প্রিয় গীতিকার ফজল-এ-খোদা

ফজল এ খোদাকে এক সময় মিতাভাই ডাকতাম

ফজল-এ-খোদাকে এক সময় ‘মিতাভাই’ ডাকতাম। শুধু আমি-ই নই, আরো অনেকেই ডাকতেন। ‘মিতাভাই’ নামটি তিনি ধারণ করেছিলেন দাদাভাই এবং দাদুভাই-এর আদলে। সত্তরের দশকে রেডিও থেকে ‘শাপলা শালুক’ নামে ছোটদের ঝলমলে একটা মাসিক পত্রিকা বেরুতো ফজল-এ-খোদার সম্পাদনায়। সেখানে ছোটদের বিভাগটির পরিচালক হিশেবে তিনি এই পোশাকি নামটি ধারণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, কচি-কাঁচার মেলা কিংবা খেলাঘর চাঁদের হাটের মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শাপলা শালুকের শাখাও গঠন করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে রেডিও কর্তৃপক্ষ শাপলা শালুকের প্রকাশনা বন্ধ করে দিলে শাপলা শালুক নামের শিশু সংগঠনের শাখাগুলোও নিষ্ক্রিয় এবং এক পর্যায়ে হাপিস হয়ে যায়। তবে শাপলা শালুক নামের ডিমাই সাইজের পত্রিকাটির কথা আমাদের খুব মনে আছে। বিভিন্ন রঙের মেকানিকেল পেপারে পত্রিকাটির একেকটি ফর্মা ছাপা হতো। তাতে, পত্রিকাটির পাতায় রঙ ব্যবহার না করে শাদাকালোতে ছাপলেও বাড়তি একটা রঙ যুক্ত হতো চমৎকার ভাবে। হালকা সবুজ, হালকা নীল, হলুদ কিংবা কমলা—এরকম নানান রঙে ছাপা হতো পত্রিকাটির একেকটা অংশ। আমার কিছু লেখাও তিনি ছেপেছিলেন। লেখাগুলো ডাকযোগে পাঠিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে তখন তাঁর সামনা সামনি পরিচয় ছিলো না। আমাকে একবার দেখা করতে বলেছিলেন তিনি। আমি গিয়েওছিলাম তাঁর শাপলা শালুক দপ্তরে। বেশ বড়সড় কক্ষে বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমার মনে আছে, সেদিন নাফিসা রহমান লিজি নামের এক তরুণ লেখকও উপস্থিত ছিলেন। মিতাভাই আমার ব্যাপারে টুকটাক বিষয় জেনে নিচ্ছিলেন। এরপর কোনো এক একুশের ভোরে (সম্ভবত ১৯৮৪ সালে) বাংলা একাডেমীর কবিতা পাঠের আসরে ‘সবুজ ফুলকুমার’ নামের এক শিশুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এই সবুজ তাঁর জ্যষ্ঠপুত্র। ওর পরিবর্তিত নাম ওয়াসিফ-এ-খোদা। ওয়াসিফ পরবর্তীতে আমাদের একান্ত ঘনিষ্ঠজন হিশেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ওয়াসিফ আমাদের খুব প্রিয় একটি অনুষঙ্গ। আমি কানাডায় থিতু হবার পরেও ওয়াসিফের সঙ্গে কখনো বিচ্ছেদ ঘটেনি। ওয়াসিফের মাধ্যমেই নিয়মিত ওর বাবা ফজল-এ-খোদার খোঁজ-খবর আমি পেয়ে যাই। কানাডা থেকে ফোন করেও মাঝে মধ্যে কথা বলি তাঁর সঙ্গে। টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখটি অনায়াসে অবলোকন করতে পারি আমি। গত কয়েকটি বছর, দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে। তিনি অসুস্থ থাকেন। বাড়ি থেকে বলতে গেলে বেরই হন না। আমি প্রতি বছর বইমেলার সময় দুমাসের জন্যে কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসি। কিন্তু দেখা হয়না তাঁর সঙ্গে।

অবশেষে দীর্ঘদিন পর, গত ০৯ মার্চ সকালে চ্যানেল আই কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হলো। চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাগর ভাই তাঁকে হাজির করিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর জন্মদিন ছিলো। ‘তারকা কথন’ অনুষ্ঠানে তাঁকে আনা হয়েছিলো বিশেষ সম্মান দিয়ে। আমীরুল ইসলামের কক্ষে আমরা অনেক গল্প করেছি। আমার আর আমীরুলের ব্যাপারে তাঁর মমতার বিষয়টি নতুন করে উপলব্ধি করলাম আবারো। অভিনয় শিল্পী শিরীন বকুলও এসেছিলো। আমি আর বকুল ফজল-এ-খোদার সঙ্গে একটা গ্রুপ ছবি তুললাম। তিনি আমাদের দুজনার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি তাঁকে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে রেখেছি। তারপর তাঁর দুপাশে আমি আর বকুল দাঁড়িয়েছি। ফজল-এ-খোদার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাটা তাতে ভিন্ন একটি মাত্রা পেলো ছবিতে।

- Advertisement -

তারকা কথন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মৌসুমী বড়ুয়া লাইভ অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তাঁকে দিয়ে কেক কাটিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করলো। কী যে খুশি হলেন ফজল-এ-খোদা! কোনো স্যাটেলাইট টিভি পর্দায় এইরকম ভাবে জন্মদিন পালিত হয়নি তাঁর। তিনি তাই অভিভূত ছিলেন। আমি আর আমীরুল সাগর ভাইয়ের সঙ্গে বসে অনুষ্ঠানটি দেখলাম। অনুষ্ঠান শেষ হলে ফজল-এ-খোদাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আমাকে নিয়ে নিচ তলার স্টুডিওতে গেলেন সাগর ভাই। সাগরভাইকে কাছে পেয়ে খুবই আবেগপ্রবন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অকপটে বললেন তিনি তাঁর ক্ষোভের কথাটি। চ্যানেল আই তাঁকে ডাকেনি কখনো। চ্যানেল আইয়ের ব্যাপারে ফজল-এ-খোদার একটা অভিমান ছিলো। সেই অভিমানের সমাপ্তি ঘটলো সাগর ভাইয়ের এইরকম একটি উদ্যোগের কারণে।

আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটির জন্যে গীতিকার ফজল-এ-খোদার নামটি বহু মানুষের জানা। কিন্তু তাঁর লেখা আরো বহু বিখ্যাত গান আছে যেগুলো একসময় বিপুল শ্রোতাপ্রিয় ছিলো। আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত সেই গানগুলো শ্রোতাপ্রিয়ই আছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা ফজল-এ-খোদা সম্পর্কে খুব একটা জানে না।

আমি নিজে একজন গানপাগল মানুষ। বিচিত্রসব গানের শ্রোতা আমি। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষার বহু গান আমার মুখস্ত এবং ঠোঁটস্ত, ইন্টারল্যুড ও প্রিল্যুড মিউজিকসহ। আমার প্রিয় দশটি বাংলা সিনেমার গানের অন্তত দুটি গান ফজল-এ-খোদার লেখা। দুটিই মাসুদ পারভেজ পরিচালিত এপার ওপার সিনেমার। প্রথমটি আজাদ রহমানের গাওয়া ‘ভালোবাসার মূল্য কতো আমি কিছু জানি না, এ জীবন তূল্য কী তার আমি সেতো বুঝি না’। অন্যটি আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘মন রেখেছি আমি তার মনের আঙিনায়, কেউ ডেকো না আমায় কেউ খুঁজো না আমায়’।

আমাদের বাংলা গানের ভুবনকে তাঁর মেধার দীপ্তিতে বর্ণাঢ্য করেছেন ফজল-এ-খোদা। গীতিকার ফজল-এ-খোদার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

- Advertisement -

Read More

Recent