
২০১২-র ৯ ডিসেম্বর বিরোধীদলের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় পুরনো ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কের কাছে বিশ্বজিৎ দাস নামের একজন নিরিহ পথচারীকে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এবং রড ও লাঠি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাতে রক্তাক্ত করে হত্যা করেছিলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্রনামধারী এবং ছাত্রলীগপরিচয়ধারী একদল হিংস্র হায়েনা। অনেকগুলো টিভি চ্যানেলের ভিডিও ক্যামেরা এবং সংবাদপত্রের ফটোসাংবাদিকের স্টিল ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিলো। সারাদিনব্যাপি সেই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ছবি প্রচারিত হচ্ছিলো প্রতিটি টিভি চ্যানেলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর সেই ঘটনার পর ফার্স্ট টিভি এপিয়ারেন্সে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দেশের মানুষকে বিস্মিত করে বলেছিলেন—ওরা ছাত্রলীগের কেউ না। পরদিন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া সবার বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করেছিলো মিডিয়াগুলো। ওখানে সন্দেহাতীতভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলো ছাত্রলীগের সঙ্গে ওদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি। এতো এতো ছবি এতো এতো তথ্য দেশবাসী দেখতে পাচ্ছিলো টিভি আর পত্রিকার পাতায় কিন্তু পুলিশ খুনীদের বারবার ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ বলতেই আগ্রহী ছিলো অতিমাত্রায়। মিডিয়ার ব্যাপক তৎপরতার কারণে পুলিশ অবশেষে খুনীদের আটক করতে বাধ্য হয় এক পর্যায়ে। বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে থাকে তারপরেও। আওয়ামী লীগের বাকোয়াজমাস্টার হানিফ এই ঘটনার দায় পার্টি নেবে না বলে টিভি সাংবাদিককের জানিয়ে দেন। বিশ্বজিতের লাশের সুরতহালে চাপাতির আঘাতের কথা উল্লেখ থাকলেও ময়নাতদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত অমানুষটি বিশ্বজিতের শরীরে চাপাতির আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখতে পায় না। কিন্তু খুনীদের বাঁচানোর সকল প্রচেষ্টা একের পর এক ব্যর্থ হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন—অপরাধীর শাস্তি হবে। এক বছরের মাথায় বিশ্বজিৎ হত্যামামলার রায় হলো গতকাল। রায়ে ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। শেষপর্যন্ত ঘৃণ্য এই কয়জন খুনীর পক্ষে আওয়ামী লীগ সরকার অবস্থান নেয়নি। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থন তাতে আকাশ্চুম্বি হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে অভিবাদন। ধন্যবাদ বিচার বিভাগ। রায় কার্যকর হোক। আশা করছি উচ্চ আদালতেও সুবিচার পাবে বিশ্বজিৎ নামের নির্দোষ হতভাগ্য দর্জি ছেলেটি। আশা করছি মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ খুনীদের পক্ষে তাঁর মহামূল্যবান অটোগ্রাফটি দেবেন না।
দুই।।
২০১২-র ৯ ডিসেম্বর টিভিতে বিশ্বজিতকে হত্যার দৃশ্য দেখে অদ্ভুত একটা বিষণ্ণ ও বিপন্ন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। সারারাত ঘুমুতে পারিনি। বিশ্বজিতের বয়েসী আমার ভাস্তেটা বারবার ওর জায়গায় প্রতিস্থাপিত হচ্ছিলো। ভাস্তে আমাকে ‘টিভিচাচ্চু’ বলে ডাকে। চোখ বুজলেই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আমার প্রিয় ভাস্তেটা রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে ‘টিভিচাচ্চু টিভিচাচ্চু’ বলে চিৎকার করতে করতে ছুটছে একটু নিরাপত্তার খোঁজে। নিঃশব্দে কেঁদেছি ছেলেটার জন্যে—আহারে! বুকভাঙা বেদনার অশ্রুতে ভাসতে ভাসতে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম–
‘‘মধ্যবিত্ত মানসিকতা প্রসূত প্রতিক্রিয়া
বিশ্বজিৎ নামের রক্তাক্ত ছেলেটার জন্যে আমার খারাপ লাগছে কেনো? প্রথমত ও গরিব, একটা সামান্য দর্জি। ওকে তো মারাই যায়! দ্বিতীয়ত সে হিন্দু, সংখ্যালঘু। ওকে তো মারতেই হবে! তৃতীয়ত মির্জা ফখরুলের দাবি সে তাদের দল বিএনপির কর্মী। তাহলে তো ঠিকই আছে! চতুর্থত তাকে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের ছেলেরা। এরপরে তো আর কথা থাকে না। পঞ্চমত কাজটি কারা করেছে পুলিশ সেটা জানে না। তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেলো! আমার তো খারাপ লাগা উচিতই না! কিন্তু তবুও খারাপ লাগছে। সবগুলো টিভি চ্যানেলে বিশ্বজিতকে খুনের দৃশ্য সম্প্রচারিত হচ্ছে। সব কটা পত্রিকার ফ্রন্ট পেজে ওর রঙিন ছবি। ইন্টারনেট-ফেসবুক ওর ছবিতে ছবিতে সয়লাব। এগুলো না দেখেই এভাবে হুট করে মরে যাওয়াটা ঠিক হয়নি বিশ্বজিতের। ছেলেটা নিজের এইরকম একটা ম্যাসিভ মিডিয়া কভারেজ না দেখে মরে গেছে বলেই আমার খারাপ লাগছে। নাথিং এলস্…
১০ ডিসেম্বর ২০১২’’
তিন।।
এরপর কী যে হলো আমার! আমি ঘুমুতে পারি না। কিছু খেতে পারি না। বিশ্বজিৎ নামের অসহায় ছেলেটার রক্তাক্ত শরীরে দৌড়ুতে থাকার দৃশ্যটা আমাকে তাড়া করে ফেরে। পরদিন ১১ ডিসেম্বর একটা অসমাপ্ত ছড়া লিখেছিলাম বিশ্বজিতকে নিয়ে। এমনিতে ছড়া লিখতে আমার সময় লাগেনা খুব একটা। কিন্তু বিশ্বজিতের ছড়াটা শেষ করতে পারি না। বিশ্বজিতের লাশের ‘চাপাতির আঘাতহীন’ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হলে এক ঝটকায় সমাপ্ত হয় ছড়াটা। ‘বিশ্বজিতের জন্যে শোকাঞ্জলি’ শিরোনামে ছড়াটি আমি উৎসর্গ করেছিলাম মখা আলমগীরকে। ২০১৩-র একুশের বইমেলায় অনন্যা থেকে প্রকাশিত আমার রাজনৈতিক ছড়ার বই ‘ভোলামন পিড়িং পিড়িং’-এ মুদ্রিত হয়েছে ছড়াটি–
‘‘বিশ্বজিতের জন্যে শোকাঞ্জলি
(উৎসর্গ/মহিউদ্দিন খান আলমগীর, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)
(রাজনীতিবিদ ঈশ্বর আজ সবই তাদের মর্জি)
অবরোধে মারা গেছে সামান্য এক দর্জি—
গরিব ছেলে, তার উপরে সংখ্যালঘু, হিন্দু
রক্ত না হয় ঝড়ল খানিক, কয়েক ফোঁটা বিন্দু…
দূর-অতীতে রড দিয়ে কী আঘাত করা হয়নি?
তখন তো ভাই প্রতিবাদের এমন তুফান বয়নি!
চাপাতি কী নতুন কিছু? মোটেও তা নয়, তাইলে—
সক্কলে ক্যান প্রতিবাদের বিষাদগীতি গাইলে?
ভবিষ্যতে এই ছেলে কী বিরাট কিছু হইত?
পত্রিকা আর টিভিতে কেউ তার কথা কী কইত?
বিশ্বজিতের কথাই বলছি, হিন্দু ছেলে বিশ্ব
নিঃশ্ব ছিল, ছিল না সে কোনো দলের শিষ্য।
কিন্তু যারা মারল তাকে তারা তো নয় ফ্যালনা
তাদের হাতে চাপাতি-রড এ তো নিছক খেলনা!
তারা তো নয় দর্জি-ফর্জি হেলাফেলার পাত্র
তারা সবাই শিক্ষিত আর ভার্সিটিরই ছাত্র!
ভবিষ্যতে তারাই দেশের হালটা জানি ধরবে
নানান প্রকার মিনিস্ট্রিতে চাকরি ওরা করবে।
কেউ বা হবে সেনা নায়ক কেউবা হবে আমলা
আইনজীবীও হবে ডিফেন্ড করতে খুনীর মামলা।
কেউ বা হবে পুলিশকর্তা এমপি কিংবা মন্ত্রী
নিন্দা ওদের করছে তারাই— যারাই ষড়যন্ত্রী।
ভাইবা দেখেন—তাই তো!
বিশ্বজিতের তেমন কোনো সম্ভাবনাই নাই তো!
দেখছনি ভাই কারবারটা? মিডিয়া কী করল?
খেয়ে দেয়ে কাজ নাই তাই এইটা নিয়েই পড়ল!
সামান্য এক দর্জি নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নাই
দুনিয়াতে এমনতর অকর্মন্য দেশ নাই!
এই লেখাটা বিশ্বজিতের জন্যে আমার শোক না
আমি চাইছি আজাইরা এই প্যাঁচালটা শেষ হোক না।
ভাল্লাগে না ফালতু একটা ছেলের জন্যে কান্না
ফেসবুকেও মাতম, ভাইরা অন্য কিছু পান না?
হাদীস-আয়াত অভাব তো নাই স্ট্যাটাস মারেন—হেঁইও
বিশ্ব কোথায়! দুদিন বাদেই দেখবেন আর নেই ও…
বিশ্বজিতের নাম-চেহারা দুদিন পরেই ভুলব
ফেসবুকেও আলোচনার নতুন ইস্যু খুলব।
বিশ্বজিতের জন্যে কেবল দুখিনি মা কাঁদবে
ভুল করে মা ছেলের জন্যে ডালের বড়া রাঁধবে…
কিন্তু ছেলে আসবে না আর, পেরিয়ে যাবে সন্ধ্যা
রাত পেরোবে, শুকিয়ে যাবে সব রজনীগন্ধা…
ছেলের জন্যে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জ্যোতি কমবে
দীর্ঘশ্বাসের অভিশাপের পাহাড় জানি জমবে।
মায়ের অশ্রু মুছিয়ে দিতে কেউ যাবে না, হায় রে
পার্টি-নেতা কিংবা রাষ্ট্র কেউ নেবে না দায় রে!
রাষ্ট্র যখন রক্ষা করে মানুষরূপী হায়না—
‘দৃশ্য’ তখন অজ্ঞাত হয় পুলিশ প্রমাণ পায় না।
মানবতা তখন কাঁদে আদালতের বাইরে
এমন দেশটি কোত্থাও নাই, কোত্থাও নাই, নাই রে!
হাসপাতালে চিকিৎসাহীন বিশ্বজিতের শয্যা
সভ্যতা মুখ লুকিয়ে রাখে, সভ্যতা পায় লজ্জা!
পোস্টমর্টেম। গালভরা নাম। তদন্ত হয়—ময়না
কিন্তু সেথায় রিপোর্টদাতা সত্যি কথা কয় না।
বিশ্বজিতকে কুপিয়েছিল ছাত্র নামের হায়না
রিপোর্ট লেখক কোপের কোনো চিহ্ন খুঁজে পায় না!
সুরতহালে কোপটা ছিল ময়নাতে আর নাই গো
টিভির ফুটেজ-নিউজ-ফটোর মূল্য কোথায় পাই গো!
কোটি মানুষ যা দেখেছে সেই দেখাটা ঠিক না
সাংবাদিকরা প্রমাণসহ যতোই বয়ান দিক না…
মোটেও কাতর হয় না তাতে মন্ত্রী মশাইর চিত্ত
শ্বাপদগুলো আপদ হয়েই বিরাজ করে নিত্য…
রাজনীতিতে লাশ প্রয়োজন নেতারা লাশ পাচ্ছে
বিশ্বজিৎরা সস্তা লাশের যোগান দিয়ে যাচ্ছে!
১১ ডিসেম্বর ২০১২’’
চার।।
আজ, বিশ্বজিৎ হত্যামামলার রায় প্রকাশের খবরটি দেখার পর ছড়াটির দ্বিতীয় অংশ রচনা করলাম–
অমানবিক নিষ্ঠুরতার প্রতীক বিশ্বজিৎ
লুৎফর রহমান রিটন
এক বছরের মাথায় পেলাম আদালতের রায়টা
আওয়ামী লীগ শোধ করেছে সুবিচারের দায়টা।
আটটা খুনীর ফাঁসির আদেশ! বিরলতম দৃশ্য
ক্ষমাপ্রার্থী তোর কাছে ভাই–ও বিশ্বজিৎ বিশ্ব…
চোখ বুজলেই আজও দেখি তোর সে বাঁচার তৃষ্ণা
হতভাগ্য ভাইটি আমার! আর অভিশাপ দিস্ না!
এমন ভয়াল নিষ্ঠুরতা বসুন্ধরার সয়না
বাবা মায়ের ময়না পাখি লক্ষ্মীজাদু ময়না—
স্বল্পকালীন একজীবনে চরম ব্যথা সইলি
অমানবিক নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে রইলি!
তোর সামনে যাই হয়ে যাই তুচ্ছমানব তুচ্ছ
তোর জন্যে এই পৃথিবীর সকল আদরগুচ্ছ…
অটোয়া, কানাডা
