কানাডার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল টাস্কফোর্স গঠন: প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের কল্পবিজ্ঞান নয় এটি বিশ্ব অর্থনীতি রাজনীতি ও সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের কল্পবিজ্ঞান নয় এটি বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে কানাডা সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে একটি বিস্তৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল প্রণয়নের লক্ষ্যে নতুন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।

সরকারের দাবি, এটি শুধু প্রযুক্তি খাত নয়, বরং পুরো অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

- Advertisement -

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই টাস্কফোর্সে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা প্রতিনিধি, নীতি প্রণেতা এবং সিভিল সোসাইটির সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

তাদের মূল দায়িত্ব হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা ও উদ্ভাবনের রূপরেখা তৈরি, শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ চিহ্নিত করা, তথ্যের নৈতিকতা ও গোপনীয়তা সুরক্ষায় নীতি প্রণয়ন, শ্রমবাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তনের পরিকল্পনা, এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কানাডার অবস্থান সুসংহত করা।

২০২৪ সালে কানাডার প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত গবেষণা ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার।

সরকার আশা করছে, নতুন কৌশল বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিখাতের বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে, এবং সরাসরি প্রায় ৩ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, কৃষি, জ্বালানি ও আর্থিক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে AI প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা কমপক্ষে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে বলে সরকারের পূর্বাভাস।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি, নিরাপত্তা ও নৈতিক দিকটিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে টাস্কফোর্স। আলোচ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে যেমন – নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, ভুয়া তথ্য বা ডিপফেক ছড়িয়ে পড়া রোধ, সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, পর্যাপ্ত নীতিমালা ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও বৈষম্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে সরকারকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি নৈতিক মানদণ্ডেও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

এই উদ্যোগের পেছনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ৯০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে, চীনের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও জাপানও ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।

তুলনামূলকভাবে কানাডা এখনও কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, দেশটির শক্তি হলো বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বহুসাংস্কৃতিক সামাজিক কাঠামো। নতুন কৌশল এই সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে কানাডাকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

সরকার আগামী ছয় মাসজুড়ে একটি জনমত গ্রহণ কর্মসূচি চালাবে। এতে সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা নিজেদের মতামত জানাতে পারবেন।

অনলাইনে মতামত জমা দেওয়ার পাশাপাশি, বড় শহরগুলোতে উন্মুক্ত গোলটেবিল বৈঠকও আয়োজন করা হবে।

সংগৃহীত মতামত ও সুপারিশগুলো টাস্কফোর্সের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা জাতীয় কৌশল তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

কানাডার এই টাস্কফোর্স গঠন নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, কানাডা শুধু উত্তর আমেরিকায় নয়, বিশ্বমঞ্চেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্ভাবন ও নীতিনির্ধারণে নেতৃত্বের অবস্থান অর্জন করতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে যায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও নাগরিক সুরক্ষার ভারসাম্য কতটা রক্ষা করা সম্ভব হবে? এই ভারসাম্যই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

- Advertisement -

Read More

Recent