
কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঘটনার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাঝে। সহপাঠীর হাতে সহপাঠীর আক্রান্ত হওয়া, ক্লাসরুমে বেড়ে যাওয়া আচরণগত সমস্যা, অনলাইন চ্যালেঞ্জের নেতিবাচক প্রভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কারণে শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো ঘটনাগুলো মিলিয়ে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে আজকের স্কুল কি আদৌ নিরাপদ?
ওন্টারিও, আলবার্টা, ব্রিটিশ কলম্বিয়া এবং নোভা স্কশিয়ার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী সহিংসতার হার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শিক্ষকরা বলছেন, তাদেরকে এখন আর শুধু পাঠদানে মনোযোগী হতে পারছেন না বরং প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ ঠেকানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং মানসিকভাবে ভঙ্গুর শিক্ষার্থীদের সামলানোর চাপে কাজ করতে হচ্ছে।
একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এই পরিস্থিতিকে তুলনা করেছেন “টাইম বোমা”-র সঙ্গে। তাঁর মতে, প্রতিটি দিন যেন নতুন একটি অনিশ্চয়তা নিয়ে হাজির হয় কখন, কোথায় কী ঘটে যায়, বলা যায় না।
শুধু শারীরিক সহিংসতা নয়, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিপজ্জনক ট্রেন্ডও। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ‘ক্রোমবুক চ্যালেঞ্জ’-এর জেরে বেশ কয়েকটি স্কুলে প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। এসব চ্যালেঞ্জ শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর কৌতূহল তৈরি করছে, যা শিক্ষার পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনলাইন কার্যক্রম নজরে রাখা হচ্ছে, যেন আগেভাগেই ঝুঁকি বা মানসিক সংকটের আভাস ধরা যায়। তবে এর পেছনের উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও অনেকেই বলছেন, এতে শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা হুমকির মুখে পড়ছে। তথ্য ফাঁসের আশঙ্কাও উপেক্ষা করার মতো নয়।
এর জবাবে প্রাদেশিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্কুল বোর্ডগুলো ‘সেফ স্কুল’ নীতিমালা আরও কঠোর করেছে। নতুন করে আচরণবিধি হালনাগাদ হচ্ছে, শৃঙ্খলা ও শাস্তির নিয়মাবলি কার্যকরভাবে প্রয়োগে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল শাস্তির ভয় দেখিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ওপর আরও জোর দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি নিরাপদ স্কুল মানে কেবল শারীরিকভাবে সুরক্ষিত স্থান নয়। এখানে মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, এবং শিক্ষার্থীদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা এই সব কিছু মিলেই গড়ে তুলতে হবে একটি সুস্থ, নিরাপদ, সহযোগিতামূলক শিক্ষার পরিবেশ।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায় আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি শিশুর জন্য সত্যিই নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো জটিল, কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও অনিরাপত্তার মুখে পড়তে পারে। নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ গড়ার সময় এখনই।
