
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর যতগুলি আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, সবগুলিই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
সব দলের রূপরেখার ভিত্তিতে স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, কিন্তু এরশাদের পতনের পর ক্ষমতাসীনরা নব্বইয়ের রূপরেখা বাস্তবায়ন করেনি। তারাও স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালিয়েছে।
এরপর ১৯৯৬ সালে তীব্র গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এর উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু ২০০৬ সালে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর হয়নি। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নানা রকম টালবাহানার কারণে সেনা-সমর্থিত ১/১১ সরকারের আবির্ভাব ঘটে।
১/১১ সরকার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ প্রয়োগ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীন সরকার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। তারা রেডিও, টিভির স্বায়ত্তশাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রস্তাব প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার এসে সেই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
১/১১-এর সরকার সামান্য কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছাড়া ভালোই দেশ চালিয়েছিল। তাদের দুই বছরে দেশের আইনশৃঙ্খলা যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ছিল। ভোটার আইডি ও এনআইডি কার্ড ১/১১ সরকারের অন্যতম বড় অর্জন, যা আজও মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।
‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ যদিও জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না, তথাপি অনেকের মধ্যে একটি সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল যে দুই নেত্রীকে মাইনাস করে নতুন একটি ধারার সূচনা করা সম্ভব হবে। সেটি করতে গিয়ে ১/১১-এর ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীন সরকার ব্যর্থ হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকার তাদের শাসনামলে মারাত্মক যে ভুলটি করেছিল তা হচ্ছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংসদের মাধ্যমে এবং দলীয় প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে বাতিল করে দেওয়া।
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে যে সফল আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, তা নিজেরাই বাতিল করে দিয়ে ক্ষমতাকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছিল।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর যতগুলি আন্দোলন হয়েছে, সবই মূলত ব্যর্থ হয়েছে।
এই ব্যর্থতার তালিকা দীর্ঘ—
১) এরশাদের পতনের পর নব্বইয়ের সর্বদলীয় রূপরেখা বাস্তবায়ন না হওয়া।
২) ১৯৯৬ সালে গণ-আন্দোলনে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুটি সফল এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার পর ২০০৬ সালে এসে জটিলতায় পড়া এবং ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক তা বাতিল করে দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—উভয় দলেরই গাফিলতি ছিল।
দুই দলই এ ক্ষেত্রে ভুল করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০০৬ সালে যদি বিএনপি ছলচাতুরী না করে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতো, তবে ১/১১-এর উদ্ভব হতো না। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি হেরে গেলেও আবার পাঁচ বছর পর ক্ষমতায় আসার সুযোগ ছিল।
ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বাসনা থেকেই বিএনপি ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর হতে দেয়নি, যার ফলেই ১/১১ ঘটে। ফলে বিএনপি সেই ২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়ে আজ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেনি।
১৫–১৬ বছর দীর্ঘ সময়— অথচ বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে পাঁচ বছর পরেই ক্ষমতায় আসার সুযোগ ছিল। সেই পাঁচ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা মেনে না নেওয়ার মাশুল তাদেরকে দীর্ঘ ১৫ বছর পরও দিয়ে যেতে হচ্ছে।
একই ভুল আওয়ামী লীগও করেছে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল না করে এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারতো এবং এটিকে আরও যুগোপযোগী করতে পারতো। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল থাকলে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও পাঁচ বছর পর আবার ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেত।
কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ যেভাবে বিদায় নিয়েছে, তাতে দলটি কবে ফিরে আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং কেউ সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবে না দলটির কবে প্রত্যাবর্তন ঘটবে।
দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পর যতগুলি আন্দোলন কিংবা অভ্যুত্থান হয়েছে, কোনটিই তার সফল লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
এই ব্যর্থতাগুলো রাজনীতিবিদদের। স্বাধীনতার পর অধিকাংশ আন্দোলনই হয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঘিরে।
তাই এটি বললে ভুল হবে না, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সুষ্ঠু করতে পারলে অধিকাংশ সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়।
কিন্তু এখনো রাজনীতিবিদদের মানসিকতায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই পুরোনো ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার মানসিকতা এখনো অটুট আছে। যে দলই ক্ষমতাসীন হয়, সেই দলই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করে।
তাদের মানসিকতায় হার মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি অনুপস্থিত।
বাংলাদেশে হার-জিত মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি যতদিন পরিবর্তন না হবে, ততদিন স্বৈরাচার আসবে, ফ্যাসিবাদ আসবে।
এই সবের পথ রোধ করার উপায় হচ্ছে—হেরে যাওয়াকে মেনে নেওয়া আর জয়ীকে অভিনন্দন জানানো। যতদিন রাজনীতিবিদদের মানসিকতায় এই পরিবর্তন সূচিত না হবে, ততদিন ভালো কিছু হবে না।
উন্নত ও সভ্য দেশে এই সংস্কৃতি আছে বলেই নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ হয় না।
সে যাই হোক, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন—সেটি গণ-অভ্যুত্থান হোক, বিপ্লবী হোক কিংবা সুচিন্তিতভাবে পরিকল্পিত হোক—এর মধ্যেও কিন্তু জনগণের বেশ কিছু প্রত্যাশা ছিল।
জনগণ চেয়েছিল, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্র একটি নতুন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পর একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ একটি নির্বাচিত সরকার পাবে। নির্বাচিত সরকার এসে সংস্কারগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যাতে আর কোনো স্বৈরাচারের আবির্ভাব না ঘটে।
এই যে জনগণের প্রত্যাশা এবং স্বপ্ন—এবারও কি তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে?
এক্ষেত্রে হুমায়ূন আজাদের একটি উক্তি মনে পড়ে গেলো:
“বাঙালী আন্দোলন করে, সাধারণত: ব্যর্থ হয়। কখনো কখনো সফল হয়; সফল হওয়ার পর বাঙালীর মনে থাকেনা কেন তারা আন্দোলন করেছিলো”
স্কারবোরো, কানাডা
