
তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার একটি থানার নাম বানিয়াচঙ্গ। বানিয়াচঙ্গ হবিগঞ্জ মহকুমার পশ্চিম প্রান্তের একটি থানা। বর্তমান পৃথিবীর বৃহত্তম এনজিও ব্রাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের জন্মভূমি। বানিয়াচঙ্গ এশিয়া মহাদেশের একটি বৃহত্তম গ্রামও বটে। একটি গ্রামেই কয়েকটি ইউনিয়ন। বানিয়াচঙ্গে আবার অনেকগুলি আলাদা ইউনিয়নও আছে। দক্ষিণ প্রান্তের একটি ইউনিয়নের নাম সুজাতপুর। এই ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্রামের নাম ইকরাম। আমি এই গ্রামকে বলি ‘স্বর্ণগ্রাম’। তাতি, কামার, কুমার, জেলে, চামার, শেখ, কৈবর্ত সবই আছে এই গ্রামে। শত শত বছর থেকে মিলে মিশে বাস করছেন এই গ্রামের গরীব-দুঃখি ধনি-গরীব সবাই। হাসি আনন্দ অবাক করা কৌতুহল আর কৌতুকে বর্ষার ঢেউয়ের মতো তাদের জীবন প্রবাহিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মূলত কৃষিনির্ভর চাষবাসই তাদের জীবনের আনন্দ বেদনার অনুষঙ্গ। চাষ সহজ হলে অর্থাৎ সেচের পানি আর নিড়ানির সহজলভ্যতা আর ফসলের অভয় উৎপাদনের আশ্বস্ততাই এই আনন্দের মূল চাবিকাটি।
এই ইকরাম গ্রামের এক সহজ সরল ঈমানদার ধার্মিক মুসলমানের নাম সাহেব আলী। গ্রামের সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। নির্ঝঞ্ঝাট, নিরহংকার, মিতবাক, মিষ্টভাষী পরোপকারী সাহেব আলী হেঁটে যেতে যেতে পথের কাঁটা বেছে গন্তব্যে যাওয়ার অভ্যেস। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তিনি মসজিদেই আদায় করেছেন সারাজীবন। মসজিদের পুকুরেই গোসল করেছেন। পাঁচ গ্রামের মানুষ তাঁকে বিচার-মজলিসে ডাকে। কিন্তু বিচার মজলিসেও তিনি পারতপক্ষে কোনো কথা বলেন না। তাঁকে কথা বলতে দিলে তিনি শুধু আল্লারওয়াস্তে শান্তি কামনা করেন সকলের কাছে। হেঁটে যাওয়ার সময় আমি খেয়াল করতাম: সাহেব আলীর পায়ের পাতার তলে পিষ্ট হয়ে যেন একটি ঘাসও না মরে সেই অভিনিবেশ তিনি ধরে রাখতেন। আস্তে আস্তে করে হেঁটে যেতেন, যেন পায়ের আঘাতের সাথে কোনো একটি জীবন্ত ঘাসও মাটির সাথে মিশে না যায়। অথবা পায়ের আওয়াজে পাখির ঘুম না ভাঙ্গে।
সাহেব আলী বিয়ে করলেন গুল মোহর নামের পাশের বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের অতি চঞ্চল এক কন্যাকে। এই পরিবার ধনে জনে বিশাল। সওদাগর হাজী এই গ্রামে বিখ্যাত মানুষ বিশাল জমি জিরাতের মালিক হিসেবে। তাঁরই কন্যা গুল মোহর বেগম। খুব সুখেই সাহেব আলীর দিন কাটতে লাগলো। এক বছর পর সাহেব আলীর পরিবারে একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলো। ফুটফুটে ফর্সা এই কন্যাটির মুখ দেখে সাহেব আলীর আনন্দ আর ধরে না। তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন পরম ভক্তিভরে। আশ্চর্য সুন্দর একটি নাম রাখলেন: ‘পরিষ্কার ‘। মাহমুদা বেগম ‘পরিষ্কার’।
এখন সাহেব আলীকে মানুষ আদর করে পরিষ্কারের বাপ ডাকেন। সারা গ্রাম এমনকি পার্শ্ববর্তী গ্রামেও পরিষ্কারের বাপকে সবাই এক নামে চিনেন। সাহেব আলী থেকে সহসাই তিনি পরিস্কারের বাপে পরিচিত হয়ে উঠলেন। পরিষ্কার নিজের বাড়ি আর নানা বাড়ির বিশাল জনগোষ্ঠীর আদরে-আপ্যায়নে মামা-খালাদের কাঁধে কাঁধে বড় হতে লাগলেন। পায়ে আলতা, নাকে নোলক আর গলায় সোনার তাগাহার বেঁধে ঘুরে বেড়ান মামা বাড়ি আর নিজের বাড়িতে।
একসময় পরিষ্কারেরও বিয়ে হয়ে গেলো। সাহেব আলী তখন আরো তিন সন্তানের জনক। দ্বিতীয় সন্তান রঙ্গু মিয়া, তৃতীয় সন্তান হুমায়ূন মিয়া, চতুর্থ সন্তান জেসমিন বেগম।
এই পরিষ্কারই আমার জন্মদাত্রী জননী। আমার আম্মা। আমিই তার প্রথম সন্তান। আমরা তিন ভাই, চার বোন। এক ভাই দশ বছর বয়সেই নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে আকাশের তারার সাথে মিশে গিয়েছে।
তামাম দুনিয়ার সবচেয়ে শান্তিকামি এবং অতি সন্তুষ্টচিত্ত একজন মানুষ, যার নাম: পরিষ্কার। মাহমুদা বেগম পরিষ্কার। আমার মা। উপরের ছবিটি ২০১৭ সালে আমার ফোন ক্যামেরায় তুলেছিলাম। ছবিটি যখন তুলি আমার বুক ভেঙে যাচ্ছিল। কত ভেঙে পড়েছেন আমার আম্মা। মাথার চুল সব পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। শরীরে মেদ জমেছে। চোখে পুরো কাঁচের চশমা। ভিতরের প্রবল আশংকার চাপ আমার অবয়বে ধরা পড়েছে। বুঝতে পেরে আম্মা অভয় দিয়ে আমাকে বলেছেন -‘ আমি ভালো আছি। বয়স হয়েছে। একটু পরিবর্তন তো হবেই। তবে, আমার শরীর ভালো আছে।’
২০১১ সালে আব্বার যখন মৃত্যু হয়, আম্মা আমাকে ফোন দিয়ে বলছেন – ও বাবা, তোমার আব্বার কষ্ট হচ্ছে। তুমি তাকে সন্তুষ্ট মনে বিদায় দাও। আম্মা তো আছি! আমার দু’গাল বেয়ে অঝোরধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অবুঝ শিশু প্রহর আমার কোলে। সে হাত দিয়ে আমার গালে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিচ্ছে। আম্মা কত সাহসের সাথে আমাদেরকে বলেছেন – আম্মা তো আছি!
আজ আম্মা নিঃসাড় দেহে বিছানায় পড়ে আছেন। ডাকলেও শব্দ করে জবাব দিতে পারছেন না। এক অনন্ত যাত্রার ডাকে সাড়া দিতে আম্মা নিজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন। সন্তানের ডাক, চারপাশের কোলাহল, খাদ্যগ্রহণের আকাঙ্খা, ব্যথা নিবারণের পথ্য সবকিছুর সঙ্গেই আম্মার চাহিদা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করছেন। আমার আকুল জিজ্ঞাসার জবাবে – বারবার বলেছেন – তার এই জীবন আনন্দে ভরপুর ছিল। কোন দুঃখ নেই। কোন অপূর্ণতা নেই৷ সকল সন্তান ও নাতি-নাতনীদের হাসিখুশি ও সুন্দর জীবন দেখে তিনি আপ্লুত ও গর্বিত। এই জীবনে তার কোন আফসোস নেই!
আমার এই লেখাটা যারা পড়ছেন তাদেরকে একটা কথা বলি – আমার আম্মা হিসেবে নয়, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে অতি বিবেচনার সহিত বলছি – আমার মায়ের মতো এরকম শান্তিপূর্ণ, সন্তুষ্টচিত্ত ও পরোপকারী মানুষ আমার জীবনে আমি কম দেখেছি। আম্মার কাছে অভাব বলে কিছু ছিল না। একটা শান্তির ও স্বস্তির জীবনকে আমাদের আম্মা যাপন করেছেন।
