
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করল কানাডা। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে নিরপেক্ষ ও ইসরায়েলপন্থী নীতিতে অটল থাকা কানাডার পররাষ্ট্রনীতিতে এই সিদ্ধান্তকে এক “মাইলফলক পরিবর্তন” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অটোয়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, “কানাডা বিশ্বাস করে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব কেবল তখনই, যখন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয় পক্ষ সমানভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা পাবে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
ফেডারেল সরকারের ঘোষণায় জানানো হয়েছে, কানাডা দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তার অঙ্গীকার আরও সুদৃঢ় করছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতিসংঘে কানাডার ভবিষ্যৎ ভূমিকা আরও প্রভাবশালী হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
গত কয়েক দশকে কানাডার নীতি ছিল তুলনামূলকভাবে ইসরায়েলকেন্দ্রিক। যদিও তারা ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন প্রকল্পে সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে সবসময় বিরত থেকেছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন সরকার সেই ধারা ভেঙে দিয়ে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে কানাডা পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে প্রথম দিকের বড় রাষ্ট্রগুলোর একটি, যারা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রায় ১৪০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় এই পদক্ষেপ নজিরবিহীন। যুক্তরাষ্ট্র এখনও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি, আর মেক্সিকোও এখনো নীরব।
কানাডার এই সিদ্ধান্তকে আরব লীগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এটি শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুন গতি দেবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানায়, “কানাডার এই স্বীকৃতি আমাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সুদৃঢ় করবে।” অন্যদিকে, ইসরায়েল কঠোর সমালোচনা করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি একতরফা সিদ্ধান্ত, যা বাস্তবতাকে জটিল করে তুলবে এবং শান্তি আলোচনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।”
কানাডার ভেতরেও এ নিয়ে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মানবাধিকার সংগঠন, শান্তি আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সিদ্ধান্তকে “কানাডার বহুসংস্কৃতির আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক সাহসী পদক্ষেপ” বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর একাংশ বলছে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে হঠাৎ এই অবস্থান পরিবর্তন বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৪ সালে কানাডা ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে, ইসরায়েল কানাডার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এই স্বীকৃতির ফলে ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আরব দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছে, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান বাজারে কানাডার প্রবেশের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিক্ষা খাতে কানাডার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কানাডার এই পদক্ষেপ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথাগত নীতির বিপরীতে এক স্বাধীন অবস্থান। এই সিদ্ধান্ত কানাডাকে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে একটি প্রভাবশালী মধ্যপন্থী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে এর সাথে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক ঝুঁকিও কম নয়।
সবমিলিয়ে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে কানাডা কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়নি; বরং তারা নিজের বৈদেশিক নীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশ্ব যখন মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংকটের কার্যকর সমাধান খুঁজছে, ঠিক তখনই কানাডার এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন আলোচনার সূচনা করেছে।
আগামী দিনগুলোয় এই সিদ্ধান্ত কানাডার কূটনৈতিক অবস্থান, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
