমি ঋণীই থেকে গেলাম! এক জীবনে সেই ঋণ শোধ করা হবে না আমার…!

- Advertisement -

Read More

Recent