
দীর্ঘদিনের আর্থিক ঘাটতি ও পরিবর্তিত যোগাযোগ ব্যবস্থার চাপে অবশেষে কানাডা পোস্টকে আধুনিকীকরণ ও পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছে কানাডার ফেডারেল সরকার। সরকারের নতুন এই রূপরেখায় ডাক ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারি তথ্য বলছে, কানাডা পোস্ট টানা দশ বছর ধরে লোকসান গুনছে। ২০২৪ সালের হিসাবে সংস্থাটির বার্ষিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। একদিকে চিঠি পাঠানোর পরিমাণ গত এক দশকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে, অন্যদিকে অনলাইন কেনাকাটার কারণে পার্সেল পরিবহন বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। এই বৈপরীত্যের কারণে প্রচলিত ডাকব্যবস্থার খরচ বাড়ছে, কিন্তু আয় তুলনামূলকভাবে কমছে। তাই সরকার এবার বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হচ্ছে দরজায় দরজায় চিঠি ও পার্সেল সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বন্ধ করা। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ পরিবার প্রতিদিন সরাসরি বাড়ির দরজায় ডাকসেবা পায়। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই হার কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। বাকি পরিবারগুলোকে নিজেদের এলাকার কমিউনিটি মেইলবক্স থেকে ডাক সংগ্রহ করতে হবে। সরকারের হিসাব বলছে, শুধু এই একটিমাত্র সংস্কারের মাধ্যমেই প্রতি বছর প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব।
সরকার ডাকসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে। ভবিষ্যতে আর কাগজভিত্তিক রেকর্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি চিঠি ও পার্সেলের অবস্থান জানা যাবে। কানাডা পোস্ট ইতোমধ্যেই ৫০০টি নতুন স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্র বসানোর কাজ শুরু করেছে। এই যন্ত্রগুলো প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) চিঠি ও পার্সেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হবে, যা পূর্বের তুলনায় অনেক দ্রুত।
ডাককর্মী ইউনিয়ন এই সংস্কার পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের মতে দরজায় ডেলিভারি বন্ধ হলে প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অক্ষম নাগরিকদের জন্য সমস্যা তৈরি হবে, কারণ তাদের পক্ষে কমিউনিটি মেইলবক্স পর্যন্ত যাওয়া কঠিন।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা আসতে পারে। বর্তমানে কানাডা পোস্টে প্রায় ৫৫,০০০ কর্মী কাজ করছেন, যাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরাসরি ডেলিভারি খাতে যুক্ত। ইউনিয়নের ধারণা, সংস্কার কার্যকর হলে ১৫,০০০ পর্যন্ত চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সরকার অবশ্য বলছে, কিছু পুরনো চাকরি হারালেও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। যেমন – ডেটা ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ, পার্সেল প্রক্রিয়াকরণ, গ্রাহকসেবা ও সাপোর্ট সেন্টার ইত্যাদি খাতে নতুন নিয়োগ আসবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৮,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে এটাও স্বীকার করছে যে এই সংখ্যা হারানো চাকরির পূর্ণ বিকল্প হবে না।
প্রতিবছর এই লোকসান পূরণে সরকারকে কোটি কোটি ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপর চাপ তৈরি করছে। সংস্কার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডা পোস্টকে আবারও মুনাফাভিত্তিক সংস্থায় পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সংস্কার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, কমিউনিটি মেইলবক্স ব্যবস্থায় খরচ বাঁচবে, চিঠি ট্র্যাকিং সহজ হবে, ফলে সেবার মান আধুনিক হবে। আবার বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ বলছেন, মেইলবক্স পর্যন্ত যেতে অনেক দূর পথ হাঁটতে হবে, যা তাঁদের জন্য ভোগান্তির কারণ হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কানাডা পোস্ট সংস্কার দেশের ডাক ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আর্থিক চাপ কমবে, প্রযুক্তি-নির্ভর সেবা বৃদ্ধি পাবে, এবং কানাডা আধুনিক ডিজিটাল যুগের ডাকসেবায় প্রবেশ করবে।
তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। শ্রমিক বিক্ষোভ, জনমতের চাপ ও রাজনৈতিক বিতর্ক সংস্কার বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কীভাবে এই সব বাধা পেরিয়ে ঐতিহাসিক রূপান্তর সম্পন্ন করে।
