
এই সরকার যদি সেনা সমর্থিত সরকার হয় তবে সেনাপ্রধান কিংবা সেনাবাহিনীর সাথে বিরোধে জড়ানো কতটুকু যুক্তিসম্মত হয়েছে বা হচ্ছে?
সেনা সমর্থিত সরকার থেকে যদি সেনা সমর্থন প্রত্যাহার করা হয় তবে কি এই সরকার শূন্যের উপর ভেসে থাকবে? পায়ের নিচে কি তাদের মাটি থাকবে?
সেনাপ্রধানের সংগে বিরোধে তখনই যাওয়া সম্ভব যখন সেনা সমর্থনের বিপরীতে আরেকটি বিকল্প সমর্থন সৃষ্টি করা সম্ভব হতো!
সেটি অবশ্য এই সরকার করার চেষ্টা করেছিল। সেনাপ্রধানকে পাশ কাটিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি প্যারালাল কমান্ড তৈরি করতে চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, আস্তে আস্তে সেনাপ্রধানকে রিমুভ করে নিজেদের মন মতো কাউকে সেনাপ্রধান করা। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।
সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য সেনাপ্রধান ওয়াকারের প্রতি আস্থা স্থাপন করেছেন বলেই এখনো পর্যন্ত মনে হচ্ছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ সহ আরও কয়েকজন যখন ক্যান্টমেন্ট এবং সেনাপ্রধানকে নিয়ে বিষোদগার করেছিল সেই সময় সেনাপ্রধান ওয়াকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসার্স এড্রেসে বক্তব্য রাখেন।
গত বুধবারের অফিসার্স এড্রেসটিও ছিল আগের যে কোন অফিসার্স এড্রেস থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা সম্বলিত।
এই দুটি অফিসার্স এড্রেসের মাধ্যমে মূলত সেনাপ্রধান ওয়াকার আর্মির মধ্যে তার ক্ষমতা এবং কমান্ডকে আরও সুসংহত করেছেন। তিনি সেনা সদস্যদের পালস বুঝার চেষ্টা করেছেন। তিনি বুঝার চেষ্টা করেছেন, তার কমান্ডে সেনা সদস্যরা ঐক্যবন্ধ কিনা। তার যে কোন কমান্ডে তারা সাড়া দিবেন কিনা। এই পালস রিডিংয়ের কাজ সেনাপ্রধান সম্পন্ন করেছেন।
ছোট-খাটো ফ্র্যাকশন ছাড়া সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য সেনাপ্রধানের উপর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে বলেই প্রতিয়মান হয়। নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী প্রধানও সেনাপ্রধানের প্রতি আস্থাশীল। এর আরেকটি কারন হচ্ছে, সেনাপ্রধান, নৌবাহিনী প্রধান এবং বিমানবাহিনী প্রধান, তিন জনই ১৩ তম লং কোর্সের এবং তিন জনই ব্যাচমেট। তাই এই তিনজনের ঐক্য সুকঠিন।
তাহলে ড.ইউনুস যেটি করতে চেয়েছিলেন বা করতে চাচ্ছেন সেটি কি আর করা সম্ভব হবে?
তিনি করিডর প্রদানের মাধ্যমে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট হতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন আমেরিকার সমর্থন থাকলে সেনাবাহিনীর সমর্থন না থাকলেও চলে কিংবা আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট হয়ে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ন্যায় আমেরিকা সমর্থিত সরকার হতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি সেনাবাহিনীকেও টেক্কা দিয়ে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা ফেঁদেছিলেন কিংবা সেনা সমর্থনের বিপরীতে বিকল্প একটি শক্তির বলয় তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু করিডর কি আসলেই দেওয়া হয়ে গেছে? নাকি এখনো এটি প্রক্রিয়াধীন আছে? নাকি করিডর দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে এসেছে? এই প্রশ্নগুলি এখনো পরিষ্কার নয়।
যদি আমেরিকা এবং জাতিসংঘের চাহিদা মাফিক ইতিমধ্যে করিডর দেওয়া হয়ে থাকে তবে ড.ইউনুসের ইতিমধ্যে একটি বিকল্প ক্ষমতার বলয় সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এই ক্ষমতার বলে অনেক কিছুই করার ক্ষমতা রাখেন।
আর যদি এমন হয় যে, করিডর এখনো দেওয়া হয়নি কিংবা প্রক্রিয়াধীন আছে তবে ড.ইউনুসের অনুকূলে বিকল্প শক্তির বলয় এখনো সৃষ্টি হয়নি।
সেনাপ্রধান ওয়াকার এই বিষয়গুলি সম্পর্কে অবগত। তিনি ড.ইউনুসকে এই শক্তি সঞ্চয় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। কারন, সেনাপ্রধান জানেন, ড.ইউনুস এই শক্তি এবং ক্ষমতা প্রাপ্ত হলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারন এবং এরপরে তাকেও অপসারন করতে কুন্ঠা করবেন না।
ড.ইউনুসের পথে দুটি সাংবিধানিক পদ এখনো বাঁধ হয়ে দন্ডায়মান আছেন। একটি রাষ্ট্রপতি, আর অন্যটি সেনাপ্রধান।
অনেকেই ভাবতে পারেন সেনাপ্রধান ওয়াকার আসলে ড.ইউনুসের পক্ষেই আছেন। তিনি যা কিছু করছেন তা শ্রেফ প্ল্যান মাফিক এক একটি নাটক।
কিন্তু আমার তা মনে হয় না।
ড.ইউনুসের সাথে সেনাপ্রধান ওয়াকারের নানা কারনেই দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে,দ্বন্ধ সৃষ্টি হয়েছে।।
এই দুরত্ব সৃষ্টির কারন সেনাপ্রধান ওয়াকার নন, এই দুরত্ব সৃষ্টির কারন ড.ইউনুসের নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড।
১) সেনাপ্রধান রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নির্বাচন ১৮ মাসের মধ্যে হতে হবে। ড.ইউনুস সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যকে উপেক্ষা করে বলেছিলেন, নির্বাচনের তারিখ দেওয়ার এক্তিয়ার সরকারের। নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারই সিদ্ধান্ত নিবে।
মূলত, সেনাপ্রধান ওয়াকারের সাথে ড.ইউনুসের দুরত্ব সৃষ্টির প্রথম আলামত এখান থেকেই শুরু হয়।
২) এরপর সেনাপ্রধান বিডিআর হত্যা দিবস উপলক্ষে রাওয়া ক্লাবে যে বক্তব্য রাখেন তাও সরকারের খুব একটা মনোপুত হয়নি। বিশেষ করে বিডিআর হত্যাকে তিনি শ্রেফ বিডিআর বিদ্রোহের ফল হিসাবে গন্য করতে চেয়েছেন। যে সব হত্যা হয়েছে তা বিডিআর বিদ্রোহীদের দ্বারাই হয়েছে, এখানে কোন ইফ এন্ড বাট নেই।এমন বক্তব্য সরকার ভালো ভাবে নেয়নি।
এই একই বক্তিতায় সেনাপ্রধান একটি অবাধ,অংশগ্রহণমূলক এবং অর্ন্তভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। সেনাপ্রধানের নির্বাচন নিয়ে করা এই সব বক্তব্যকেও সরকার ভালোভাবে নেয়নি।
৩) সেনাপ্রধান যখন রাশিয়া সফরে ছিলেন সেই সময় ড. খলিলুর রহমানকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি রজার রহমান নামে আমেরিকার নাগরিক হিসাবে ছিলেন। খলিলুর রহমানের এই নিয়োগটিকে সেনাপ্রধান ভালোভাবে নেননি। কারন, তিনি সব সময় সেনাবাহিনীর উপর ওয়াচ ডগের মতো থাকবেন এটি মেনে নেওয়া সেনাপ্রধানের পক্ষে সহজ নয়।
৪) সেনাপ্রধানকে পাশ কাটিয়ে অন্য সেনা সদস্যদের দ্বারা কাজ করানোর চেষ্টা।। করিডর ইস্যুতে সেনাপ্রধানকে পাশ কাটিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে করিডর বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সেনাপ্রধান ওয়াকারকে ক্ষুব্ধ করে থাকতে পারে। তাছাড়া, করিডর দেওয়ার যে কোন উদ্যোগ জাতীয় নিরাপত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত। এমন একটি সিদ্ধান্ত সেনাপ্রধানকে অবহিত না করেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া সেনাপ্রধানের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। জাতীয় নিরাপত্তার রক্ষক তিনি। তাই তাকে না জানিয়ে এমন একটি স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত একটি অনির্বাচিত সরকার নিবে, তা কিভাবে সম্ভব?
৫) এনসিপির সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট এবং সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিল। সেনাপ্রধানের ” রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ” প্রস্তাব,আসিফ মামুদের বক্তব্য, সেনাপ্রধান বুকে পাথর চাঁপা দিয়ে ড.ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে মেনে নিয়েছিলেন, ইত্যাদি সেনাপ্রধান ওয়াকারের সাথে সরকারের দূরত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে।
সর্বশেষ শোনা যাচ্ছে, জুলাই ঘোষণার মাধ্যমে সংবিধানকে কবর দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বিপ্লবী সরকার গঠিত হবে। বিপ্লবী সরকারের রাষ্ট্রপতি হবেন অন্য কেউ। সেনাপ্রধানও বিপ্লবী সরকারের আদেশ বলে অপসারিত হবেন।
এই যদি অবস্থা দাঁড়ায় তবে সেনাবাহিনী এবং সরকার এখন ভয়াবহ confrontation এর মুখোমুখি।
এমন অবস্থায় যে কোন কিছু ঘটে যাতে পারে। কেউ স্পেসিফিকভাবে বলতে পারবে না, এটাই ঘটবে।
স্কারবোরো, কানাডা
