শিনকানসেন গপ্পো

আঠারো বছর আগের কথা সদ্য জাপান গিয়েছি রোববার বিকেলে থাই এয়ারওয়েজ নামিয়ে দিলো নাগোয়া এয়ারপোর্টে

কিছু বুঝে ওঠার আগেই কানে তালে লেগে গেলো। হেলুনি দোলুনি ঝাঁকুনি কোনোটাই টের পাচ্ছিনা। অথচ কানের ভেতর কে যেনো পর্দা টেনে দিয়েছে। পাশের সিটে আফজাল ভাই কথা বলছেন। মনে হচ্ছে দূর থেকে কেউ চিৎকার করে কিছু বলার চেষ্টা করছে। আমি বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছি। শেষে তর্জনি উঠিয়ে নিজের ডান কানের ফুটো ইংগিত করলেন। বুঝলাম তাঁর কানেও তালা লেগেছে। যান্ত্রিক গতি শুন্য থেকে এক পলকে দুইশো আশি হলে যা হয়। দুজনের কারো বাপ দাদাইতো আর বুলেট ট্রেনে ওঠেনি!

আঠারো বছর আগের কথা। সদ্য জাপান গিয়েছি। রোববার বিকেলে থাই এয়ারওয়েজ নামিয়ে দিলো নাগোয়া এয়ারপোর্টে। ট্রেনিং একাডেমির বাস ডর্মে পৌঁছতেই সুর্যোদয়ের দেশটিতে সুর্যাস্ত হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় ডর্মের লবিতে ট্রেনিং কোঅর্ডিনেটর তাকাহাশি ফুল হাতে অভ্যর্থনা জানালেন।

- Advertisement -

জীবনে প্রথম সত্যিকার জাপানি ফুলের তোড়া ইকেবানা দেখলাম। এতোটা আশা করিনি। গরীব দেশের ছাত্র আমরা। খয়রাতি সাহায্যের সিংহভাগ টাকাই আসে এই জাপান থেকে। তাঁরা এভাবে ফুল হাতে অপেক্ষা করবে…. আগে ভাবিনি।

চব্বিশজন প্রকৌশলী পনেরোটি দেশ থেকে আসা। এককভাবে ইরানের সর্বোচ্চ চারজন। ব্রাজিল এবং ভারত থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি। বাংলাদেশ থেকে আমি আর আফজাল ভাই। জাপান সরকারের ছোট্ট স্কলারশীপ প্রোগ্রাম। লিডারশীপ ডেভেলপমেন্ট ফর ইঞ্জিনিয়ার্স। মনে আছে, রোববার সন্ধ্যায় আমরা ডর্মে পৌঁছি। পরদিন সকাল ন’টায় ক্লাস শুরু। ডর্মের সাথে লাগোয়া বিশাল হলঘরে ক্লাস। সারি সারি কম্পিউটার দিয়ে সাজানো ডেস্ক আর চেয়ার। জীবনে প্রথম দেখা ডিজিটাল ক্লাসরুম।

নাগোয়ার কোল ঘেঁষে ছিমছাম ছোট্ট শহর টয়োটা সিটি। টয়োটা গ্রুপের বিশাল কয়েকটি প্লান্ট আছে এখানে। একসময় দরিদ্র অবহেলিত গ্রাম ছিলো এটি। করোমা (করোনা নয়) নামের গ্রামটিতে কৃষি ছাড়া অন্য কোনো অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ছিলোনা। এখন অসংখ্য সুদৃশ্য গাড়ি নির্মান কারখানা। দূষণমুক্ত নির্মল পরিচ্ছন্ন শিল্প শহর। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাজ্যের ডেট্রোয়েট নগরীকে এর সিস্টার সিটি বলা হয়। কারণ বেশ সঙ্গত। দুটি শহরই গর্ভ থেকে কেবল গাড়ি প্রসব করে।

ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে শুরু করলাম। বলছিলাম বুলেট ট্রেনের কথা। চলে এলাম অটোমোবাইলে। আসলে আমার আর কি দোষ? জাপান শুনলেই চোখে ভাসে টয়োটা, হোন্ডা, নিসান, মিৎসুবিশি। দেশে এগুলোই দেখে এসেছি। বুলেট ট্রেনের নাম শুনলেও চোখেতো আর দেখিনি!!

বুলেট ট্রেনকে জাপানি ভাষায় বলে শিনকানসেন। ক্লাস শুরুর দ্বিতীয় সপ্তায় মিললো এর দেখা। লিডারশীপ ট্রেনিংএর প্রথম শিক্ষা সফর। গন্তব্য জাপানের প্রাচীন নগরী কিয়োটো। ইতিহাস বলে ৭৯৪ সাল থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত কিয়োটো ছিলো জাপানের রাজধানী। কিয়োটো শহরতলীর এক ট্যুরিস্ট গাইড বলেছিলো কিয়োটো (KYOTO) শব্দটিকে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে নাকি টোকিও (TOKYO) সৃষ্টি করা হয়েছে। কে জানে হয়তোবা সত্যি!

তাকাহাশি ট্রেনের বুকিং দিয়েছিলো বেশ সকালে। স্টুডেন্ট ডর্ম থেকে নাগোয়া স্টেশন হাইওয়ে ধরে গেলে ঘন্টা আধেকের পথ। সেখান থেকে স্বপ্নের ট্রেনে সোজা কিয়োটো। দূরত্ত্ব ১৩২ কিলোমিটার। সময় মাত্র ৩৪ মিনিট। মাঝে দুটো স্টেশনে ১ মিনিট করে দাঁড়াবে। তিন রকমের শিনকানসেন ট্রেনের ভেতর সর্বোচ্চ গতির নজোমি ট্রেনে আমাদের যাত্রা। চৌত্রিশ মিনিটে যাত্রা শেষ হবে বলে মন খারাপ হলো। দুষ্টুমি করে তাকাহাশিকে বললাম, ভাই আরেকটু দূরে গেলে হতোনা? একগাল হেসে বললো, ট্রেনিংএর লাস্ট ট্রিপ টোকিওতে। তখন ঘন্টা দেড়েকের উপরে ট্রেনে কাটাবে। মনে মনে ভাবলাম, “দেড় ঘন্টা একটা টাইম হইলো? উত্তরা থেকে ধানমন্ডি যাইতেই এরচে’ বেশি সময় লাগে!”

সাকুল্যে পঁচিশ জনের দল। চব্বিশ জন ট্রেইনি আর একজন কোর্স কোর্ডিনেটর মিস্টার তাকাহাশি। বিশ সেকেন্ডে ট্রেনের ভেতর ঢুকতে হবে। প্ল্যাটফর্মের তীর চিহ্নিত দাগের মাথায় দাঁড়ালাম। চোখের পলকে ট্রেন এসে থামে। তীরের মাথায় বগির দরোজার সেন্টার লাইন। নিঃশব্দে দুয়ার খুলে যায়। আমরা ঢুকে পড়ি। সিট ম্যাপ আগেই হাতে ছিলো। তিরিশ সেকেন্ডে বসে যাই যাঁর যাঁর আসনে। দশ সেকেন্ড বাদেই কোমরে টান! কে যেনো পেছন থেকে জাপটে ধরেছে। নিউটনের তৃতীয় সূত্র কাজ করতে শুরু করেছে। ট্রেনের ক্রিয়া সম্মুখপানে। সমান বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় যাত্রীর পৃষ্ঠদেশ সিটের খাঁড়া অংশে ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছে।।

তবে কোনো হেলুনি দোলুনি নাই। কেবল কানের পর্দা সরছে না। তালা লেগে গেছে। ঢোক গিলে তালা খোলার চেষ্টা করলাম। বাইরে তাকিয়ে দেখি দূরের ক্ষেতখামার চক্রাকারে ঘুরছে। রেল লাইনের পাশে দাঁড়ানো গাছগুলোর রং ঝাপসা লাগছে। দূরের নদীর জল মরুর বালুর মতো চিকচিক করছে। সূর্যটাই একমাত্র স্থির বস্তু। তীর্যকভাবে আমার সানগ্লাসে আলো ফেলছে। ট্রেনের গতি তখন ঘন্টায় ২৮০ আশি কিলোমিটার।

পৌনপুনিক ঢোক গেলা কাজে দিয়েছে। পাশের সিটে বসা আফজাল ভাইয়ের কথা শ্রবণেন্দ্রীয় স্পর্শ করলো। এক সপ্তাহে আমাকে সস্নেহে তুই বলতে শুরু করেছেন। বললেন, মিল্টন তোর কাছে পানির গেলাস আছে?

কেনো?

একটা পরীক্ষা করবো।

কি পরীক্ষা?

মিনারেল ওয়াটারের বোতল থেকে গেলাসে পানি ভরবো। কানায় কানায় ভর্ত্তি করে সামনের টেবিলটায় রাখবো। দেখি জল গড়িয়ে পড়ে কিনা।

আমি হেসে দিলাম। বললাম, শিওর থাকেন…. এক ফোটা পানিও পড়বেনা। শিনকানসেন আজব যন্ত্র। এর কেবল আনুভূমিক গতি আছে। উল্লম্ব মুভমেন্ট জিরো ডিগ্রি! ঝাঁকুনি না থাকলে শুধুমাত্র সারফেস টেনশনে পানি নড়েনা!

এতো থিওরি কপচানোর দরকার নাই। গেলাস থাকলে দে। প্র্যাকটিক্যাল কইরা দেখি।

বললাম, নেই।

শিনকানসেন চলছে খাল বিল নদী নালা মাঠ পেরিয়ে। মাঠের পরে দূরের দেশে পথের পাঁচালীর অপু দুর্গাকে খুঁজছিলাম। ওরা চাল তেতলা কিংবা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ট্রেন দেখছে কিনা। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে বলে মনে হলো। বিভূতিভূষণ বাংলায় জন্মেছেন। জাপানে নয়। তারপরও কেন জানি সীমান্ত এক্সপ্রেসের খুলনা ঈশ্বরদী নাটোর সৈয়দপুরের দৃশ্য খুঁজছিলাম। হার্ডিঞ্জ ব্রীজ পার হবার ঘড়ঘড় খড়বড় আওয়াজ শুনছিলাম। নাহ… সত্যিই হ্যালুসিনেশন। শিনকানসেন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো নিঃশব্দে পা ফেলে। ম্যাগনেটিক হুইলের ধাতব আওয়াজ নেই। শব্দ আসবে কোথেকে? কেবল জাপানি ভাষার মিষ্টি মিউজিক ভেসে বেড়াচ্ছে পুরো কেবিন জুড়ে।

জানালার কাঁচ উড়োজাহাজের মতো স্থায়ীভাবে আটকানো। বাইরে হাত বাড়িয়ে বাতাসের বেগ পরীক্ষার উপায় নাই। দ্রুত লয়ের দৃশ্য দর্শন সময়-জ্ঞানহীন লোকাল ট্রেনের মতো দৃষ্টিবান্ধব নয়। আফজাল ভাই একবারো বাইরে তাকাচ্ছেন না। খেয়াল করে দেখলাম তাঁর চোখ আটকে আছে টেবিলের ওপারে কাউবয় হ্যাট পড়া এক মহিলার দিকে। টেবিলের উল্টোদিকের যাত্রীরা আমাদের দিকে মুখ করে বসা। মহিলা মাথা নিচু করে হাতের উপর বই পড়ছেন। চেহারা দেখা যাচ্ছেনা। তবে পোশাকের ধরণ জাপানি। কমলার উপর লাল হলুদের গোল গোল ছোপ।

আফজাল ভাইকে খোঁচা দিলাম। ‘কি দেখেন?’

মহিলার চেহারা দেখার চেষ্টা করছি। পাঁচ মিনিট হয়ে গেলো মুখই তুলছেনা।

তাতে আপনার কি?

বা রে, চেহারাখান দেখবো না?

যেভাবে পায়ের উপর পা তুলে রেখেছে, মনে হয় কোনো জাপানি বুড়ি। ওরা তো আবার একশো বছর বাঁচে।

আফজাল ভাই বললেন, ‘না, তরুণীও হতে পারে।’

আমাদের কথোপকথন মহিলার কানে গেলো কিনা জানিনা। ঝট করে মাথা তুললো সে। আমার ধারণা ভুল প্রমান করে এক রূপবতী জাপানি কন্যা সামনে তাকালো। রাঙানো ঠোঁট দুদিকে টেনে ভুবনমোহিনী হাসি দিলো। ভাবখানা এমন যে আমি তোমাদের সব কথা জানি। জোর করে শিষ্টাচার রক্ষার হাসি দিলাম। এরপর আলগোছে মুখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকালাম। আফজাল ভাইয়ের দৃষ্টি তখন সরেনি।

চৌত্রিশ মিনিটের জার্নি। কীই বা আর দেখবো ট্রেনে? কিয়োটো চলে এলাম। আবার সেই বিশ সেকেন্ডের ল্যান্ডিং টাইম! দ্রুত নেমে এলাম ট্রেন থেকে। সবার আগে তাকাহাশি।

বাইরে বাস অপেক্ষা করছিলো। হোটেলে নিয়ে গেলো। তুলনামূলক আগেই চেকইন। এখান থেকে আমাদের সাইটসিং শুরু। বিকালে জাপানি কাইজেন বিষয়ে সেমিনার। কাইজেন হলো জাপানিজ বিজনেস ফিলোসোফির ক্রমাগত উন্নয়ন পদ্ধতি। দর্শনীয় স্থান হিসাবে স্থানীয় গাইড নাগামোটো আমাদের কিয়োটো রেল মিউজিয়াম, সামুরাই এন্ড নিনজা মিউজিয়াম, কিয়োটো ইম্পেরিয়াল প্যালেস সহ অনেকগুলো জায়গা ঘুরিয়ে দেখালো। কাইজেন সেমিনার শেষ হলে আমাদের নিয়ে গেলো ফায়ারওয়ার্কস দেখতে। জীবনে সেটাই প্রথম ফায়ারওয়ার্কস দর্শন।

মূল চমক পরের দিন সকালে। তাকাহাশি ঘড়ি ধরে দশটায় আমাদের বাসে তুললো। ব্রেকফাস্ট সেরেই চেকআউট। হাতের ব্যাগগুলো হোটেল সিকিউরিটিতে রেখে আমরা চললাম কিয়োটো বোটানিক্যাল গার্ডেনে। অপরূপ অদ্ভুত অভিজ্ঞতা জীবনে! এতো ফুল একসঙ্গে দেখিনি কখনো। হাজার হাজার লক্ষ কোটি ফুল। আগস্ট মাসের কড়কড়ে সূর্য তাপে একটুও নেতিয়ে পড়েনি। টসটসে তাজা রঙ্গীন ফুল। আজ পর্যন্ত এমন ফুলবাগান আমি দেখিনি। মুগ্ধতার একটি সীমা থাকে। কিয়োটোতে সেদিন সীমা খুঁজে পাইনি।

বাস হোটেলে এসে কেবল ব্যাগ তোলার সময় দিলো। তারপর চললো স্টেশনে। এবারের আসন বিন্যাস একটু ভিন্ন। সামনে টেবিল নেই। নেই কোনো কমলা দেবী। আফজাল ভাইকে বললাম, আপনার কোনো কমলা এখানে নেই। ফিক করে হেসে ফেললেন। বললেন খুঁজে দ্যাখ, আপেল কিংবা আঙ্গুর দেবী পেয়ে যাবি।

নাহ… এবারের যাত্রায় রোমান্স কম। আলো কমে এসেছে। বাইরেটা স্পষ্ট নয়। আফজাল ভাই হঠাৎ কনফেস করতে শুরু করলেন। বললেন, কমলা ড্রেসটা ছিলো কিমোনো। জাপানি ফ্যাশন। তোর ভাবী নিতে বলেছে। তাই পোশাকটা দেখছিলাম। টিপ্পনি কেটে আমিও বললাম, ভালোই তো এই সুযোগে চোখের ব্যায়ামটাও সেরে নিলেন।

ডর্মে ফিরলাম ক্লান্তি আর অবসাদ নিয়ে। পরদিন আবার প্রফেসর আকিহিতো। টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্টের জাপানি প্যাঁচাল।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent