করুণার সাগর, বিদ্যার সাগর

সর্বমানবের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মহাত্মা করুণাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে আমার আনত প্রণতি

হুগলি জেলার এক অজগ্রামের একটি স্কুল পরিদর্শনে আসবেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। চারদিকের মানুষ ভেঙ্গে পড়লেন তাঁকে একনজর দেখার জন্য। যথাসময়ে বিদ্যাসাগর সেখানে উপস্থিত হলেন। এক বৃদ্ধা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে একজনকে জিগ্যেস করলেন – হা গা, বিদ্দেসাগর কই?

ভদ্রলোক সামনেই বিদ্যাসাগরকে দেখিয়ে বললেন- এই যে বিদ্যাসাগর মশাই!

- Advertisement -

বৃদ্ধা অবাক হয়ে খানিকক্ষণ বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর বললেন – ‘ আ আমার পোড়া কপাল। এই মোটা চাদর গায়ে এরকম মানুষ দেখবার জন্যে রোদে ভাজা ভাজা হলুম! না আছে গাড়ি, না আছে ঘড়ি, না আছে চোগা-চাপকান’।

সত্যি কথা। গাড়ি-ঘোড়া চোগা-চাপকানের জাঁকজমক নেই বিদ্যাসাগরের। অতি সাধারণ ও সামান্য তাঁর পোশাক-আশাক। নিজের জন্য যে কোন খাবার হলেই তিনি সন্তুষ্ট। কিন্তু অন্যকে খাওয়ালে বাজারের সেরা খাবারটির আয়োজন করেন তিনি। কাউকে দিতে হলে বাজারের ভালো কাপড়টিই তিনি কিনে দেন। মাতৃভক্তি ব্যাপারটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি একটি অনন্য উদাহরণ।

আর্তের জন্য বিদ্যাসাগরের প্রাণ কাঁদতো। কারো কষ্ট ও দুর্গতি দেখলে সত্যি সত্যি বিদ্যাসাগরের চোখে জল গড়িয়ে পড়তো। আর্ত ও দরিদ্রদের জন্যে প্রাণ কেঁদে ওঠা বিদ্যাসাগর চোখের জল ফেলেই ক্ষান্ত হননি। সাধ্যের অধিক দিয়েও মানুষের পাশে ছিলেন জীবনভর। কেউ তাঁর কাছ থেকে কখনোই খালি হাতে ফিরেনি।

সত্য ও ন্যায্য কথা বলতে কখনোই পিছপা হননি। কাউকে ভয় করেননি। একবার সরকারের মস্ত এক শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তার অফিসে গিয়েছেন। দু’একটা কাজের কথার পরে এমনিই গল্প আলাপ জমে উঠেছে দুজনের মধ্যে৷ চাপরাশি এসে খবর দিল কেউ একজন কর্ত্তার সাথে দেখা করতে চান। তিনি চাপরাশিকে বলে দিলেন – বলো, এখন সময় নেই। বিদ্যাসাগর তৎক্ষনাৎ বললেন- আমার সঙ্গে খোশগল্প করার সময় আছে, আর একজন গাড়ি ভাড়া দিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছেন, আর আপনি কি না বলছেন সময় নাই!

অগত্যা কর্ত্তা চাপরাশি বললেন – লোকটিকে ভিতরে নিয়ে আসতে৷

বাল্য বিবাহ, সতিদাহ প্রথা বন্ধ করা এবং বিবধা বিবাহের প্রবর্তনের মতো যুগান্তকারী কাজের জন্যই ঈশ্বরচন্দ্র ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। চিরস্মরণীয় থাকতেন বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলায় যতিচিহ্নের ব্যবহার করে গদ্যকে নিয়মানুবর্তিতা মেনে এর শিল্পরূপায়ণের প্রধান প্রবর্তক হিসেবেও। কিন্তু বিদ্যার সাগর হয়েও তিনি ছিলেন দয়ার সাগর। কুলীন ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি ছিলেন ম্লেচ্ছ-যবনদের দরদিয়া বন্ধু। হিন্দু হয়েও তিনি ছিলেন দুর্দশাগ্রস্ত মুসলমানের আর্থিক আশ্রয়।

দেশে কলেরা হয়েছে। গ্রামের দরিদ্র মানুষদের জন্য তিনি ডাক্তার, ঔষধ, খাদ্য, কাপড় নিয়ে গ্রামে চলে গিয়েছেন। হিন্দু-মুসলমান ম্লেচ্ছ-যবন রোগাক্রান্ত শিশুদের কোলে করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। দৃঢ় সত্যবাদী আর্তের কষ্টে হৃদয় কেঁদে ওঠা এমন দরদী মহাত্মা প্রাণ জগতে কি আর দ্বিতীয় কেউ আছেন!

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কি জীবনে মিথ্যার আশ্রয় নেননি? মিথ্যা কথা বলেননি? হ্যাঁ, বলেছেন। তবে, সেটাও মিথ্যার কৌশলে নিরুপায় মানুষকে সাহায্যের নিমিত্তে। একটা গল্প বলি। বিদ্যাসাগর একবার এক গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পথিমধ্যে শুনতে পেলেন একজন নারীর কান্নার আহাজারি। অন্য পথচারীদের জিগ্যেস করলেন এর কারণ কি? শুনলেন আহাজারিরত নারীর স্বামী মারা গিয়েছেন৷ সংসারের সকল সহায় ও অলংকারাদি বিক্রি করেও তিনি স্বামীকে সুস্থ করে তুলতে পারেননি। পরচারিকে জিগ্যেস করলেন -যিনি মারা গিয়েছেন তার নাম কি? শুনলেন রামগোপাল জানা। পথচারীদের চলে যাবার পর ঈশ্বরচন্দ্র সেই কান্নার আহাজারি অনুসরণ করে ঘরের পাশে গিয়ে ডাক দিলেন- রামগোপাল বাবু আছেন? কান্না থামিয়ে ঘরের বিধবা বাইরে এসে রামগোপালের মৃত্যুর কথা বললেন। ঈশ্বরচন্দ্র বললেন- রাম বাবু মরে গিয়ে তো আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন মা জননী! তিনি তো আমার কাছে বেশকিছু টাকা জমা রেখেছিলেন বিপদে পড়লে আস্তে আস্তে আনবেন বলে। আমি তো তার শারীরিক অবস্থা জানতাম না মা জননী! আর এই অবস্থায় সবগুলো টাকা একসাথে দেওয়ার উপায়ও আমার নেই৷ এখন থেকে মাসে মাসে আপনাদের খাওয়া খরছ, কাপড় কেনা, ও অন্যান্য ছোটখাটো আনুসঙ্গিক বাবদ যা লাগবে আমি তা পৌঁছে দেবো৷ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মানুষের সেবা করার জন্য এমন ঐশ্বরিক প্রাণ জগতে আর কে আছে

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছাড়া। বিদ্যার সাগরের মতো যে তিনি ছিলেন সত্যিকার করুণার সাগরও!

আজ সর্বমানবের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মহাত্মা করুণাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে আমার আনত প্রণতি।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent