ফিরিয়ে দাও এগারো দিন!”

পহেলা জানুয়ারী থেকে শুরু হয় নতুন বছর নতুন বছরকে স্বাগত জানানো এবং পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা জ্ঞাপন একটি আন্তর্জাতিক রেওয়াজ

পহেলা জানুয়ারী থেকে শুরু হয় নতুন বছর। নতুন বছরকে স্বাগত জানানো এবং পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা জ্ঞাপন একটি আন্তর্জাতিক রেওয়াজ। এ রেওয়াজ চর্চা করতে গিয়ে আমরা বাঙালীরা প্রায়ই বলে ফেলি “শুভ ইংরেজী নববর্ষ”।

গ্রেগরিয়ান নববর্ষকে ইংরেজী নববর্ষ বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়। তবু অভ্যাসবশতঃ অনেকেই ভুলটি করে থাকেন। আমিও করি। দেশের অনেক বুদ্ধিজীবির মুখেও এটি শুনি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার কোনোভাবেই ইংরেজদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার নয়। গ্রেগরিয়ান নববর্ষকে যদি কোনো দেশের নাম নাম ধরে ডাকতেই হয় তাহলে একে ইতালীয় নববর্ষ বলে ডাকা উচিত। কারণ এর আবিষ্কারক এবং প্রচলক রোমান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী (Pope Gregory XIII)।

- Advertisement -

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার কার্যকর করার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলির ভেতর অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ ইংল্যান্ড। পিছিয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে লম্বা ইতিহাস। কিন্তু মজার তথ্য হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবহার নিয়ে ইংরেজদের ভেতর তখন দাঙ্গা হয়েছিল। ১৭৫২ সালের সে দাঙ্গায় নিউ ক্যালেন্ডার বিরোধীদের শ্লোগান ছিলো ‘Give us our eleven days!’ ফিরিয়ে দাও আমাদের এগারো দিন!ইংরেজরা তখনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারও রোমানদের তৈরী। খ্ৰিষ্টের জন্মের ৪৬ বছর আগে এ ক্যালেন্ডার প্রথম প্রচলন করেন জুলিয়াস সিজার। গোটা ইউরোপ জুড়ে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ব্যবহার চলছিলো ১৫৮২ সাল পর্যন্ত। এরপর ইতালীয় ফরাসি ওলন্দাজেরা ধীরে ধীরে বদলে ফেলে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। কিন্তু ইংরেজরা এটি লালন করে আরও ১৭০ বছর, ১৭৫২ সাল পর্যন্ত।

১৫৮২ সাল জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের একটি ঐতিহাসিক বছর। এবছর ইতালি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, পর্তুগাল এবং স্পেন প্রথম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করে এবং জানুয়ারীকে প্রথম মাস হিসাবে পালন শুরু করে। এর আগে বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন তারিখে নববর্ষ উদযাপন করতো। কেউ ১৪ জানুয়ারি, কেউ ২৫ মার্চ ইত্যাদি। এগুলোর সাথে খ্রীস্ট ধর্মীয় আচার এবং উৎসব জড়িত ছিলো। দ্বাদশ শতকে ইংল্যান্ড নববর্ষ শুরু করে ২৫ মার্চ। সেসুবাদে ইংল্যান্ডে ক্যালেন্ডারের পাতায় সাল বদলানো হতো ২৫ মার্চ।

এবার দাঙ্গার গল্পটা বলি। ১৭৫০ সালে ব্রিটিশরাজ তাঁদের গোটা সাম্রাজ্যে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালুর জন্য “দ্য ক্যালেন্ডার (নিউ স্টাইল) এ্যাক্ট ১৭৫০” পাশ করে। নতুন আইন অনুযায়ী সরকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিন ঠিক করা হয় ১ জানুয়ারি, ১৭৫২। সেদিন থেকে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনের সঙ্গে ইংল্যান্ডেও শুরু করা হয় নতুন সাল (১৭৫২)। কিন্তু বাঁধ সাধলো অন্য জায়গায়। ইংল্যান্ডে ১৭৫০ সাল শেষ হয়েছিল ২৪ মার্চ ১৭৫০। নতুন সাল ১৭৫১ শুরু হয়েছিলো পরের দিন ২৫ মার্চ। কিন্তু পরিবর্তিত আইনে ১৭৫১ সাল শেষ হয়েছিলো ৩১ ডিসেম্বর ১৭৫১। অর্থাৎ ২৪ মার্চ ১৭৫১ পর্যন্ত সেটি প্রলম্বিত হয়নি। বৃটিশ ইতিহাসে তাই ১৭৫১ সাল হচ্ছে সবচে সংক্ষিপ্ত বছর। এর স্থায়ীত্ব ছিলো মাত্র ২৮২ দিন।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে তখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পার্থক্য চলছিলো ১১ দিন। কারণ জুলিয়াস সিজার প্রচলিত ক্যালেন্ডারে বড় একটি ভুল ছিলো বার্ষিক গতি নিয়ে। সৌর নিয়মে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন ছয় ঘন্টা। সূক্ষ্ণ গাণিতিক হিসাবে ৩৬৫.২৪২৫ দিনে এক বছর। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে শেষ ছয় ঘন্টার হিসাব ধরা হয়নি। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি তাঁর ক্যালেন্ডারে এই ছয় ঘন্টা বিবেচনায় আনেন। চার বছর পরপর ফেব্রুয়ারি মাসে ১ দিন বাড়িয়ে ৩৬৬ দিনের লিপ ইয়ার চালু করেন। এতে ১৭৫২ সালে দুই ক্যালেন্ডারের পার্থক্য দাঁড়ায় ১১ দিনে। তাই প্রথম বছর অর্থাৎ ১৭৫২ সালেই বৃটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় বুধবার ২ সেপ্টেম্বর এর পরবর্তী দিন বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর করা হবেনা। এটি সরাসরি হবে ১৪ সেপ্টেম্বর হবে। ইতালি ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশে যেখানে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু ছিলো, সেখানে তখন অলরেডি ১৪ সেপ্টেম্বর ১৭৫২।

রাস্তায় নেমে এলো বিরোধীরা। ৩ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর মোট এগারোটি দিন ইংরেজদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলো। মেনে নিতে পারছিলোনা সাধারণ জনগণ। ধর্মের রং লেগে গেলো এতে। বলা হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ক্যাথলিকদের প্লট। ইস্টারের তারিখ পরিবর্তনের জন্য এটি করা হয়েছে। প্রোটেস্ট্যান্ট ইংরেজরা তা মানেনা। ইস্টারের নির্ধারিত দিন ছিল ২৫ মার্চ। কিন্তু গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে সেটি হয়ে গেলো ৭ এপ্রিল।

বাঙালির তুলনায় ইংরেজদের বর্ষ পালন সংস্কৃতি বেশ দুর্বল। ভারতবর্ষের অন্যান্য জাতি, গোষ্ঠি বা গোত্রের পাশাপাশি বাঙালির বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, অগ্রহায়ণ, পৌষ বেশ অগ্রগামী। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় ইংরেজদের নিজস্ব কোনো ক্যালেন্ডার কখনই ছিলোনা। রোমানদের তৈরী পঞ্জিকাসূচি তাঁরা ব্যবহার করেছে। সুতরাং বাঙালির একটা নিজস্ব নববর্ষ থাকলেও ইংরেজদের তা নেই। এখন বিশ্বের অন্য দেশের মতো তাঁরাও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। ভারতবর্ষে এ ক্যালেন্ডার তাঁরাই আমদানি করেছিলো। হয়তো একারণেই ভারতীয় সংস্কৃতিতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মানে ইংরেজি ক্যালেন্ডার।

নিঃসন্দেহে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার তাঁর খ্রীস্ট সীমানা পার হয়ে মধ্যপ্রাচ্য সহ তাবৎ বিশ্বে গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে এর নিখুঁত গাণিতিক বিশ্লেষণের কারণে। সৌদি আরব ২০১৬ সাল থেকে সরকারী অর্থবছর, বেতন, ভাতাদি, পেনশন ইত্যাদির হিসাব গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে যুক্ত করেছে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক আগে থেকেই এটি অনুসরন করছে।

আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতিকে মাপকাঠি ধরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ ক্যালেন্ডার। এটি বৈশ্বিক সার্বজনীন ক্যালেন্ডার। কোনো জাতির একক সম্পদ নয়।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent