স্থাপত্যে মেরিলিন মনরো

মেরিলিন মনরোর রূপে মুগ্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন

মেরিলিন মনরোর রূপে মুগ্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জন এফ. কেনেডি তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। ষাটের দশকের গোড়ার ঘটনা সেটি। ‘হ্যাপি বার্থডে মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ গান গেয়ে জয় করলেন প্রেসিডেন্টের হৃদয়। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ৪৫তম জন্মদিনে গাওয়া এ গানে উপস্থিত ছিলেন পনেরো হাজার মানুষ। হলিউডের জনাকয়েক সেলিব্রেটি। মূল উদ্দেশ্য ছিলো ডেমোক্রেটিক পার্টির ফান্ডরেইজ। তবে উদ্দেশ্য যাই হোক না কেনো মেরিলিন মনরো আর এফ কেনেডির রসায়ন সেদিন ভালোবাসার কবিতায় রূপ নিয়েছিলো।

জগৎ সেরা সুন্দরী সেদিন সেজেছিলেন অপরূপ সাজে। চৌদ্দশো চল্লিশ ডলার তেত্রিশ সেন্ট দামের পোশাক পড়েছিলেন। শিল্পমূল্যে এ অর্থের বর্তমান বাজারদর লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। চামড়ার সাথে লেগে থাকা টাইট পোশাক। এ পোশাকের নিচে মেরিলিন সেদিন আর কিছু পরিধান করেননি। সৌন্দর্যের প্রতিটি জ্যামিতিক কার্ভ প্রদর্শন করেছিলেন তিনি।

- Advertisement -

মানবীয় শরীরের ভাঁজে যে প্রকৃতি যে সৌন্দর্য দেন করেছে তা বুঝতে শিল্পী হৃদয় লাগে। প্রকৌশলীদের সংস্পর্শে স্থপতিদের শৈল্পিক মন কংক্রিট হয়ে যায়। তবু যাঁর ভেতরে শিল্পী বাস করে তিনি ইট পাথর বালিতেও শিল্প খোঁজেন। এমনই এক স্থাপত্য শিল্পী ইয়ানসং মা। ইয়েল ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট স্থপতি ইয়ানসং মা’এর জন্ম চীনে। বেইজিং ইউনিভার্সিটি অব সিভিল ইন্জিনিয়ারিং এন্ড আর্কিটেকচার থেকে স্নাতক করে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ইয়েল থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ফিরে যান দেশে। পাগলাটে স্বভাবের মা’ নিজেই একটি আর্কিটেকচারাল ফার্ম প্রতিষ্ঠিত করেন। সেটির নাম দেন “এমএডি অফিস”। অর্থাৎ ম্যাড অফিস।

২০০৪ সালে গ্রেটার টরন্টোর মিসিসাগা’র ‘স্কয়ার ওয়ান’ এলাকায় অনিন্দ্য সুন্দর ভবন নির্মাণের জন্য স্থানীয় ডেভেলপার আর্কিটেক্ট খুঁজছিলেন। এজন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ডেভেলপার কনসোর্টিয়াম সিটি সেন্টার ডেভেলপমেন্ট। ম্যাড সত্যিই ম্যাড হয়ে ওঠে এ বিজ্ঞাপন দেখে। অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপত্য প্রদর্শনের এমন মওকা খুব একটা মেলেনা। ইয়ংসং মা’র কল্পনায় ভেসে ওঠে মেরিলিন মনরোর অতিমানবীয় শারীরিক সৌন্দর্যের জ্যামিতিক বক্রতা। গ্রীক প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি মর্তে এসেছিলো মেরিলিন মনরো রূপে। দেবী রূপের মডেল তৈরী করে আর্কিটেকচারাল কম্পিটিশনে নাম পাঠালো চাইনিজ যুবক মা।

ব্যাস… চোখ ধাঁধিয়ে যায় ডেভেলপারদের। মেরিলিন মনরো দাঁড়িয়ে থাকবেন স্কয়ার ওয়ানের ওপেন স্কয়ারে। এরচে’ বড় শিল্পের প্রদর্শন আর কি হতে পারে? সর্ব সম্মতিক্রমে ইয়ংসং মা’র মডেল গৃহীত হয়। গল্পের বাকী অংশ চীনদেশে নয়, পুরোটাই কানাডায়!

এতোবড় ভবন….. তাও আবার দুটো নির্মাণ করতে হবে। ম্যাড নতুন প্রতিষ্ঠান। ভীষণ ট্যালেন্টেড। কিন্তু প্রজেক্ট ডিটেইল করার অভিজ্ঞতা নাই। তাই টরন্টো সফরে এসে মা পার্টনার খুঁজতে লাগলো। হটাৎ দেখা হলো আরেক জিনিয়াস আর্কিটেক্ট এটিলা বুরকা’র সাথে। মিসিসাগাতেই অফিস। বয়স হয়েছে। বুড়ো হয়ে গেছেন। আর তাতেই সুবিধা হলো মা’র। মেরিলিন মনরোকে এটিলা যৌবনে দেখেছেন। তাঁদের প্রজন্মের স্বপ্নের নায়িকা।

ইয়াংম্যান ইয়ংসং এর প্রস্তাব পেয়ে বুড়োর আনন্দ আর ধরেনা। বাণিজ্যিক লাভক্ষতির হিসাব দরকার নেই। প্রফেশনাল ফি একটা কিছু পেলেই হবে। আগে স্বপ্ন নায়িকাকে অফিসের পাশে স্থায়ীভাবে দাঁড় করানো দরকার। এটিলা বুরকার ডিজাইন ফার্ম স্কয়ার ওয়ান থেকে খুব একটা দূরে নয়।

এবার চুক্তির পালা। ইয়ংসং মা, এটিলা বুরকা আর সিটি সেন্টার ডেভেলপমেন্ট কনসোর্টিয়ামের পক্ষে টরেন্টোর বিখ্যাত ডেভেলপার ফার্নব্রুক কর্পোরেশনের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। এটিলা দেবীর জ্যামিতিক ভাঁজ আঁকতে থাকে। দেবীর শরীরের ভেতর অসংখ্য এপার্টমেন্ট নির্মিত হবে। নিচে অনেকগুলো বেজমেন্ট হবে। এগুলোর কাঠামো তৈরীর জন্য শক্তিশালী স্ট্রাকচার দরকার। শক্তিশালী ফাউন্ডেশন দরকার। এগুলো প্রকৌশলীদের কাজ। তাঁরাই লোড ক্যালকুলেশন করে কাঠামো নির্ধারণ করবে। ভবনের ওজন বহন করতে সক্ষম এমন ফাউন্ডেশন নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা করবে। এমন কার্ভেচারওয়ালা ভবনের জন্য এতোসব ক্যালকুলেশন অত্যন্ত দুরূহ কাজ? কাগজে আঁকা সোজা কিন্তু বাস্তবে রূপ দেয়া অনেক কঠিন। প্রকৌশলীরা পারবেতো?

মেরিলিনের ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে স্থায়ী রূপ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন এ্যাটিলা। যে করেই হোক একটি দক্ষ প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পেতেই হবে। সৌভাগ্যবশত পেয়েও গেলেন। টরন্টোর নামকরা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্ট সিগমন্ড সুড্যাক এন্ড এসোসিয়েটস। এবার সত্যিই মিসিসাগার স্কয়ারওয়ানে যৌবনে দেখা নান্দনিক রূপের মাধুর্য তুলে ধরবেন। মানবীয় শরীরের কল্লোলিত ঢেউ হুরঅন্টারিও সড়ক দিয়ে সাগরসম লেক অন্টারিওতে প্রবাহিত করবেন। আর প্রকৌশলী সিগমন্ড প্রতিজ্ঞা করলেন ঢেউয়ের নন্দনতত্ত্ব তিনি উপস্থাপন করবেন প্রস্তাবিত ভবনের ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্রাকচারে।

সিগমন্ড ঠিকঠাক ডিজাইন করে দিলেন ৫৮৯ ফুট আর ৫২৯ ফুট উচ্চতার দুটি ট্যুইস্টিং টাওয়ার। একটি ৫৬ তলা, অন্যটি ৫০ তলা। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে টপ ফ্লোর পর্যন্ত ট্যুইস্ট করা হয়েছে ২০৯ ডিগ্রী এ্যাঙ্গেলে। মাটির তলায় ৬টি বেইজমেন্টে ৬ তলা বিশিষ্ট পার্কিং লট। উপরে ছাপান্ন এবং পঞ্চাশ ফ্লোরের লাক্সারী এপার্টমেন্ট।

ডিজাইন অনুযায়ী প্রধান কন্ট্রাক্টর ডোমিনাস কনস্ট্রাকশন গ্ৰুপ কাজ শুরু করলো ২০০৭ সালে। গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের পাঁচ বছর পর মেরিলিন মনরো দাঁড়িয়ে পড়েন ইস্পাত আর কংক্রীটের ওপর। ২০১২ সালে শেষ হয় নির্মান। পরে এর বাণিজ্যিক নাম দেয়া হলো ড্যান্সিং কুইন। তবে রেসিডেন্টদের কাছে হস্তান্তরের পর ভবনের চূড়ান্ত নাম দেয়া হয় এ্যাবসলিউট ওয়ার্ল্ড। কেনোনা এটি এ্যাবসলিউট রোডের উপর অবস্থিত।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent