
সময়টা ২০০৭ সাল। সুধীজন পাঠাগারের সদস্য হলাম। জীবনে প্রথম এত বড় পাঠাগার দেখা। সারি সারি বই তাকে সাজানো। কাঠের চেয়ার টেবিলের মাঝে মানি প্লান্টের গাছের সারি। মোজাইক করা মেঝে। সবমিলিয়ে খুব স্নিগ্ধ ও শান্ত একটি পরিবেশ। প্রথম দিন পাঠাগারের সদস্য হলাম ২০০ টাকা দিয়ে। ১ টা করে বই নিতে পারব এবং পনের দিন পর্যন্ত রাখা যাবে। এরপর রাখতে হলে ডেট বাড়িয়ে নিতে হবে অন্যথায় জরিমানা গুণতে হবে। বই পড়ার শখ ছোট বেলা থেকেই তাই এমন বইয়ের রাজ্য পেয়ে কি যে খুশি হয়েছিলাম তা হয়তো বলে বুঝানো যাবে না। লাইব্রেরির পুরনো বইয়ের গন্ধ মনকে উতলা করত। এমন অনেক হয়েছে লাইব্রেরি খোলার আগেই গিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তখনকার লাইব্রেরিয়ান আংকেল এসেই বলতো তোমরা তো খুব মনোযোগী পাঠক। তোমরা বলতে আমি ও আমার দুজন সহপাঠী। তারপর বই দেয়া নেয়া, ফাঁকে সাহিত্য ম্যাগাজিন কালি ও কলম এর পাতায় চোখ বুলানো। পছন্দের লেখা পড়া। কতকিছুই না তখন জানতে পেরেছিলাম। এই পাঠাগারটি ছিল আমার শহরে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সানন্দা পড়তেও ভালো লাগতো। একটা নির্দিষ্ট সময় পাঠাগারে কাটিয়ে বাসায় ফেরার পর মনে হতো ব্যাগে করে বাঁচার রসদ নিয়ে এসেছি।
নতুন নতুন বই পড়ার আনন্দ মনকে বিমোহিত করে রাখতো। সব ধরনের লেখাই পড়তে ভালো লাগতো তবে অন্যরকম চমক কাজ করত জীবনীগ্রন্থ পড়তে গেলে। ম্যাক্সিম গোর্কি থেকে কার্ল মার্ক্স, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আহমদ ছফা,আহমদ শরীফ, হাসান আজিজুল হক, হুমায়ুন আজাদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার আরও অনেকের লেখা এবং আত্মজীবনী ছুঁয়ে যেত মনের ঘর।
এভাবে চলল কয়েকবছর। তারপর ব্যস্ততা বাড়ল, ২০১৪-১৫ প্রায় ১৭ মাস লাইব্রেরিতে যাওয়া হলো না। ঐ সময়টা এমনিতেই খুব খারাপ যাচ্ছিল। নিজের বলতে কোন সময় ছিল না। লাইব্রেরিতে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। তাই মন কেমন করত। অস্থির লাগত। তারপর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আবার যাত্রা শুরু যা এখনও বহমান।
তবে পাঠাগারে এখন আর আগের মতো সেই পরিবেশ নেই। আগে যেমন বিকেল হলেই পত্রিকা পড়তে মাঝবয়সী ব্যক্তিদের আনাগোনা দেখা যেত। অনেক বৃদ্ধ মানুষও বিকেলের সময়টা পাঠাগারে কাটিয়ে যেত এখন সেখানে চাকরির পড়ুয়াদের ভীড়। বই পড়ার পাঠাগারটি কেমন করে যেন চাকরিপ্রার্থীদের পড়াশোনা করার জায়গা হয়ে গেল। এরা সাহিত্যের বই পড়ে না এর ধার মাড়ায় খুব কম মানুষ। এখন পাঠাগারটাকে কেমন যেন কৃত্রিম লাগে। ভালো লাগে না। যুগের সাথে সব পরিবর্তন হবে এটাই স্বাভাবিক তবে সেই পরিবর্তনটা ভালো নাকি খারাপ সেটাই প্রশ্ন।
আজ পাঠাগারে যাওয়ার পর অনেক পুরনো একজন পাঠাগার কমিটির সদস্যের সাথে দেখা। ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলেন কোথায় জব করি। আমি উত্তর দিলাম তারপর তিনি বললেন আপনারা তখন ভার্সিটির বাস থেকে নেমেই পাঠাগারে বই নিতে আসতেন, আমি অবাক হয়ে বললাম সে তো অনেক আগের কথা আপনার এখনও মনে আছে! তিনি হাসলেন। তারপর নাথানিয়েল হথর্ন এর স্কারলেট লেটার বইটা চাইলাম। লাইব্রেরিয়ান ছেলেটি বললো ইংরেজি বইতো উপরের ফ্লোরে আমি বললাম কেন ইংরেজি বই কি কেউ পড়ে না? ছেলেটা বলল সবাই অনুবাদ পড়ে। সদস্য ভদ্রলোক বললেন আপনি লাইব্রেরিয়ান এর সাথে গিয়ে আপনার পছন্দ অনুযায়ী বই নিয়ে আসেন। আমি উপরের ফ্লোরে গেলাম সেল্ফে সারি সারি বই সাজানো। পুরনো নতুন অনেক বই। বইয়ের মিষ্টি গন্ধ! আমি যেন সেই আগের সময়টাতে ফিরে গেলাম। কি ভালো লাগছে। কয়েক মিনিটের জন্য এই ইঁদূর দৌড়ের জীবন ভুলে গেলাম। মন দিয়ে বই খুঁজলাম। কিছু বই নেড়েচেড়ে দেখলাম, মনের ভেতরে যেন শান্ত একটা নদী কুলকুল করে বয়ে গেল। তারপর সেই বইয়ের সুন্দর জগৎ থেকে নিচে নেমে আসলাম। ভদ্রলোক বললেন আমি যেন সবসময় আমার পছন্দ অনুযায়ী বই নিজে পছন্দ করে নিয়ে যাই। এই অনুমতি পেয়ে খুবই খুশি হলাম। কারন লাইব্রেরিয়ানরা তো শুধু নির্বাচিত বই খুঁজে দিবে আর আমি খুঁজতে গেলে অনেক রত্ন পেয়ে যাব। ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে বের হয়ে আসলাম।
আজ প্রায় ১৮ বছর যাবত এই পাঠাগারে আমার যাতায়াত। এর চেয়ে সুন্দর জায়গা, প্রশান্তির জায়গা আমার কাছে আর নেই। অনেক ব্যস্ততা, জীবন যুদ্ধ, বিরক্তি সবকিছুর মাঝে আজকের সন্ধ্যাটা খুব সুন্দর একটা অনুভূতি দিল। মাঝে মাঝে মনে হয় অনেক টাকা দিয়েও একটা সুন্দর মুহূর্ত কেনা যায় না। আর যতই নেটের দুনিয়ায় বাস করি না কেন বইয়ের পাতার আনন্দ সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভদ্রলোক আফসোস করছিলেন এখন বইয়ের পাঠক কমে গেছে।
আসলে বেঁচে থাকাটাই একটা যুদ্ধ এই টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষ আর বইয়ের পেছনে সময় ব্যয় করতে চায় না। ব্যাপারটি সত্য তবে দুঃখের।
